× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি ২০২১, রবিবার

মোংলা পোর্ট ঘিরে ভয়ঙ্কর চক্র

প্রথম পাতা

শুভ্র দেব
১ ডিসেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে একাধিক শক্তিশালী চক্র সক্রিয়। এসব চক্র দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের কন্টেইনার থেকে আমদানি করা পণ্য চুরি করে বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছে। চক্রটি মোংলা বন্দর থেকে শুরু করে সারা দেশব্যাপী জাল বিস্তার করেছে। কৌশলে তারা দীর্ঘদিন ধরে এমন অপকর্ম করে আসছে। আমদানিকারকরা এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পান না। উল্টো তাদের অভিযুক্ত করে বলা হয় তারা বেশি টাকা এলসি করে কম টাকার পণ্য আনছে। বাকি টাকা তারা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে বলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। উটকো ঝামেলা এড়াতে এসব আমদানিকারকরাও এসব বিষয়ে মুখ খোলেন না।
বরং পণ্য ছাড়াতে নির্ধারিত টাকার বেশি টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের। অন্যদিকে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী পণ্য আমদানির নামে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠাচ্ছেন। অথচ তারা কোনো পণ্য আমদানি করছেন না। বিদেশ থেকে খালি কন্টেইনার নিয়ে আসছেন।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দেশের অন্যান্য বন্দরের তুলনায় মোংলা বন্দরে আমদানি-রপ্তানির চাপ অনেকটাই কম। চট্টগ্রাম বন্দরে ২০টি চালান আসলে মোংলা বন্দরে আসে একটি চালান। এতে করে কিছু ব্যবসায়ী এই বন্দরকে ব্যবহার করে পণ্য আমদানির নামে বিদেশে টাকা পাচার করছে। চলতি বছরেও এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সিআইডিকে অবগত করবে। এছাড়া বন্দরে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে এমন তথ্যও মিলেছে।

এদিকে, কন্টেইনার থেকে ইসলামপুরের ব্যবসায়ীর কাপড় চুরির সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর নড়েচড়ে বসেছেন ভুক্তভোগী অন্যান্য আমদানিকারকরা। গত কয়েকদিনে এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগ ডিবির কাছে এসেছে। ডিবি জানিয়েছে, যাদের পণ্য চুরি হয় তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারেন না। তাদেরকে অসাধু কর্মকর্তারা নানা রকম হয়রানি, ভয়ভীতি দেখায়। এসব কারণে থানায়ও কোনো অভিযোগ যায় না।  

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, মোংলা বন্দরের এক ব্যবসায়ীর কাপড় চুরির সঙ্গে জড়িত আসামিদের মধ্যে শামসুল আরেফিন ও মো. মনির হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন। আবুল কাশেম চট্টগ্রামের টেরীবাজারের ব্যবসায়ী। অরুণ একজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। পানঘুচি এন্টারপ্রাইজ নামে তার একটি প্রতিষ্ঠান আছে। আর সাগর হচ্ছে লেবার সর্দার। সাগর ২০/২২ বছর ধরে মোংলা বন্দরে কাজ করছে। সে মোংলা বন্দরের লেবারদের দু’টি গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপের নেতা। তার অধীনে অন্তত ৫০০/৬০০ লেবার কাজ করে। ডিবি জানিয়েছে, লেবার সর্দার সাগরের ক্ষমতা এতোটাই যে, বৈধ হোক আর অবৈধ পণ্য হোক তাকে খুশি না করলে কোনো পণ্য বাইরে বের হয় না। মোংলা বন্দর ঘিরে শক্তিশালী চক্রে সেও একজন অন্যতম হোতা। প্রতিটা পণ্য চুরি হোক আর খালাস হোক সাগর বড় ধরনের একটি ভাগ পায়।

ডিবি জানায়, শুধু সাগর নয় মোংলা বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ থেকে শুরু করে নয়েল ড্রাইভার, টালিম্যান এই তিন পদের অন্তত ৭/৮ জনের নাম আমরা পেয়েছি। আরেকটি বড়সড়ো একটি পদবির কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া মোংলা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ২০টি সিএন্ডএফ এজেন্ট মোংলা বন্দরের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। এসব সিন্ডিকেটের হাত ধরে আরো কিছু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বন্দর থেকে পণ্য চুরির পর এসব পণ্য চলে যায় চট্টগ্রামের টেরীবাজার কেন্দ্রিক তিনটি সিন্ডিকেটের কাছে। ওই তিন সিন্ডিকেটে ২০/২২ জন সদস্য আছেন। টেরীবাজারের সিন্ডিকেট থেকে পণ্য আসে ঢাকার সিন্ডিকেটের কাছে। ঢাকার ইসলামপুরে মোংলার চুরি করা পণ্যের আরো দু’টি চক্র আছে। এই দু’টি চক্রই পরবর্তীতে পণ্যগুলি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়। ডিবি সূত্র জানিয়েছে, মোংলা বন্দরের কর্মকর্তা/কর্মচারী থেকে শুরু করে বন্দরের ভেতরে-বাইরে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। এদের অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। এবং অনেককে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

মোংলা বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ও উপ সচিব মো. গিয়াস উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, বন্দর থেকে চুরির ঘটনার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কিভাবে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। তদন্তে যদি বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা পায় তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবে। এছাড়া এভাবে যাতে চুরির ঘটনা আর না ঘটে সেদিকেও আমাদের খেয়াল থাকবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কোতোয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সাইফুর রহমান আজাদ মানবজমিনকে বলেন, এক ব্যবসায়ীর কাপড় চুরির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা জানতে পেরেছি মোংলা বন্দরকে ঘিরে বেশ কয়েকটি চক্র কাজ করছে। বন্দরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সিএন্ডএফ এজেন্ট, সর্দার, ট্রাফিক বিভাগ এর সঙ্গে জড়িত আছে। এর বাইরে চট্টগ্রামের টেরীবাজারে ও ঢাকার ইসলামপুরের বন্দরকেন্দ্রিক চক্র সক্রিয় আছে। আমরা চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করেছি। তার বিষয়ে আরো খোঁজখবর নিচ্ছি। এর বাইরে আমরা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাবর একটি চিঠি দেবো। চিঠিতে বন্দরের অনিয়মের বিষয় ও কারা জড়িত সেগুলো উল্লেখ করবো।

ওদিকে, ডিবি বলছে যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা বলেছে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের সহযোগিতা রয়েছে। কারণ বৈধ পণ্য খালাসের আড়ালে চুরি করা পণ্যও বন্দরের ভেতর থেকে বের করা হয়। এক্ষেত্রে বৈধ পণ্যের জন্য যে পরিমাণ মালবাহী গাড়ির প্রয়োজন হয় তার চেয়ে বেশি গাড়ি প্রবেশ করানো হয়। বৈধ পণ্য ও চুরি করা পণ্য একই সঙ্গে গাড়িতে লোড করা হয়। কন্টেইনার থেকে চুরির সময় নয়েল ড্রাইভার ও টালিম্যানের সহযোগিতা থাকে।

ট্রাফিক বিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) মোস্তফা কামাল মানবজমিনকে বলেন, চুরির ঘটনা আগে ঘটেছে। কারা চুরি করছে, কীভাবে করছে এসব বিষয় আমরাও জানতে চাই। দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট পেলে কারা জড়িত সেটা জানা যাবে। তিনি বলেন, চালান আসার পর আমদানিকারক যে সিএন্ডএফ এজেন্ট নিয়োগ করে তারাই মূলত রাজস্ব পরিশোধ করে। রাজস্ব দেয়ার পর আমরা পণ্য খালাস করে দেই। একটি পণ্য আসার পর নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে খালাস করে দিতে হয়। বেশিদিন পড়ে থাকলেই সমস্যা হয়। তিনি বলেন, চুরির ঘটনার সঙ্গে মোংলা বন্দরে কোন কোন অসাধু কর্মকর্তা জড়িত সেটা আইন শৃঙ্খলাবাহিনী বলুক। আমরা আগেই কাস্টমসকে চিঠি দিয়েছিলাম কোন কোন কর্মকর্তা জড়িত তাদের নাম প্রকাশ করার জন্য। তখন কাস্টমস থেকে আমাদের বলা হয়েছিল এটা বিচারাধীন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর