× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ১৬ অক্টোবর ২০২১, শনিবার , ৩০ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৮৯)

‘আমাকে নিয়ে ওরা এত ভীত কেন?’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
১ জুলাই ২০২১, বৃহস্পতিবার
সর্বশেষ আপডেট: ৩:৫৫ অপরাহ্ন

শুক্রবার ৭ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৭৫
আজ ৭ই নভেম্বর। এই দিন জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে সিপাহী জনতা এক স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেছিল। আমাদের ইতিহাসের এটি ছিল এক টার্নিং পয়েন্ট।
মনোনয়নপত্রের ফরম ও ভোটার তালিকা হাতে না পাওয়ায় আমি মনোনয়নপত্র দাখিলের কাজে এগোতে পারিনি। সেগুলোতে আবার প্রয়োজন হবে জেল কর্তৃপক্ষের সত্যায়িতকরণ। আমার নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলা থেকেই নেতা ও কর্মীরা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে আমার স্বাক্ষর করা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে এসে চরমভাবে হতাশ হয়েছে। আমি তাদের এই বলে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি, কারণ যেকোনো প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কখন মনোনয়নপত্রের ফরম ও ভোটার তালিকা আমার হাতে এসে পৌঁছাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

শনিবার ৮ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৭৬
গতকাল সিপাহী জনতা বিপ্লব উপলক্ষে বেগম জিয়া চট্টগ্রামে এক মহাজনসমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, চারদলীয় ঐক্যজোটের ৭ দফা দাবিনামা গৃহীত না হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না।
এখন চলছে প্রবলতম এক রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ- উচ্চমাত্রার একপর্যায়ে। অন্যথায় বলা যায়, দাবিনামা গৃহীত হলে নির্বাচনী তফসিলও বদলাতে হবে।
অন্যদিকে বেগম জিয়া এখন পর্যন্ত নিজেকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেননি। এবং দলও এখন অবধি মনোনয়নপত্র ফরম বিতরণ শুরু করতে পারেনি। অন্যভাবে বলা যায়, চারদলীয় জোট এখন পর্যন্ত তার নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি যদিও যেকোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই চূড়ান্তভাবে করা একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

রবিবার ৯ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৭৭
নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা আরও ৭ দিন বাড়িয়েছে। কাজেই এখন তা হবে ২০শে নভেম্বর, যদিও তা ৭ দফা দাবির অংশ ছিল না। ৭ দফা দাবি নামা নিয়ে চূড়ান্ত মীমাংসা না হওয়া অবধি সকল দল নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আমার বন্ধু জগতজোড়া খ্যাত সাংবাদিক জন পিলজার প্রধান উপদেষ্টা পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে সুদীর্ঘ এক ই-মেইল পাঠিয়েছে। প্রত্যুত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তার কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে জানিয়েছেন, আমি যদি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে চাই তাহলে সরকার পাঠাতে পারেন এবং তার জন্য হাসনাকে একটি দরখাস্ত করতে হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে এবং বেগম জিয়াও এতে একটি ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু আমার জন্য প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। হাসনা ইতিমধ্যেই জন পিলজারের কাছে আমার অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আমি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে জেল থেকে বের হবো না। এটা লক্ষণীয় একটা ব্যাপার যে, সরকার এখন সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। জন পিলজার আরেকটি ই-মেইলে প্রধান উপদেষ্টার কাছে জিজ্ঞেস করেছেন, আমাকে জেলখানায় থেকে নির্বাচনে যেতে কেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে? আমার বন্ধু এও আভাস দিয়েছেন যে, এর সন্তোষজনক কোনো জবাব না পাওয়া গেলে তিনি গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখে সরকারের দুষ্কর্মের মুখোশ উন্মোচিত করবেন।
গতকাল আইন উপদেষ্টা হাসান আরিফ ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে বলেছেন যে, সরকার আর আমার জামিনের বিরোধিতা করবে না। দেখা যাক এখন কী হয়।

সোমবার ১০ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৭৮
চারদলীয় জোটের সাথে সরকারের কোনো সমঝোতায় আসার কোনোরকম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আজ খুব সম্ভবত ড. মোশাররফ হোসেন ও আলতাফ হোসেন জামিনে মুক্তি পাবেন, কারণ আপিল বিভাগের চেম্বার জজ সরকারের আপিলে সায় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আদালতও এখন আর আগের মতো কঠোরতা অবলম্বন করছে বলে মনে হচ্ছে না। এমনকি সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রী আমানুল্লাহ আমান ও মির্জা আব্বাসকেও হাইকোর্ট বিভাগ জামিন মঞ্জুর করেছেন।
এখন মনে হচ্ছে, আমিই হলাম সরকারের এক নম্বর টার্গেট। আমাকে নিয়ে ওরা এত ভীত কেন? আমার প্রতি কি অযথা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? কেন আমার প্রতি এই নিষ্ঠুরতা? আমি তো জেনেশুনে কারো কোনো ক্ষতি করিনি।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রকল্প মামলায় স্পেশাল জজ সাইফুর রহমান ও মোজাহিদকে জেলে পাঠিয়েছেন। তবে অচিরেই তারা আবার জামিনে বের হয়ে যাবেন।
আজ পুত্র আমানের জন্মদিন। ওর ৩২ বছর পূর্ণ হচ্ছে। একই রাতে ১৯৭৩ সালে জন্ম হয়েছিল আসিফের। হাসনার জন্ম ১৯৪৬ সালে। আসিফ ও আমান ১০ই নভেম্বরে জন্ম হলেও হাসনার জন্ম হয়েছিল ১১ই নভেম্বর। এদের সবারই জন্ম হয়েছে ১০ ও ১১ই নভেম্বর রাতেরবেলা। এ এক মহা কাকতালীয় ব্যাপার।

মঙ্গলবার ১১ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৭৯
আমাকে জানানো হয়েছে যে, আইন উপদেষ্টা হাসান আরিফ আমার জামিনের জন্য এটর্নি জেনারেলকে ফোন করে বলেছেন, কিন্তু তিনি সম্মত হননি, কারণ তিনি সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিপরীত নির্দেশ পেয়েছেন। এটর্নি জেনারেল কোর্টে মামলা করেছেন খুবই কম এবং বার-এও তিনি পরিচিত একটি মুখ নন।
ড. কামাল হোসেনের একজন জুনিয়র হিসেবে পেছনের দরজা দিয়ে তিনি এটর্নি জেনারেল হয়েছেন। ফলে হাইকোর্ট ডিভিশনে বিচারপতি আনোয়ারুল হক তার চাপে পড়ে আমার জামিনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যা আমি কখনো আশা করিনি। আমি মর্মাহত ও ভীষণ হতাশ হয়েছি। কাজেই অদূর ভবিষ্যতে আমার মুক্তি পাওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই।

বুধবার ১২ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৮০
ব্যারিস্টার খোকন মামলার ব্যাপারে আলোচনা করতে এসেছিল। মতিঝিল ফৌজদারি মামলা ও কর ফাঁকির মামলায় সরকার হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক আমার মামলার ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের আদেশ ও জামিন দানের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করার পর সবচাইতে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, চেম্বার জজ একটি মামলায় জামিন মঞ্জুর করেছেন এবং অন্য একটি মামলায় জামিনের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আপিল বিভাগের বিচারপতির এ কোন ধরনের আচরণ? এর অর্থ একটাই যে, আমাকে জেলখানায় আটকে রাখতে হবে। দুইটি মামলার ভিত্তি ছিল একই, এর মধ্যে একটির জামিন হলো, আরেকটির হলো না। একেই কি বলা হবে সুবিচার?
আমার জামিনের ব্যাপারে বেগম জিয়াকে জানাবার জন্য খবরাখবর নিতে শিমুল বিশ্বাস ও ডা. দোলন আমার কাছে এসেছিলেন।
হাসপাতালের নবনিযুক্ত ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সিরাজুল করিম ও হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্টকে সাথে নিয়ে আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে এসেছিলেন।

বৃহস্পতিবার ১৩ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৮১
আমার জামিনের আবেদনের উপর বিচারপতি অনোয়ারুল হকের অস্বীকৃতির খবর পড়ে আমি মর্মাহত হয়েছি। নিজের দু’চোখকে বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হচ্ছে। মাত্র দু’সপ্তাহ আগে মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্টসংক্রান্ত একই কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে তিনি আমাকে সম্পত্তি ও আয়ের মামলায় জামিন দিয়েছিলেন। একই বিচারপতি এখন বলছেন যে, নতুন একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করতে হবে। আর দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী আনিসুল হক এই বলে মেডিক্যাল রিপোর্টের ওপর আপত্তি জানিয়েছেন যে, এগুলো ভুয়া। অথচ গত ১৫ দিন যাবৎ আবেদনপত্র কোর্টের বিবেচনার জন্য পড়ে ছিল এবং বিচারপতি, সরকার পক্ষের আইনজীবী কিংবা কমিশন কেউ এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করেননি। আনিসুল হক হয়তো অতোটা নিচে নামতে পারেন, কিন্তু বিচারপতি আনোয়ারুল হক কেন তার সাথে সাথে এতটা নিচ মনোভাবাপন্ন হবেন? মামলার বাদীপক্ষ ও বিচারক সম্মিলিতভাবে এটা করেছেন এবং আমার মুক্তির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছেন যা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার বেলায় করা হয়নি। আদালত এমন অবিচার শেষ পর্যন্ত আমার ওপরও করলেন! কাজেই এখন আমার জন্য নতুন একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করতে হবে এবং নতুন একটি রিপোর্টসহ আদালতে নতুনভাবে আবেদন দাখিল করতে হবে যাতে সময় লেগে যাবে প্রায় ২ থেকে ৩ সপ্তাহ।
ড. মোশাররফ হোসেন জামিন পাওয়ার পরে দুদিন হাসপাতালে থেকে আমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছিলেন। চম্পাকলি নামে খ্যাত ২৬নং সেলের পাশাপাশি রুমে একসাথে আমরা প্রায় ১৮ মাস কাটিয়েছি। আমরা ভাগাভাগি করেছি আমাদের দুঃখ-সুখ-ব্যথা-বেদনা-নির্যাতন-অত্যাচার-অপমান-হতাশা ও আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা। বিদায়ের প্রাক্কালে আমাদের দুজনের পক্ষেই পারস্পরিক অনুভূতি প্রকাশ করা ছিল কঠিন। পরস্পরের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আমরা হাত মেলালাম, তারপর তিনি চলে গেলেন।
কেবিনের বাইরের এখনকার প্রিজন গার্ডরা মোটামুটি ভালো। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত কর্কশ ও লোভী। বখশিসের হারও এখন অনেক বেড়ে গেছে। দুর্নীতিবিরোধী প্রচারাভিযানের আগে যা ছিল ৫০ টাকা, এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ টাকায়। সারা দেশে দুর্নীতি দমন অভিযান শুরু করার পর থেকে ঘুষের মাত্রা বেড়েছে চারগুণ।

চলবে...

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
nasir uddin
১ জুলাই ২০২১, বৃহস্পতিবার, ৩:৩৭

BULLSHIT.

অন্যান্য খবর