× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৪ ডিসেম্বর ২০২০, শুক্রবার

তক্ষকের লোভে ফটিকছড়ি এসে লাশ হলো এনজিও কর্মকর্তা

বাংলারজমিন

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম ও ফটিকছড়ি প্রতিনিধি | ২১ নভেম্বর ২০২০, শনিবার, ৭:২৩

কম দামে কোটি টাকার তক্ষক কেনার লোভে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এসে লাশ হলো এনজিও কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন (৩৭)। প্রায় এক বছর পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ৫০ ফুট মাটির গর্ত খুঁড়ে তার কঙ্কাল উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এর আগে এ ঘটনায় আটক বিল্লাল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাগানবাজার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নুরপুর এলাকায় প্রায় ৫০ ফুট গর্ত খুঁড়ে হেলাল উদ্দিনের লাশ ফেলে দেয়ার তথ্য জানায় বলে জানান পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান। তিনি জানান, চাঁদপুরের দক্ষিণ মতলব উপজেলার নাগদা গ্রামের মুজিবুর রহমানের ছেলে ও এনজিও সংস্থা সেতুবন্ধনের মদিনাবাগ শাখার ব্যবস্থাপক হেলাল উদ্দিন (৪৩) গত বছরের ২২শে নভেম্বর বাবুল সিকদার (৪২) নামে একজনকে নিয়ে তথাকথিত কোটি টাকা মূল্যের তক্ষক কম মূল্যে কিনতে আসেন। কিন্তু কৌশলে তাদের ফটিকছড়ির ভূজপুর হেঁয়াকো-বাগান বাজার সীমান্তের নূরপুরে এনে অপহরণ করা হয়। এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ৬ই ডিসেম্বর হেলালের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা পিংকি ভুজপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। নিহতের স্ত্রীর তথ্যমতে, তক্ষক বিক্রির নামে হেলালকে হেঁয়াকো বাজারের একটি বোডিংয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে কৌশলে অপহরণ করে তাদের কাছে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
মুক্তিপণের জন্য ৪টি বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়। মুক্তিপণের টাকা দেয়ার পর ওইদিন বাবুল সিকদার মুক্তি পেলেও হেলালকে তারা হত্যা করে। এ সময় ভুজপুর থানা পুলিশের কাছে বারবার সহযোগিতা চেয়েও পাননি ভুক্তভোগী পরিবার। তখন পুলিশ মৌলিক কাজ করলে হয়তো হেলালকে বাঁচানো যেত। শুধু তাই নয়, প্রায় এক বছর আগে মামলা হলেও এ ঘটনার জট খুলতে পারেনি ভুজপুর থানা পুলিশ। শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর তদন্তে বের হয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে চলতি বছরের ২৩শে জুলাই রামগড় বাগানবাজার এলাকার যাত্রী বহনকারী মোটরসাইকেল চালক জাকির হোসেন রুবেলকে (২৪) গ্রেপ্তার করে পিবিআই। ২৫শে জুলাই রুবেল চট্টগ্রামের একটি আদালতে জবানবন্দি দেন।

রুবেল জবানবন্দিতে আদালতকে জানান, গত বছরের ২৩শে নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে বাগানবাজার ইউনিয়নের লালমাই গ্রামের জনৈক রাজা ভাই তাকে বলেন, পার্শ্ববর্তী চিকনছড়া বাজারে হেলাল নামে এক লোক এসেছেন, তাকে যেন মোটরসাইকেলে করে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। রুবেল যখন হেলালকে নিয়ে রাজা ভাইয়ের বাড়িতে যান। সেখানে ইসমাইল, সাদ্দাম ও বিল্লালকে দেখেন। এরপর তিনি তাকে সেখানে রেখে চলে আসেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তক্ষকের ক্রেতা সেজে ফাঁদে ফেলে পিবিআই টিম গত বুধবার বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে। বিল্লাল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, হেলালকে হত্যা করে লাশ খাগড়াছড়ির কাছে ফটিকছড়ির বাগানবাজার ইউনিয়নের নুরপুর এলাকার পাহাড়ে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। তক্ষকের দামে বনিবনা না হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে পিবিআই সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গর্ত থেকে মাটি অপসারণের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভেতর থেকে কঙ্কালটি উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী রামগড়-বাগানবাজার ও হেঁয়াকোর গহীন জঙ্গলে বিপুল পরিমাণ তক্ষক পাওয়া যায়। এর কোনো আর্থিক মূল্য না থাকলেও বিভিন্ন গুজব রটিয়ে একটি চক্র সাধারণ মানুষকে এখানে এনে জিম্মি করে রাখত। যাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ পাওয়া যেত না তাদের হত্যা করে জঙ্গলে লাশ গুম করা হতো। ফটিকছড়ি বাগান বাজার ইউপি চেয়ারম্যান রুস্তম আলী বলেন, ৯নং ওয়ার্ডের নূরপুর এলাকাটি খুবই দুর্গম। এখানে জনবসতি নেই। এ সুযোগে তক্ষক বেচাকেনায় সক্রিয় হয়ে উঠে একটি চক্র। এ ধরনের অপরাধ তারা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে। পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, তক্ষক নিয়ে লেনদেন অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে অপরাধের সাথে জড়িত। তাই ভিকটিম মামলা কিংবা অভিযোগের দিকে যেতে চান না। এই সুবাধে ফটিকছড়িতে ১০-১২ জনের একটি চক্র তক্ষক বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়ে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। প্রসঙ্গত, তক্ষক নিয়ে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে রীতিমতো উন্মাদনা চলছে। তক্ষক ধরে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে একদল মানুষ ছুটছেই। চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপজেলা ফটিকছড়ি থেকে রাঙামাটি, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি পর্যন্ত তক্ষক বেচাকেনার নেশায় ছুটছে সেই মানুষগুলো। সেই দলে সাধারণ লোক যেমন আছেন, আছেন সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মানুষ, তেমনি আছে পেশাদার প্রতারকও। লোকচক্ষুর আড়ালে সেখানে যেমন আছে কোটি কোটি টাকা হারানোর মর্মন্তুদ গল্প। তেমনি গহীন জঙ্গলে তক্ষক কিনতে যাওয়া লোককে অপহরণ কিংবা খুনের ঘটনাও ঘটে প্রায়ই। এসবের বেশিরভাগই থেকে যায় অজানা। জানা যায়, এ ব্যবসা করতে গিয়ে ২০১১ সালে দালালের খপ্পরে পড়ে নিহত হন রূপক নন্দী নামে এক ব্যক্তি। তার বাড়ি ফটিকছড়ি নারায়ণহাট এলাকার নন্দীপাড়ায়। ২০১৮ সালে তক্ষক ব্যবসায়ীর ছদ্মাবরণে একদল প্রতারক চট্টগ্রাম মহানগরীর আছদগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা রতন দত্তের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সেই শোকে এর কিছুদিন পরই তিনি স্ট্রোক করে মারা যান। তার সঙ্গে লেনদেন ছিল নগরীর জামালখান এলাকার অবাঙালি এক পেট্রোল পামেপর মালিকের। তিনি এখন ইউরোপে থাকেন। তক্ষকের ব্যবসা ঘিরে চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেড এলাকায় পতেঙ্গা, দেওয়ানহাট, জামালখান, বহদ্দারহাট এলাকায় সক্রিয় রয়েছে আরো কয়েকটি চক্র।  

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর