× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, শনিবার
কুয়েতিদের উদ্দেশ্যে কলামনিস্ট

অভিবাসীদের তাড়ানোর আগে নিজেরা প্রস্তুত তো?

বিশ্বজমিন

আলি আল বাদ্দাহ
(১ মাস আগে) অক্টোবর ২৮, ২০২০, বুধবার, ৯:৩৫ পূর্বাহ্ন

একদল পাচারকারী কুয়েতে সকল দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে দিয়েছে। কারণ তারা এ দেশে শ্রমিকদের নিয়ে এসে কাজ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই শ্রমিকরা পাচারকারীদের লোভের শিকার হয়েছে। প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটাতে যেকোনো ধরনের কাজের সন্ধানে নেমে গেছে। স্পন্সররা পর্যন্ত বাসস্থানের পারমিট নবায়ন করতে শ্রমিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ চাইছে। এ যেন ক্ষতে লবণ ছেটানোর মতোই।
মিসরীয় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সাজানো বিক্ষোভ আবার আমাদের তাড়া করে ফিরবে। আমি এই বিক্ষোভের কারণ বা উদ্দেশ্য এবং কুয়েত ও মিসরের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা নিয়ে কথা বলতে চাই না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে ও এসব উস্কানি প্রতিহত করেছে।
তবে, আমি কুয়েতের ওপর আলোকপাত করতে চাই— তেল-পূর্ববর্তী যুগের কুয়েতে বা ‘প্রাথমিক কুয়েতে।
ড. আদেল আব্দুল মুঘিনির প্রকাশ করা পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৫৭ সালে কুয়েতের মোট জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬ হাজার। এর মধ্যে কুয়েতি ছিলেন আনুমানিক ১ লাখ ১৪ হাজার। দেশটি প্রথম তেল রপ্তানি শুরুর ১১ বছরের মাথায় সেখানে মোট জনসংখ্যার অনুপাতে কুয়েতিদের পরিমাণ ছিল ৫৫ শতাংশ। সে সময় ও তার আগের সব পেশার কাজেই কুয়েতিদের উপস্থিতি ছিল। তেল রপ্তানি শুরুর আগে নাবিক, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, খননকারী, কূপ পরিষ্কারকারী, পানি পরিবহনকারী, সবজি, মাংস ও মাছ বিক্রেতাসহ সকল পেশা ও কাজই করতেন কুয়েতিরা।
কুয়েতিরা যখন তেল রপ্তানি করে অর্থ আয় করা শুরু করলেন, কুয়েতের তৎকালীন শাসক তাদের মধ্যে সম্পদ বন্টণ করা শুরু করেন। তাদের জীবনধারায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তারা তাদের পেশায় কাজ করা ছেড়ে দেন ও সেসব কষ্টকর কাজ করার জন্য আরব ও বিদেশি শ্রমিকদের নিয়ে আসেন। এরপর থেকে ওই বিদেশি শ্রমিকদের উপরেই সেসব কাজের জন্য নির্ভর করতে থাকেন। একসময় নিজেরা ওই পেশাগুলোই ভুলে যান।
ফলাফলস্বরূপ, কুয়েতিদের কর্মজীবী প্রজন্ম বিলুপ্ত হয়ে যায় ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের জায়গা দখল করে নিষ্ক্রিয় এক প্রজন্ম। অল্প সংখ্যক উদ্যোগী বণিক ছাড়া আর কোনো কার্যক্ষম দল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেনি। ব্যতিক্রমী হিসেবে ওই বণিকরা আগ থেকেই ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পেরেছিলেন। আর তাই, তারা এমন শিল্প স্থাপন করেন ও মেগা প্রকল্প চালু করেন, যেগুলো আজ অবধি কুয়েতের তেল-পরবর্তী জনজীবনের উজ্জ্বল দিক হয়ে আছে। কিন্তু ওই বণিকদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাতা ও আবিষ্কারকদের একটি প্রজন্মের শেষ হলো, যারা কুয়েতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।
একসময় কুয়েতিরা যে কাজ করতেন, তা করতে বিদেশি শ্রমিকদের কুয়েতে আগমনে তারা খুশিই হয়েছিলেন। আর এর ফলে দেশটি পুরোপুরি বিদেশি কর্মশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তেল শিল্পে উচ্চমানের কর্মসূচী, বেতন ও সুবিধা না থাকলে এই শিল্পও অভিবাসীদের হাতে চলে যেত। তখন কুয়েতিরা কেবল মোটা বেতনের চাকরিতে আগ্রহী। বিশেষ করে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোয়, যেখানে যেকোনো পদে অল্প কাজেই মোটা অঙ্কের বেতন নিশ্চিত।
প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পর কুয়েতিরা আবিষ্কার করলেন, দেশে তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। এরপর আরো একবার আমরা বিতর্কে নেমে গেলাম কোন দেশীয় অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি। এই বিতর্কের শুরুতে আলোচনায় ছিল ইরানি শ্রমিকরা, এরপর ফিলিস্তিনিরা, এরপর বেদুইনরা, বাংলাদেশিরা ও এখন সবশেষে এসেছে মিসরীয়রা।
অভিবাসীদের বিরুদ্ধে উগড়ানো ক্ষোভের একটি স্পষ্ট ও বোধগম্য কারণ ফুটে ওঠেছে। মিসরীয় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সাজানো ক্ষোভ ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে অসামাজিক পদ্ধতির উপস্থিতি ও সেগুলোর বিস্তার সহজ হওয়া এবং ভুয়া নাম ব্যবহার করা, ব্লগার হিসেবে ভাড়ায় খাটা, ইত্যাদির কারণে এই সমস্যা বেড়েছে। কিন্তু কুয়েতিরা সমালোচনা করলেও, নিজেরা নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখেনি, ‘মিসরীয়রা দেশ ছেড়ে চলে গেলে কী হবে?’
কুয়েতি স্পন্সর, অর্থাৎ কুয়েতের নাগরিক, কোম্পানি বা সরকারি সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কাউকে সেখানে কাজ করার জন্য প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। তাও সব বৈধ নিয়মকানুন ও প্রক্রিয়া মেনেই হয়। তা সত্ত্বেও, দুর্ভাগ্যবশত, অনেকেই মিসরীয় অভিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন।
কুয়েতে এখন অনেকগুলো অভিবাসী সম্প্রদায় বাস করে। তাদের মধ্যে কয়েকটি সম্প্রদায় নিজ দেশের সরকারের সুনজর পেয়ে থাকে। যেমনটা করেছেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ও মিসরের সরকার। আর বাকিদের ক্ষেত্রে তাদের সরকার খুব একটা উচ্চবাচ্য করে না। অভিবাসীরা যখন অন্যায়ের শিকার হয়, তখন তো কুয়েতিরা ফিরে তাকায় না। কিন্তু কোনো অভিবাসী অধিকার দাবি করে বসলে তখন ঠিকই চোখ বাকা করে তাকায়।
অবশ্যই, প্রতিটি দেশের নিজস্ব কর্মসংস্থানে একধরনের ভারসাম্যের প্রয়োজন রয়েছে। জনতাত্ত্বিক পর্যালোচনা ও মূল জনসংখ্যার অনুপাতে অভিবাসীদের সংখ্যা বা হার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এসব করা হয় সতর্ক পরিকল্পনার মাধ্যমে, কোনো মানুষকে অপমান না করে। একইভাবে, আমাদের অতিথিদের সম্মান করা, বিদায় বেলায় তাদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ করা ও তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
আমরা যখন নির্মাতা, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সকল সহজ কারিগরি পেশায় দক্ষতা অর্জন করতে পারবো, তখন আর কেবল তখনই আমরা বলতে পারবো ‘অভিবাসীরা, আপনাদের ধন্যবাদ।’ তার আগে নয়।
(কুয়েতি কলামিস্ট আলি আল বাদ্দাহর এই নিবন্ধ নেওয়া হয়েছে কুয়েতের আরব টাইমস অনলাইন থেকে

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর