× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী
ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২১, সোমবার

কী ছিল মুশতাকের মামলায়

প্রথম পাতা

রুদ্র মিজান
২ মার্চ ২০২১, মঙ্গলবার

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আইনটি নিয়ে প্রতিবাদী আওয়াজ উঠেছে শুরু থেকেই। ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করছে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ২০১৮ সালের এই আইনের ‘ভয়ঙ্কর ধারা’ হিসেবে পরিচিত ২১, ২৫, ৩১ ও ৩৫। এই ধারাতেই গত বছরের ৬ই মে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, লেখক মুশতাক আহমেদ, মিনহাজ মান্নান, তাসনিম খলিলসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হয়। তার আগেই গ্রেপ্তার করা হয় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মুশতাক আহমেদকে। পরবর্তীতে তিনজনের নামে চার্জশিট দাখিল করা হয় আদালতে। আলোচিত এই মামলার চার্জশিট থেকে দেশের বাইরে থাকা সুইডিশ-বাংলাদেশি সাংবাদিক নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিল, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন এবং চাঁদপুরের শাহরাস্তির নরিংপুরের মিনহাজ মান্নান ইমনসহ আট জনকে বাদ দেয়া হয়।
মিনহাজ মান্নান বিএলই সিকিউরিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার-ডিরেক্টর। চার্জশিট দাখিলকারী রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মহসীন সরদারের দাবি মিনহাজ মান্নানের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য প্রমাণ না পাওয়ায় এবং অন্যরা দেশের বাইরে থাকায় চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়। আর মুশতাক আহমেদ, আহমেদ কবির কিশোর ও দিদারুল ইসলামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ থাকায় ১১ই জানুয়ারি আদালতে তাদের নামে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর সেই মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু সংখ্যক লোক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গুজব, ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এই সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন আইডি, পোস্ট পর্যবেক্ষণ ও তথা সাইবার টহল বৃদ্ধি করা হয়। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ‘আই অ্যাম বাংলাদেশি’ নামক পেইজে মিথ্যা গুজবসহ নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর পোস্ট দেয়া রয়েছে। এই পেইজের এডিটর কার্টুনিস্ট কিশোরসহ পাঁচ জন। পরে গত বছরের ৫ই মে কার্টুনিস্ট কিশোরকে তার কাকরাইল এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এজাহারে কার্টুনিস্ট কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট, করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারদলীয় নেতাদের কার্টুন বানিয়ে গুজব-বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে সুইডিশ-বাংলাদেশি সাংবাদিক তাসনিম খলিল, হাঙ্গেরি প্রবাসী জুলকারনাইন সায়ের খান, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক শাহেদ আলম, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক চ্যাটিং রয়েছে। আহমেদ কবির কিশোরের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত বছরের ৫ই মে লালমাটিয়ার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মুশতাক আহমেদকে। জব্দ করা হয় তার ফোন, কম্পিউটার। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ ও মুশতাক আহমেদ পরস্পর যোগসাজশে জাতির জনক, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য বিভ্রান্তি, গুজব সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর জন্য এটি করা হচ্ছিলো বলে এতে অভিযোগ করা হয়। মুশতাক আহমেদের ফেসবুক ফ্রেন্ড দিদারুল ও মিনহাজ মান্নান। এ ছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক চ্যাটিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে মামলায় উল্লেখ করে র‌্যাব। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, লেখক মুশতাক আহমেদ ও ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ সংগঠনের কর্মী দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ই জানুয়ারি আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। এতে আট জনকে বাদ দিয়ে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন মিনহাজ মান্নান। তার আইনজীবী শাহরিয়ার কবির বিপ্লব বলেন, মামলার স্বপক্ষে সত্যতা না পেয়ে মিনহাজ মান্নানকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছেন তদন্তকারী। মামলার আসামি কিশোর ও মুশতাক শুরু থেকেই কারাগারে। শেষ পর্যন্ত গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি অবস্থাতেই মৃত্যু হলো মুশতাক আহমেদের। আসামিদের মধ্যে মিনহাজ ও দিদার গত সেপ্টেম্বরে আদালত থেকে জামিন পান। কিন্তু গত নয় মাসে কিশোর ও মুশতাকের জামিন আবেদন ছয় বার খারিজ করেছেন আদালত। মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালায় বা তাতে মদত প্রদান করেন, তাহলে অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ২৫ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রিক বিন্যাসে, (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য প্রেরণ করেন যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক, (খ) এমন কোনো তথ্য সমপ্রচার বা প্রকাশ করেন, যা কোনো ব্যক্তিকে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ করিতে পারে (গ) মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয়প্রতিপন্ন করবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা সমপ্রচার করেন, বা (ঘ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াবার উদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, প্রচার বা সমপ্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অপরাধ যদি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি কেউ এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন বলে এই আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুটি ‘ভয়ঙ্কর’ ধারা ছাড়াও আলোচিত এই মামলায় ৩১ ও ৩৫ ধারার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী  মনজিল মোরসেদ মানবজমিনকে বলেন, যখন ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি করা হয় তখনই বলেছি, এই আইন মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করবে। মানুষের কথা বলার, লেখার অধিকার খর্ব করবে। সরকার তখন গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ সবাইকে বললো, এই আইনের অপব্যবহার হবে না। কিন্তু এখন তো সবাই বলছে এই আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। এখন তো সম্পাদকরা প্রতিবাদও করতে পারছেন না। ওই আইনজীবীর মতে, এভাবে চলতে থাকলে স্বাধীনতা স্তব্ধ হয়ে যাবে। যা রাষ্ট্রের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য মোটেও ভালো না। যারা সুবিধা নিচ্ছেন তারাও বিষয়টি হয়তো একসময় টের পাবেন। এটি তাদের জন্যও ভালো হবে না।
 

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর