× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ৪ ডিসেম্বর ২০২০, শুক্রবার

করোনা আক্রান্ত মা’কে নিয়ে এক চিত্রশিল্পীর লড়াই

শেষের পাতা

মরিয়ম চম্পা | ২২ নভেম্বর ২০২০, রবিবার, ৯:১১

তরিক হাসনাত। ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)-এর চারুকলা বিভাগের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। গত ২৩শে অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মা সাবিহা নাসরিনকে জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে মিরপুর-১০ এর একটি বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। হাসপাতালের বিছানায় মা। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মাকে বাঁচাতে অর্থের প্রয়োজন। চারুকলার শিক্ষার্থী তরিকুল হাসনাত তার মেধার সেরাটা দিয়ে এঁকেছেন ছবি। আর আঁকা ছবি বিক্রি করছেন তিনি রাজধানীর ধানম-ি লেকে ৩২ নম্বর সড়কের বিপরীতে। ছবি বিক্রির টাকা দিয়ে মেটান হাসপাতালের বিল।

দীর্ঘ ২০ দিনের বেশি সময় তার মা ছিলেন লাইফ সাপোর্টে।
সময় যায়, এদিকে বাড়তে থাকে হাসপাতালের বিল। চিকিৎসার অর্থ জোগাতে হিমশিম খান। কঠিন এই সময়ে করোনা আক্রান্ত মা’কে বাঁচাতে সঙ্গে যোগ দেন বন্ধুরা। মাকে সারিয়ে তুলতে নিজের মেধার সেরাটা দিয়ে প্রতিটি ছবি এঁকেছেন পরম যতেœ। ছবি বিক্রির টাকায় যে সারিয়ে তুলতে হবে মাকে। দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করার চেষ্টা। ছেলে তরিকের বিশ্বাস মায়ের জন্য এই লড়াইয়ে তিনি জয়ী হবেন। কিন্তু সকল লড়াইকে ব্যর্থ করে দিয়ে গত ১৪ই নভেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান এই লড়াকু চিত্রশিল্পীর মা সাবিহা নাসরিন। মা’কে বাঁচাতে ছেলের অন্যরকম লড়াই সম্পর্কে সম্প্রতি চারুকলার শিক্ষার্থী তরিক হাসনাতের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের এই প্রতিবেদকের। তরিক হাসনাত বলেন, প্রাথমিক টেস্টে তার অক্সিজেন লেভেল ৫৫ ধরা পড়ে। যা প্রয়োজনীয় মাত্রার প্রায় অর্ধেক। তখন হাসপাতাল থেকে তাকে দ্রুত সিসিইউতে ভর্তির জন্য পরামর্শ দেয় চিকিৎসকরা। সিসিইউতে এক্স-রে করা হয়। এবং এক্স-রের রিপোর্টে ততদিনে তার নিওমোনিয়ায় প্রায় ৬০-৭০% ফুসফুস অকেজো হয়ে গেছে। চিকিৎসক দ্রুত লাইফ সাপোর্টে দিতে বলেন। না হলে ক্রমাগত অক্সিজেন স্বল্পতায় তার ব্রেন ডেড হয়ে যাবে। এদিকে প্রতিদিন গড়ে চিকিৎসা ব্যয় প্রয়োজন হয় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা করে।

তিনি বলেন, লড়াইটা অনেকটা শুরু হয় আমরা যখন মা’কে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই তখন থেকে।

চারুকলার এই শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাত ১টার দিকে নিয়ে যাওয়া হলেও প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করেও আইসিইউ বা সিসিইউ পাওয়া যায়নি। মায়ের অবস্থা খারাপ হতে থাকায় কাছাকাছি কোভিড স্পেশালাইজড ধানম-ির একটি বেসরকারি হাসপাতালের করোনা বিভাগে রাত আড়াইটার দিকে ভর্তি করা হয়। তখন তার হার্টবিট খুব বেশি থাকায় বিপজ্জনক অবস্থায় ছিলেন। ডাক্তাররা বলেছেন- এই অবস্থায় শুধুই সময় প্রয়োজন...। অন্তত সাতদিন তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হবে। আর এমন সময়ের দাম দেয়ার সীমাবদ্ধতা থাকায় পুরো পরিবার মুষড়ে পড়ে। প্রথম দুইদিনে প্রায় ২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এরকম সাপোর্টে আরো দীর্ঘ সময় রাখার প্রয়োজন হলে পরিবারের পক্ষে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের বেশি হাসপাতালের ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে না...। অর্থাৎ মা’কে বাঁচানো সম্ভব হবে না!

এছাড়া প্রতিদিন এতো টাকা কীভাবে দেবো কেনো উপায় খুঁজে না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেই ছবি এঁকেই মা’কে বাঁচাবো। এ সময় সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন উপায়ে চিত্রপ্রদর্শনী শুরু করি। লিখি মা’কে বাঁচাতে পাশে দাঁড়ান। একটি পেইন্টিং কেনার মাধ্যমে এই মানুষটির পাশে দাঁড়াতে পারেন। এই ইভেন্টে একজন শিল্পী তার শিল্পকর্মের বিনিময়ে মায়ের জীবন বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন খুব সকালে ধানম-ি লেকে ৩২ নম্বর সড়কের বিপরীতে ছবি আঁকা এবং বিক্রির উদ্দেশ্যে চলে যেতাম। সকাল ১১টা পর্যন্ত থেকে বন্ধুদের রেখে মা’কে একনজর দেখতে হাসপাতালে যেতাম। প্রথমদিকে অনেক সাড়া পেয়েছি। শেষের দিকে বন্ধুরা পাশে দাঁড়ায় কিন্তু সকল লড়াইকে ভুল প্রমাণিত করে অবশেষে মা গত ১৪ই নভেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি বলেন, মায়ের চিকিৎসা বাবদ প্রায় ১৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ছবি বিক্রয় থেকে প্রায় এক লাখ টাকা সহায়তা পান। তরিক বলেন, মা সাবিহা নাসরিন কক্সবাজারে অসংখ্য নারীকে বিনা পয়সায় ক্রাফটিং প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন। তার সন্তানের চারুকলায় পড়ার বড় সাপোর্ট ছিলেন তিনি। দুই ভাই এবং বাবার সঙ্গে মিরপুরে থাকেন তরিকুল। বড় ভাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তরিকুল বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক, শিক্ষার্থীবৃন্দ, সংবাদকর্মী এবং প্রায় ৩০ জনের মতো চিত্রশিল্পী এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন তাদের চিত্রকর্ম দিয়ে। মা চলে যাওয়ার পর এখন তরিকুলের একটিই ব্রত ‘করোনা আক্রান্ত মানুষের জন্য সাহায্য তহবিল গঠন করা’। যে অর্থ দিয়ে চিকিৎসা করা হবে করোনা আক্রান্ত অসহায় এবং দুস্থ মানুষের।  

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর