× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, শনিবার

ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাকে আরবের শপিংমলে ভিন্ন চিত্র

শেষের পাতা

মানবজমিন ডেস্ক
২৭ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার

আরব দেশগুলোর শপিংমলগুলোতে এক ভিন্ন চিত্র। যেসব শপিংমলে থরে থরে সাজানো
থাকতো ফ্রান্সের নানা পণ্য, তা এখন ফাঁকা। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে করা দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। বলেছেন ইসলামী উগ্রপন্থা থেকে তিনি দেশকে সুরক্ষিত করবেন। তার এমন মন্তব্যে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান তো তার মানসিক স্বাস্থ্যের পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলছে উত্তেজনা।
অন্যদিকে, আরব অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশ ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে। ফলে রাতারাতি আরবের বিভিন্ন দেশের শপিংমল থেকে হাওয়া হয়ে গেছে ফরাসি পণ্য।
অনলাইন বিবিসি বলেছে, কুয়েত, জর্ডান ও কাতারের শপিংমল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে ফরাসি পণ্য। বিক্ষোভ হয়েছে লিবিয়া, সিরিয়া ও গাজা উপত্যকায়। কয়েকদিন আগে মহানবী (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়ার কারণে ইতিহাসের শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির শিরশ্ছেদ করে চেচেন এক যুবক। এর নিন্দা জানাতে গিয়ে সন্ত্রাসের জন্য ইসলামপন্থি জঙ্গিদের দায়ী করেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তিনি বলেন, শিক্ষক স্যামুুয়েল প্যাটিকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ ইসলামপন্থিরা আমাদের ভবিষ্যৎকে নিয়ে নিতে চায়। তাই ফ্রান্সে ব্যঙ্গচিত্র পরিত্যাগ করা হবে না।
উল্লেখ্য, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কোনো ছবি আঁকা মুসলিমদের কাছে চরম অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য। ইসলামিক রীতিতে মহানবী (সা.) ও আল্লাহর ছবি আঁকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ফ্রান্সের জাতীয় পরিচয়ের মূলে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই তাদের বক্তব্য, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে রক্ষা করতে গিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে না ফ্রান্স। এতে তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়। গত রোববার ফরাসি মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তিনি বলেন, আমরা কখনোই (ব্যঙ্গচিত্র) পরিত্যাগ করবো না।
এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের কড়া সমালোচনা করেছেন তুরস্ক ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা। তাদের অভিযোগ, ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে সম্মান দেখাচ্ছেন না ম্যাক্রন। এর মাধ্যমে তারা ফ্রান্সে বসবাসকারী কয়েক লাখ মুসলিমকে একপেশে করে ফেলছেন। রোববার দ্বিতীয়বারের মতো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, ইসলাম ইস্যুতে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এর একদিন আগেও তিনি একই রকম মন্তব্য করেন। জবাবে তুরস্কে নিয়োজিত ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে দেশে তলব করে নেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। এরপর থেকে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, বিবৃতি।
ওদিকে রোববার জর্ডান, কাতার ও কুয়েতের শপিংমলগুলোতে যেখানে ফরাসি পণ্য দিয়ে সুন্দর করে সাজানো থাকতো, তা দেখা গেছে খাঁ খাঁ করছে। চুলের প্রসাধনী এবং অন্য সব রকম প্রসাধনী উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে, তাক থেকে উধাও হয়ে গেছে। ফরাসি পণ্য অনেক বেশি আমদানি করে কুয়েত। সেখান থেকে এবার ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে। সেখানকার ইউনিয়ন অব কনজ্যুমার কো-অপারেটিভ সোসাইটি বলেছে, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে বার বার অবমাননা করার প্রতিবাদে তারা পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। কিন্তু এর জবাব দিয়েছে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, পণ্য বর্জনের বিষয়টি তারা জানতে পেরেছে। পণ্য বর্জনের এই ডাক ভিত্তিহীন। অবিলম্বে এই পণ্য বর্জন বন্ধ করা হবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যেকোনো রকম আক্রমণ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থা নিচ্ছে উগ্রপন্থি একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
আরব দুনিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে কুয়েত, কাতার, ফিলিস্তিন, মিশর, আলজেরিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব ও তুরস্ক থেকে। এসব দেশে হ্যাশট্যাগ #বয়কট ফ্রেঞ্চ প্রডাক্ট অথবা হ্যাশট্যাগ #নেভার দ্য প্রোফেট-এর অধীনে এমন আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনও একই আহ্বান জানাচ্ছে। কুয়েতে আল নাঈম কো-অপারেটিভ সোসাইটির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। একই সঙ্গে সুপার মার্কেটের সেলফ থেকে এসব পণ্য সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানানো হয়েছে। দ্য দাহিয়াত আল থুহর সংগঠনও একই পথ অবলম্বন করেছে। তারা বিবৃতিতে বলেছে, আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে আমাদের অনুভূতিতে আঘাত দেয়ায় সমর্থন করা এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের অবস্থানগত কারণে, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত মার্কেট ও সব শাখা থেকে ফরাসি সব পণ্য সরিয়ে ফেলার। কাতারে ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে ওয়াজবাহ ডেইরি কোম্পানি। এক্ষেত্রে তারা বিকল্প ভাবার আহ্বান জানিয়েছে। কাতারে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি আল মীরা কনজ্যুমার গুডস কোম্পানি টুইটারে ঘোষণা দিয়েছে, পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের সব সেলফ থেকে ফরাসি পণ্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করেছি। আমরা একটি জাতীয় কোম্পানি হিসেবে এটা নিশ্চিত করছি যে, আমাদের প্রকৃত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী চলবো। আমাদের প্রচলিত নিয়ম ও রীতির অধীনে চলবো।
ফরাসি পণ্য বর্জনের আহ্বানে যুক্ত হয়েছে কাতার ইউনিভার্সিটি। অনির্দিষ্টকালের জন্য তারা ফরাসি সাংস্কৃতিক সপ্তাহের অনুষ্ঠান স্থগিত করেছে। এক্ষেত্রে ইসলাম ও এর প্রতীককে ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। টুইটারে এক বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ইসলামিক বিশ্বাস, পবিত্রতা ও প্রতীকের বিরুদ্ধে অবিচার কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। কারণ, এই অপরাধ সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের ওপর ক্ষতি। ওদিকে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, জনগণের মধ্যে এর মাধ্যমে ঘৃণার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল নায়েফ আল হাজরাফ বলেছেন, যে সময়ে সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক, সহিংষ্ণুতা ও সংলাপকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে তখন ওই রকম বক্তব্য, বিবৃতি বা আহ্বান প্রত্যাখ্যানযোগ্য। কারণ, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে মহানবী (সা.)কে অবমাননা করা হয়। বিশ্ব নেতা, চিন্তাবিদ ও নীতিনির্ধারণকারী বিশ্ববাসীর কাছে আল হাজরাফ আহ্বান জানিয়েছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রনের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার জন্য। কারণ, এমন বক্তব্য ধর্মবিরোধী, মুসলিমদের অনুভূতিবিরোধী। ওদিকে ইসলামের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘন ও বৈষম্যকে সমর্থন দেয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কারণ ‘ইসলামের শিক্ষাকে অবমাননা করা হয়েছে ওই আহ্বানের মধ্য দিয়ে। বিশ্বে বসবাসকারী মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। শুক্রবার ম্যাক্রনের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে ওআইসি। তারা বলেছে, মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্স।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর