× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, শনিবার
বাংলাদেশ জার্নাল

দেখার কেউ নেই!

অনলাইন

ডা: আলী জাহান
(১ মাস আগে) নভেম্বর ২২, ২০২০, রবিবার, ৮:৫০ পূর্বাহ্ন

তাকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ফটো তুলেছেন। সেই ফটো আবার সাংবাদিকদের হাতে চলে এসেছে। অথবা সেই উচ্ছ্বসিত পুলিশ অফিসাররা ডাক্তার মামুনকে হাতকড়া পরিয়ে সাংবাদিকদের ছবির পোজ দিয়েছেন। সেই ছবি পত্রিকায় এসেছে, টিভিতে এসেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে। ডাক্তারের সতীর্থরা সেই ছবি দেখে অবাক হয়েছেন। তবে আমি অবাক হইনি।
 
ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুন একজন সরকারি ডাক্তার। জাতীয় মানসিক ইনষ্টিটিউট এবং হাসপাতালের রেজিস্ট্রার। তিনি নিশ্চয়ই একজন মেধাবী ডাক্তার।
মেধাবী না হলে post-graduation এবং বিসিএস করে এই পদে আসতে পারতেন না।
 
তবে মেধাবী হলেই যে তিনি সৎ হবেন এমন কোন গ্যারান্টি নেই। ডাক্তার মামুন কোন অপরাধ করতে পারেন না এমন দাবি তিনি নিজেও করতে পারবেন না। পুলিশ ডাক্তার মামুন সম্পর্কে যে চিত্র অঙ্কন করেছে সেখানে তাকে একজন অসৎ মানুষ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি ৩০% কমিশন নেবার লোভে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পুলিশের নিহত কর্মকর্তাকে রেফার করেছেন। অভিযোগ করা হয়েছে, যে রোগীকে না দেখেই তিনি ওষুধ লিখে দিয়েছেন। পুলিশ এবং রোগীর আত্মীয় স্বজনদের বক্তব্য অনুসারে সেই কর্মকর্তাকে মাইন্ড হাসপাতালে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সে কারণে নিহতের স্বজনরা হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। কেন সেই হাসপাতালে রেফার করা হলো সেই অদ্ভুত কারণ দেখিয়ে ডাক্তার মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হাতকড়া লাগানো হয়েছে। হাতকড়া পরা হতভম্ব ডাক্তারের ছবি বিভিন্ন পত্রিকায় দেয়া হয়েছে।
 
কয়েক মিনিটের ভিডিওতে স্পষ্ট রোগীর সাথে হাসপাতালে স্টাফদের কী সমস্যা হয়েছে। কিন্তু সেই রহস্য উদঘাটন করার জন্য বাংলাদেশের আদালত ওই হাসপাতালের ডিরেক্টর সহ ১২ জনকে ৭ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। এই ছোট ঘটনা উদঘাটন করার জন্য সাত দিনের রিমান্ডের কেন প্রয়োজন? এই প্রশ্ন কেউ আদালতকে করতে পারেনি। করলে প্রশ্নকারী উকিলের লাইসেন্স চলে যেতে পারে। কারণ আদালতের ক্ষমতা অনেক বেশি। আমরা অসীম ক্ষমতার মানুষদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাই না।
 
আমার যতদূর মনে পড়ে বাংলাদেশে এরকম একটি আইন রয়েছে যে গ্রেফতারকৃত আসামিকে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবার আগে পুলিশ ক্যামেরার সামনে হাজির করতে পারবে না। ছবি তুলতে পারবে না। মিডিয়ার সামনে হাজির করতে পারবে না। শুধুমাত্র আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছবি পুলিশ নিজ উদ্যোগে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে। সভ্য পৃথিবীতে এই নিয়ম চালু আছে।
 
পুলিশ যখন কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করে তখন তাদের বোঝার ক্ষমতা নেই এই আসামি আদালতে আসলেই দোষী সাব্যস্ত হবে কিনা। দোষী সাব্যস্ত হবার আগে মিডিয়ার সামনে আটককৃত ব্যক্তিকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে অসম্মান করে পুলিশ দিনের-পর-দিন আইন লংঘন করে চলছে তা কি মাননীয় আদালত অবহিত নন? আদালতের প্রক্রিয়া শেষ করে কোনো আসামি যখন বেকসুর খালাস পায় তখন বিচারের আগে মিডিয়ার সামনে তাকে উপস্থাপন করে পুলিশ তার ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত যে ক্ষতি সাধন করেছে তার দায়ভার নেবে কে?
 
ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দুই দিনের রিমান্ডে দিয়ে আদালত কী অর্জন করতে চাইলেন? দুই দিনের রিমান্ড শেষে তাকে যখন আবার আদালতে নিয়ে আসা হয় তখন ডাক্তার মামুনের জামিন অগ্রাহ্য করা হয়। এখানেও ক্ষমতার একটি খেলা আছে। ক্ষমতার আশে পাশে না থাকলে আপনি সেই খেলায় জিততে পারবেন না। ডাক্তার মামুনকে জেলে পাঠানো হয়। ২ আগে তিনি জামিন পাননি।
 
সঙ্গত কারণেই ডাক্তার সমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে ডাক্তারদের প্রায় সবাই । গতকাল জাতীয় মানসিক ইনষ্টিটিউট এবং হাসপাতাল এর সামনে ক্ষুব্ধ ডাক্তারদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সমাবেশ থেকে কিছু দাবি এবং আল্টিমেটাম দেয়া হয়। তখন থেকেই পর্দার অন্তরালে খেলা জমে ওঠে। আজকের সে খেলার ফলাফল আসতে শুরু করেছে।
 
যে ডাক্তার মামুনের জামিন গতকাল হয়নি তা আজকে হয়েছে বলে জানতে পারছি। আদালতের কাছে প্রশ্ন, প্রথমবার কোন যুক্তিতে ডাক্তার মামুনের জামিন আপনি দেননি? কোন যুক্তিতে একদিন পরে সেই জামিন দেয়া আপনার কাছে একটি পবিত্র কাজ বলে মনে হলো? নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন।
 
আমার কাছে মনে হচ্ছে ডাক্তার মামুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা professional misconduct. উনি একজন মানুষ কাজেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতেই পারে। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে professional misconduct এর অভিযোগ উঠতেই পারে। একই ধরনের অভিযোগ অন্যান্য প্রফেশনালদের ক্ষেত্রেও উঠতে পারে। সেই প্রফেশনাল misconduct তদন্ত করবে কারা?
 
যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা হলো,এ ধরনের অভিযোগ (professional misconduct) তদন্ত করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রফেশনাল বডি। ইংল্যান্ডে ডাক্তারদের এই বডি হচ্ছে GMC. ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কোন পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ আসলে তা প্রথমে নিজস্ব হাসপাতাল, পরে প্রয়োজনে GMC (General Medical Council- regulatory body for UK doctors) তে যাবে। GMC যদি মনে করে তাহলে সেই ডাক্তারকে লম্বা শুনানির পর সাসপেন্ড করতে পারে অথবা তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করতে পারে। অপরাধের ধরণ মারাত্মক হলে GMC সংশ্লিষ্ট ডাক্তারকে পুলিশের কাছে রেফার করতে পারে। তার আগে কোন অবস্থাতেই পুলিশ জড়িত হতে পারবে না।
 
তবে এখানে একটি কথা আছে। কোন ডাক্তার যদি ক্রিমিনাল অফেন্স এর সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে পুলিশ সরাসরি জড়িত হবে। পুলিশ তখন প্রয়োজনে GMC কে অবহিত করবে।
 
অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগতে পারে, কোনটা professional misconduct, আর কোনটা criminal offence তা আমরা বুঝবো কীভাবে?
হাসপাতালে ডিউটি করা অবস্থায় এখনো উৎকোচ গ্রহণ করেছেন- professional misconduct. মারামারি করতে গিয়ে কাউকে খুন করে ফেলেছেন- criminal offence.
 
অনলাইন এ ক্লিক করলে অসংখ্য উদাহরণ দেখতে পাবেন। ডাক্তার মামুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা অবশ্যই professional misconduct. কিন্তু বাংলাদেশে কে শুনে কার কথা?
 
GMC র আদলে বাংলাদেশের ডাক্তারদের একটি রেগুলাটরি বডি রয়েছে- BMDC- Bangladesh Medical and Dental Council. সেখানে ডাক্তারদের পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে কিছু নিয়ম-নীতি উল্লেখ করা আছে। Section 5.2,5.3 ধারা অনুসারে ডাক্তার মামুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা professional misconduct. আমার প্রশ্ন হচ্ছে BMDC কেন এখানে এগিয়ে আসেনি? GMC পারলে BMDC কেন পারবে না? নাকি বাংলাদেশে পুলিশ BMDC কে কন্ট্রোল করে?
 
বাংলাদেশ আমার কিছু পরিচিত ডাক্তার রয়েছেন। ডাক্তার মামুন ইস্যুতে যার সাথে কথা হয়েছে। তাদের ভেতরে একটি মারাত্মক ভয় কাজ করছে। ভয়টা হলো এই যে, কোন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে ওষুধ যখন দেয়া হয় তখন সেই ওষুধের side effect বা অন্য কম্প্লিকেশনের কারণে রোগী মারা যেতে পারে। রোগীর আত্মীয় স্বজন সংক্ষুব্ধ হয় পুলিশকে যদি বলে যে ওমুক ডাক্তার ওষুধ দিয়ে আমার রোগীকে মেরে ফেলেছে তাহলে পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করবে? ডাক্তার মামুনকে যদি গ্রেফতার করতে পারে তাহলে সহকারি অধ্যাপক ডাক্তার সাঈদ ইনাম ওয়ালিদ বা অধ্যাপক কবির জুয়েল গ্রেফতার হতে পারেন। কারণ তাদের হাতেও রোগী মারা যেতে পারে। ডাক্তাররা একই অভিযোগে গ্রেফতার হতে পারেন যে কোন সময়, যে কোন দিন, যেকোনো মুহূর্তে। তাদেরকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে কে?
 
যে কথা প্রথমে বলতে চাইছিলাম তা হচ্ছে ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুনের গ্রেফতার, রিমান্ড এবং জামিন নিয়ে যা হয়েছে তা আমার কাছে মনে হয়েছে একটি পক্ষকে শান্ত রাখার জন্য। ক্ষমতার ব্যালেন্সে আপাতত মনে হয়েছে ডাক্তারদের শান্ত রাখা দরকার। এর আগে মনে হয়েছে পুলিশকে শান্ত রাখা দরকার। ডাক্তার মামুনের জামিন হয়েছে। ২ দিন আগে যে ডাক্তারের জামিন নামঞ্জুর হয়েছে তা একদিন পর আন্দোলনের মুখে কীভাবে মঞ্জুর হয় এটাই তার প্রমাণ।
 
মাধ্যমে আদালত একটি ভুল তথ্য দিচ্ছেন। আমার দৃষ্টিতে সে ভুল তথ্যটি হচ্ছে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কারো জামিন না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে তা আদায় করা সম্ভব। একটি সভ্য দেশে এটি কাম্য হতে পারে না।
 
আমি চাই ডাক্তার মামুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার সঠিক তদন্ত হোক। তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গ্রেফতার করে ক্যামেরার সামনে এনে যে অসম্মান করা হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ দেয়া হোক। আদালত থেকে মাধ্যমে ডাক্তার মামুন হয়তো নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। আদালত স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হলে এই মামলায় ডাক্তার মামুনের নির্দোষ হয়ে বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু তখন তার ব্যক্তিগত পারিবারিক এবং সামাজিক অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সেই ক্ষতিপূরণের দায়ভার নেবে কে?
 
আমি জানি এই ক্ষতিপূরণের দায়ভার কেউ নেবে না। প্রবল ক্ষমতার আধার হলে কোন দায়ভার না নিয়েও আপনি আপনার শক্তি প্রদর্শন করে যেতে পারেন। মানব সভ্যতার এই ক্রান্তিকালে ক্ষমতার এই শক্তি প্রদর্শন না করলেও পারতেন।
 
লেখক: কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, যুক্তরাজ্য।
প্রাক্তন পুলিশ সার্জন এবং Forensic Medical Examiner, UK.
ইমেলঃ [email protected]

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
Nafiul Sufi
২৩ নভেম্বর ২০২০, সোমবার, ৩:২১

Bangladeshi people have a tendency to blame doctors without logic. Bangladesh is the only country in this world maybe where doctors are blamed without any reason. They are front line fighters. Many doctors of Bangladesh have died in the battle of covid situation. Respect doctors and learn to give them support. If someone is guilty then that person should be punished. But without any logic or proof no one should be punished.

অন্যান্য খবর