× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, শনিবার

পর্নোচক্রের দুর্ধর্ষ নেটওয়ার্ক

প্রথম পাতা

শুভ্র দেব
২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক কিশোরী পাঁচ বছর ধরে চাইল্ড পর্নোচক্রের সদস্যের হয়রানির শিকার হয়ে আসছিলেন। হয়রানির মাত্রা এতো চরম পর্যায়ে চলে আসে ওই কিশোরীর পরিবারের সদস্যরাও এ নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। কিশোরী ও তার পরিবার বুঝতে পারেন এটি চাইল্ড পর্নো চক্রের কাজ এবং জড়িত যুবক বাংলাদেশি নাগরিক। উপায়ান্তর না পেয়ে অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ করেন ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটে (সিটিটিসি)। অভিযোগে ওই কিশোরী সিটিটিসি’কে জানান, ঢাকার এক যুবকের সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে তার পরিচয় হয়। তারপর গড়ে উঠে সখ্য। পরে সেই যুবক তার কাছে কৌশলে ও অনেকটা জোরপূর্বক কিছু নুড ছবি ও ভিডিও  পাঠানোর আবদার জানায়। প্রথমে কিশোরী দিতে নারাজি হলেও এক সময় তাকে কিছু নগ্ন ছবি ও ভিডিও পাঠায়।
পরে সেই ছবি ও ভিডিও দিয়ে সে তার সঙ্গে ব্ল্যাকমেইলিং শুরু করে। নগ্ন ছবি ও ভিডিও দিয়ে পর্নো তৈরি করে বিভিন্ন পর্নো গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি শুরু করে। একপর্যায়ে তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে পর্নো ভিডিও শেয়ার করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন ওই কিশোরীর অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের ডিজিটাল ফরেনসিক বিভাগ। দীর্ঘ তদন্তের পর ১৫ই অক্টোবর ঢাকার পল্লবী, শাহজাহানপুর ও রামপুরা এলাকা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ফরেনসিক বিভাগ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- বোরহান উদ্দিন, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও মো. অভি হোসেন। গ্রেপ্তার তিনজনই ঢাকার তিনটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এরমধ্যে বোরহান উদ্দিন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন সম্পর্কে আত্মীয়। গ্রেপ্তারের পর ফরেনসিক টিম জানতে পারে এই তিনজনই দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক চাইল্ড পর্নো চক্রের সদস্য হয়ে কাজ করছে।
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সূত্রে জানা গেছে, ২রা ফেব্রুয়ারি ওই মার্কিন কিশোরী সিটিটিসি’তে অভিযোগ দেয়। এরপর থেকেই ফরেনসিকের একটি টিম অভিযুক্তদের ধরার পরিকল্পনা করে। মার্কিন কিশোরীর দেয়া কিছু তথ্য দিয়েই শুরু হয় তদন্ত। তদন্তকারী কর্মকর্তারা আইপি নম্বরের ব্যবহারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাদেরকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মূলহোতা হলো- বোরহান উদ্দিন। সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছে। আর বাকি দু’জনই আরো দু’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর অব বিজনেজ এডমিনিস্ট্রেশনের (বিবিএ) শিক্ষার্থী। গ্রেপ্তারের সময় মূলহোতা বোরহানের কাছ থেকে ৩০ জিবি ভলিউমের নগ্ন কনটেন্ট পাওয়া যায়। যেখানে ৩ হাজার ৩১৬টি ফাইল পাওয়া গেছে। যার মধ্যে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার ৪৫ জন শিশু-কিশোরীর নগ্ন ছবি, শতাধিক কিশোরীর নগ্ন ভিডিও ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাইল্ড পর্নো সাইট লগইন অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া আসামিদের বাসা থেকে সেক্স টয় উদ্ধার করা হয়েছে।
সাইবার সূত্র জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে এই তিন যুবক মূলত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়। তারা মূলত বিভিন্ন গ্রুপ ও সাইটে প্রবেশ করে বিভিন্ন লিংক পেয়ে যেত। তারপর গ্রুপে বিভিন্ন পোস্ট করতো। পরে তারা কৌশলে বিভিন্ন দেশের কিশোরীদের সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে অ্যাড হয়ে যেত। তাদের একাধিক ভুয়া ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ও ই-মেইল আইডি ছিল। এসব আইডি দিয়েই তারা কিশোরীদের টার্গেট করতো। কৌশল হিসেবে তারা কিশোরী সেজেই যোগাযোগ করে সখ্য গড়ে তুলতো। একপর্যায়ে তারা শিশু-কিশোরীদের প্রলুব্ধ করে নগ্ন ছবি ও ভিডিও দিতো। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তারা অন্য কিশোরীদের নগ্ন ভিডিও নিজের বলে পাঠিয়ে দিতো। এতে করে টার্গেট করা কিশোরীও ছবি-ভিডিও পাঠিয়ে দিতো। যে ভিডিওগুলো তারা পেতো সেগুলো ২/৩ মিনিটের। এগুলোর সঙ্গে ছবি যুক্ত করে পর্নো ভিডিও বানাতো। সাইবার সূত্র জানিয়েছে, চক্রের সদস্যরা প্রশিক্ষিত। তারা মেয়েদেরকে প্রলুব্ধ করে নগ্ন ছবি ও ভিডিও আনার জন্য ১৩টি কৌশল অবলম্বন করতো। এই কৌশলগুলো তারা একটি পর্নো সাইটের এডমিনের কাছ থেকে পেয়েছে বলে জানিয়েছে। সাইবার কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ১৩টি কৌশল কোনো কিশোরীকে প্রয়োগ করলে তার সাইকোলজি ব্রেকডাউন হয়ে যায়। তার ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে পর্নো চক্রের সদস্যরা খুবই কৌশলী হয়। কি কি শব্দ প্রয়োগ করতে হবে সেদিকেও নজর রাখে। সব প্রশিক্ষণ নিয়েই তারা কিশোরীদের কাছ থেকে ছবি-ভিডিও সংগ্রহ করে। পরে এগুলো দিয়ে পর্নো ভিডিও তৈরি করে আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে দেয়। বিনিময়ে তারা বড় অঙ্কের টাকা পায়। এ ছাড়া কিছু কিছু ভিডিও ভুক্তভোগী কিশোরীদের মা-বাবাকে শেয়ার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা নেয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকের বাবাই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তাদের আর্থিক অবস্থা যে খারাপ এজন্য তারা এই লাইনে এসেছে বিষয়টা এমন না। বাসার লোকরাও তাদেরকে ভিন্নভাবে দেখতো। বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর অনেককেই তারা বিষয়টি জানাতো। বোরহান উদ্দিন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন সম্পর্কে কাজিন। তারা বাসার ভেতরে বসেই এই কাজগুলো করতো।
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সূত্র বলছে, পর্নো সাইট নিয়ে বেশ কড়াকড়ি চলছে। কিন্তু তার মধ্যেও কিছু চক্র বিভিন্ন সাইট, গ্রুপ খুলে পর্নো ভিডিও আপলোড করে। লাইভ স্ট্রিমিংও হয়। এসব গ্রুপে দেশি-বিদেশিরা তৎপরতা রয়েছে। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমেই পর্নোগ্রাফির ব্যবসাগুলো চলে। টাকা দিয়ে লগইন করে এসব ওয়েবসাইটে বিভিন্ন দেশের মানুষ প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিট কয়েন। অনলাইনে ডলার পেমেন্ট করেও এসব ওয়েবসাইটে ঢোকা যায়। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার তিনজনই এসব ওয়েবসাইটের সদস্য ছিল। তাদের সংগ্রহ করা ছবি-ভিডিও দিয়ে তারা পর্নো তৈরি করে এসব ওয়েবসাইটের এডমিনদের কাছে সরবরাহ করতো। সাইবার সূত্র আরো জানায়, ইন্টারপোল শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের সদস্যদের নিয়ে বহুদিন ধরেই কাজ করছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে তারা ১০ হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইশতিয়াক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক পর্নো তৈরি চক্রের সঙ্গে এই তিন আসামির যোগাযোগ রয়েছে। আমরা তাদের ভুয়া ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। তাদের সঙ্গে আর কার কার যোগাযোগ রয়েছে সেগুলো খুঁজে বের করা হচ্ছে। আমরা ৩০ জিবি ধারণ ক্ষমতার কনটেন্ট পেয়েছি। ফোল্ডারের বাইরে আরো অনেক ভিডিও আছে। এতো কনটেন্ট দেখে শেষ করতে পারি নাই। ডার্ক ওয়েবসাইটেও তাদের রেজিস্ট্রেশন আছে। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত আমরা শতাধিক শিশু-কিশোরী ভুক্তভোগী পেয়েছি। তিনি বলেন, এ বছরের শুরুর দিকে মার্কিন এক কিশোরী আমাদেরকে অভিযোগ করে সে পাঁচ বছর ধরে মলেস্টিংয়ের শিকার হচ্ছে। ইনস্টাগ্রামের একটা প্রাইভেট গ্রুপের মাধ্যমে চক্রের সদস্যরা মার্কিন কিশোরীর বাবা- মায়ের কাছে নগ্ন ছবি, ভিডিও শেয়ার করে। এরপরই আমরা বিষয়টি তদন্ত শুরু করি। এই চক্রের সঙ্গে দেশি- বিদেশি যেই থাকুক না কেন আমরা তদন্তের মাধ্যমে সবাইকে শনাক্ত করবো। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেবো।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
মোঃ আজিজুল হক
২২ অক্টোবর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ৪:২৫

ধর্মীয় শিক্ষার অভাবেই কিশোর দের এই অবক্ষয়।

Dr. Md Abdur Rahman
২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ৩:৪৯

Life long jail or beheading publicly is our demand

Badsha Wazed Ali
২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ১১:৫২

I salute them who have caught the criminals involved in international porno site.

Md. Harun al-Rashid
২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ১১:১৪

তথ্য প্রযুক্তিও ডাকাতের হাতে পড়লে কত ভয়ংকর অস্র হয়ে উঠতে পারে এরা তার নিকৃষ্ট উদাহরন। কঠিন শাস্তি হোক।

এ কে এম মহীউদ্দীন
২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ৮:২২

আমাদের তদন্তকারীদের অসংখ্য ধন্যবাদ।

Sadik md. iqball hos
২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ৮:২২

বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমার অনুরোধ এই নেটওয়ার্কের প্রত্যেকে ফাঁসি দৌয়া হোক । দরকার হলে আইন করে হলেহ

Kazi
২০ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার, ২:৩১

আর কত নীচে নামব। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যদি পর্ণ ছবি বানায় বাকি থাকল কি ? অবক্ষয়ের শেষ প্রান্তে পৌছে গেছে সমাজ । দৃষ্টান্তমূলক সাজা হবে কি ?

অন্যান্য খবর