× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ১৬ অক্টোবর ২০২১, শনিবার , ৩০ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৯১)

‘প্রাণভরে মুক্তির বাতাস নেওয়ার অপেক্ষায় আছি’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
৩ জুলাই ২০২১, শনিবার
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন

শুক্রবার ২১ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৮৯
বেগম জিয়া ঘোষণা করেছেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন থেকে জরুরি আইন সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার, উপজেলা নির্বাচন এক মাসের জন্য বাতিল ঘোষণা এবং ৯১(ঙ) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করার ক্ষমতাসংক্রান্ত নির্বাচনী বিধি বাতিল করা হলে বিএনপি ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে। আওয়ামী লীগের দাবিও ছিল প্রায় একই রকমের, তবে বেশ কিছুদিন যাবৎ তারা দাবি বাস্তবায়নের ব্যাপারে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। আওয়ামী লীগ দলটি সবসময়ই এ ধরনের অসংলগ্নতায় ভোগে। এই মুহূর্তে তাদের জোরেশোরে একই দাবি ওঠানো উচিত ছিল। কিন্তু তা তারা করেনি। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তারা নির্বাচনে অংশ নেবে- কারণ প্যারোলে মুক্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাবার অনেক আগেই শেখ হাসিনার সাথে জেনারেলদের এ মর্মে একটি সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। সে ভিত্তিতে এখন একটি লোক দেখানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ হয়তো ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে।
কিন্তু তা কখনোই অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নয়।

শনিবার ২২ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯০
আওয়ামী লীগ সবসময়ই জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। সবচেয়ে বড় প্রতারণা ছিল ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে জনগণের সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা। ১৯৮৬ সালে জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা ভঙ্গ করে এরা জেনারেল এরশাদের সাথে এক সমঝোতার ভিত্তিতে সামরিক শাসনের অধীনে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল এবং বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টির তোয়াক্কা করেনি। অথচ নির্বাচনে যোগদানের মাত্র একদিন আগে শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে এক সমাবেশে বলেছিলেন যে, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে। এ কারণে তারা একই ধরনের আচরণ করতে যাচ্ছে। যে কোনো প্রক্রিয়ায় তারা ক্ষমতায় যেতে উৎসাহী ।
খালেদা জিয়া চারদলীয় ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে যে দাবি উত্থাপন করেছেন তার ওপর সরকারের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য সমগ্র জাতি উন্মুখ হয়ে আছে।
সশস্ত্র বাহিনী দিবসের এক সংবর্ধনা সভায় বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনা গত ১৮ বছরের মধ্যে এই প্রথম পরস্পরের সাথে হাত মিলিয়েছেন ও শুভেচ্ছাবিনিময় করেছেন।
আমার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য নবগঠিত মেডিক্যাল বোর্ড আজ বৈঠকে বসেছে। তারা আবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমাকে এবং আমার আগের রিপোর্টগুলো পরীক্ষা করেছেন। দেখা যাক, এবার কী হয়।

রবিবার ২৩ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯১
দিন যত যাচ্ছে আওয়ামী লীগের সাথে সরকারের গোপন সমঝোতা ততই স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার একটা আশ্বাস পেয়েছে সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যে দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য শুরু হয়ে গেছে তুমুল প্রতিযোগিতা। এই প্রক্রিয়ায় অন্ততঃপক্ষে একশ’ আসনে অযোগ্য ও দুর্বল, কিন্তু ধনাট্য প্রার্থীরা পুরনো নিবেদিত প্রাণ ও অভিজ্ঞ প্রার্থীদের পেছনে ফেলে মনোনয়ন পাচ্ছেন যার ফলে সারা দেশে মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে নিদারুণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এটা বিবেচনা করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে যাচ্ছে। কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় তারা দুর্বল মহিলা প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে যেখানে জেনারেলদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীরা সহজে নির্বাচনে জিতে আসতে পারবেন। নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে আওয়ামী লীগের একজন সুযোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যুবলীগের এক নেতার অল্পপরিচিত এক গৃহবধূকে, যাতে করে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জেনারেল মইনের এক ভাই সহজেই জিতে সংসদে আসতে পারেন। বিরাটসংখ্যক নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিজ নিজ এলাকায় দলকে করে ফেলেছে নিষ্ক্রিয়।
এখন বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে কৌশলে প্ররোচিত করে আসছে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা প্রায় ১১ দিন পিছিয়ে দিয়েছে। এখন কেবল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন থেকে জরুরি আইন তুলে নেওয়ার দাবিটিই পূরণ করা বাকি। সে হিসেবে নতুন তফসিল অনুযায়ী প্রত্যাহারের শেষদিন হবে ২০০৮ সালে ১১ই ডিসেম্বর। একে চিহ্নিত করা হচ্ছে বেগম জিয়ার আন্দোলনের ফসল হিসেবে এবং এর ফলে তিনিও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কাছাকাছি এসে পড়েছেন। এখন প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন যদি অবাধ হয় ও সেনাবাহিনী কারো পক্ষাবলম্বন না করে তাহলে জনগণ আগামী সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি’র পক্ষে একটা চমক দেখাতে পারে।
আমার কোতোয়ালি মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ আমার মেডিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে একটা রুল জারি করে জামিন মঞ্জুর করেছেন। সরকার এ নিয়ে আপিল দায়ের করলে এবং আপিল বিভাগ জামিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা না দিলে এবার আমি মুক্ত হতে পারবো বলে আশা রাখি।

সোমবার ২৪ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯২
দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তালাবদ্ধ অবস্থায় আমার ১১ দিন কেটে গেল। আমি একান্তভাবে নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন বোধ করছি বদ্ধ এ প্রকোষ্ঠে। এ অন্ধকূপে একদিক থেকে আরেক প্রান্তে আমি হাঁটতে পারি মাত্র ছয় কদম। মেডিক্যাল চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। আমার থেরাপির জন্য অনুমতি সংগ্রহ করতে লেগে গেছে প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা, অথচ তখনো আমাকে রুমের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়নি। যে কোনো অন্যায় করেনি তার ওপর কেন এ নির্যাতন? অন্যের অন্যায়ের কারণে আমাকে সাজা দেওয়া হবে কেন? কোনো দর্শনার্থীকে আসতে দেয়া হয় না, বাইরে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই, নিজের হাতে পরিষ্কার করতে হচ্ছে থালাবাসন। অথচ আমার কাপড়-চোপড় ধোয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় কোনো কিছু কেনার সুযোগ নেই আমার। ডাক্তারের পরামর্শ থাকা সত্ত্বেও বাসা থেকে কোনো খাবার আনা যাচ্ছে না। আমি খেতে বাধ্য হচ্ছি কেবলমাত্র হাসপাতালের সরবরাহ করা খাবার। ফলে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে দিন দিন। আমি হাসপাতালে রোগী হিসেবে যেভাবে দিন কাটাচ্ছি জেলখানায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিও তার চাইতে ভালো অবস্থায় দিন কাটায়। এ পরিস্থিতিতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। কেন কর্তৃপক্ষ আমার প্রতি এমন নির্দয়? এ কি মহাকারাধ্যক্ষ না কি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত? তারা কি মানুষ না পশু? মাঝে মাঝে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি আমি। কোনো মানুষের পক্ষে এমন ব্যবহার করা সম্ভব নয়। আমি কেবলমাত্র একজন বন্দিই নই, হাসপাতালে চিকিৎসারত একজন রোগী। অতীতের কথা না-ই বা বলা হলো- আমি এদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সংসদে পাঁচবার নির্বাচিত একজন সদস্য। অথচ আজ তারা আমাকে খুন করতে চাইছে। কিন্তু কেন? আমি নিজেই তা জানি না। ২৪ ঘণ্টা বদ্ধঘরে এ অবস্থান কী অনুভূতির সৃষ্টি করে একজন মানুষ কেবল তা শুধু অনুমানই করতে পারবে, কখনো অনুভব করতে পারবে না।
তফসিল সংশোধনের পরও বিএনপি এখন অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো প্রস্তুতি নিচ্ছে না। কিন্তু কেন? বেগম জিয়া এখনো ভোটার হয়নি। দল নির্বাচনে অংশ নিলে ইতিমধ্যে নিজ নিজ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য আহ্বান করা উচিত ছিল। আসলে বাইরে কী হচ্ছে আমার পক্ষে তা বোঝা মুশকিল। জরুরি অবস্থা বহাল থাকলেও নির্বাচনী প্রস্তুতিতে আওয়ামী লীগ বিএনপি’র তুলনায় অনেক মাইল এগিয়ে রয়েছে।

মঙ্গলবার ২৫ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯৩
শেষ পর্যন্ত বিএনপি তার নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার আবারো ঘোষণা করেছে যে, নির্বাচনের আগে জরুরি আইন পুরোপুরিভাবে তুলে নেওয়া হবে। আমি জানি না এ দিয়ে তারা কি বোঝাতে চাইছে। জরুরি আইন উঠে গেলেও তাতে কিছু আর যায় আসে না। দেশে নির্বাচনের জন্য অবাধ ও সুষ্ঠ কোনো পরিবেশ নেই। কারণ, জরুরি আইনের অধীনেই দেশ চলেছে প্রায় দু’বছর। নির্বাচনের কিছুদিন আগে কেবল জরুরি আইন তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অবস্থার দ্রুত কোনো পরিবর্তন ঘটবে না এবং এতে নির্বাচনের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশও ফিরে আসবে না। এ ধরনের নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে ভবিষ্যতে সবসময়ই প্রশ্ন থেকে যাবে।
দলের জন্য আয়ের একটি রাস্তা খুলে দিয়ে নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীরা ২১ হাজার টাকার বিনিময়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছে এবং আগামীকালের মধ্যে সে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। যেহেতু দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলই এখন নির্বাচনের দিকে ঝুঁকছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবশ্যই ভিন্ন দিকে মোড় নেবে।
আজ আমাকে জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তাদের শোকজ নোটিশের যে জবাব আমি দিয়েছি তা তাদের কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হয়েছে। কী নিদারুণ পরিহাস! ইতিমধ্যেই তালাবদ্ধ এক প্রকোষ্ঠে ১২ দিন ধরে আমি বন্দি জীবনযাপন করছি এবং শাস্তি ভোগ করে ফেলেছি। উপরন্তু, জবাব পাওয়ার পরেও আমার সাজা চলছে, বাইরে লাগানো তালা এখনো খুলে দেওয়া হয়নি।

বুধবার ২৬ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯৪
নাইকো দুর্নীতি মামলায় সেই একই বিচারক আনোয়ারুল হক আমাকে শেষ পর্যন্ত আগের মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্টের ভিত্তিতেই জামিন মঞ্জুর করেছেন। খামোখাই তিনি নতুন একটা রিপোর্টের অজুহাত তুলে কয়েক সপ্তাহের জন্য আমার মুক্তি প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করেছেন। কারণ, অ্যাপিলেট ডিভিশন অন্য একটি মামলায় একই রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাকে জামিন দিয়েছিল। এতে শুধু এটাই প্রমাণিত হয় যে, অ্যাটর্নি জেনারেল যে নতুন এক রিপোর্টের দাবি আমার ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন তা ছিল আমার প্রতি নিদারুণ এক অবিচার। একটি আদালত একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাকে জামিন মঞ্জুর করার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় কী করে একই আদালত আর একটি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট চাইতে পারে? এটা ছিল আমাকে হয়রানি করার একটি কৌশলমাত্র। নাইকো মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ আমাকে তিন মাস আগে জামিন দিয়েছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ তা স্থগিত করে দেয়, এটা ছিল আমার ওপর আরেকটি অবিচার যা আগেই বলেছি। এখন যদি আপিল বিভাগ এ জামিনের ওপর হস্তক্ষেপ না করে এবং সরকার যদি বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় কোনো নিবর্তনমূলক আটকাদেশ জারি না করে তাহলে অচিরেই আমি মুক্তি পাবো। মুক্ত হলে অন্ততঃপক্ষে আমি নিজের মামলাগুলো দেখাশুনা করতে পারবো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পরে আমি মিলিত হতে পারবো আমার পরিবারের সঙ্গে। আবার শুরু হবে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
আজ ব্যারিস্টার খোকন আমার পক্ষ থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। দাখিলের সময় সালেহউদ্দিনসহ অন্যরা পার্টি অফিসে গিয়ে তা জমা দিয়েছে। আনুষ্ঠানিক মনোনয়নপত্র তৈরি করতে ওদের বেশ ক’দিন সময় লেগে যাচ্ছে। কারণ, নতুন নিয়মে মনোনয়নপত্র ফরম পূরণ করতে গেলে অনেক রকমের তথ্য ও এতদসংক্রান্ত কাগজপত্র জুড়ে দিতে হয় এবং সেগুলো সবই আবার জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সত্যায়িত করে নিতে হবে।
এখন আমি প্রাণভরে মুক্তির বাতাস নেওয়ার অপেক্ষায় আছি। আশা করছি এটাই আমার সামনে সর্বশেষ প্রতিবন্ধক। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আশা করি সরকার বা আপিল বিভাগে কেউই আমার মুক্তির পথে আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে রাখার পরেও আজ আমাকে থেরাপি নেওয়ার জন্য ঘরের বাইরে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
আজ ১৪ দিন ধরে আমি তালাবদ্ধ ঘরে অবরুদ্ধ।

বৃহস্পতিবার ২৭ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯৫
চিড়িয়াখানায় একটি জন্তুকেও এমনভাবে রাখা হয় না। খাঁচাবন্দী বাঘ, সিংহ বা বাঁদর আমরা দেখেছি। কিন্তু ওদের জন্য যৎসামান্য হলেও মুক্তবায়ু সেবনের ব্যবস্থা থাকে। অথচ আমি তা থেকে পুরোপুরিভাবে বঞ্চিত। যারা বন্দী রোগীকে এ ধরনের ব্যবস্থাধীনে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের মনুষ্যপদবাচ্য বলা যায় না। মেডিক্যাল চিকিৎসার জন্য আমাকে আনা হয়েছে এ হাসপাতালে, অথচ যে ধরনের আচরণ আমার ওপর করা হচ্ছে তা নজিরবিহীন।
কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আজ আদেশ এসেছে যে, জেল হাসপাতালে যারা আটক রয়েছে তাদের সবাইকে কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
জামিন মঞ্জুর হলেও বিচারপতি এখনো রায়ের ওপর স্বাক্ষর করেননি। ফলে এ স্থান থেকে বিদায় নিতে আমাকে আরো ৩-৪ দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমার ধৈর্য্যরে ওপর এটি আরেক মহাপরীক্ষা!
বিশেষ একটি অনুমতি নিয়ে সালেহউদ্দিন ও শহীদ আমার মনোনয়নপত্র দাখিল ও আয়কর রিটার্ন সংক্রান্ত বিষয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আমাকে নিজেকে অফিসিয়ালি একজন প্রার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে হয়েছে। এ এক পাগলামী। কর্তৃপক্ষ জানেন যে, আমি কারাগারে বন্দী অথচ আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে আমাকে সময় দেওয়া হয়েছে তিনদিন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, জেল কর্তৃপক্ষ সত্যায়িতকরণে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করলে আগামী পরশু আমরা মনোনয়নপত্র জমা দেবো।

শুক্রবার ২৮ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯৬
আমি মুক্তির অপেক্ষায় আছি। এখন আমি হাসপাতাল ছেড়ে যাবার জন্য গোছগাছ করতে ব্যস্ত। কিন্তু সময় নষ্ট করছি না। তৃতীয় বইটি লেখার কাজ ভালোভাবে এগোচ্ছে। বইটির নাম কারাজীবন (লাইফ ইন প্রিজন)। সালমান রুশদীর বই এনচানট্রেস অব ফ্লোরেন্স-এর ২৪০ পৃষ্ঠার একটি কোটেশন দিয়ে বইটি শুরু করা হয়েছে। বইটা হবে আত্মজীবনী ও ফিকশনের একটি সমন্বয়। নতুন এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট।
ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ২৬নং সেল চম্পাকলিতে থাকাকালে অতীতে আমি তিনটি বই লিখেছি। এবার একইস্থানে জেলখানায় দীর্ঘতম সময় অবস্থানকালে, যা একনাগাড়ে প্রায় এক বছর আট মাস, আমি দুটি বই পুরোপুরিভাবে লিখে শেষ করেছি। সেগুলো হলো- বাংলাদেশ: এ স্টাডি অব দি ডেমোক্রেটিক রেজিমস এবং মিথ অব গুড গভর্নেন্স- ফ্রম ডেমোক্রেসি টু ইমারজেন্সি। জেলখানায় থাকার শেষের দিকে যখন সুপ্রীম কোর্ট থেকে জামিন পাবার পরও আমাকে আটক রাখার জন্য ক্ষমতাসীন সরকারের চক্রান্তে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে আমার মুক্তির প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছিল তখনই আমি বন্দীজীবনের ডাইরির ভিত্তিতে তৃতীয় বই লাইফ ইন প্রিজন লেখার কাজ শুরু করি।

শনিবার ২৯ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯৭
আমি এখন পড়ছি মহান আফগান লেখক খালেদ হোসাইনীর A Thousand Splendid Sun, চমৎকার একটি বই। লেখকের বই কাইট রানার সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি বাস করছেন আমেরিকায়। কারণ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে তিনি আর নিজ দেশে থাকতে পারছিলেন না। এই বইটি ছাড়াও বিছানায় আয়েশের উপকরণ হিসেবে আমি আরো যাদের বই পড়েছি, তাদের মধ্যে রয়েছে- সালমান রুশদী, ড্যান ব্রাউন, জেফরী আর্চার, জন গ্রিশাম, ঝুম্পা লাহিড়ী, বিক্রম শেখ, ফ্রেডারিক ফরসাইথ, কিরণ দেশাই এবং অরুন্ধতী রায়। বইগুলো পড়ে আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। আমার কাছে এশীয় বংশোদ্ভুত, বিশেষ করে ভারতীয়দের লেখা বইগুলো অনেক ভালো এবং পড়ার সময় উঁচুমানের বলে মনে হয়। মনিকা আলীর লেখা ব্রিক লেন এবং তাহমিমা আনামের এ গোল্ডেন এজ-এর মতো বাংলাদেশি লেখকেরাও এখন অনেক সুনাম অর্জন করেছে এবং নিশ্চিত যে, তারা আরো আন্তর্জাতিক সম্মাননা পাবেন। এ বছর ভারতীয় লেখক ৩১ বছর বয়স্ক অরবিন্দ অদিগাকে তার বই দি হোয়াইট টাইগার-এর জন্য বুকার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আমি রিমেইনস অব দি ডে-এর জাপানী লেখক কাজুও ইশিগুরোর কাজও পছন্দ করি। তার এই চমৎকার বইটি চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়েছে।
আমার এই নিঃসঙ্গ বন্দিত্ব এবং মুক্তির উত্তেজনার মধ্যেও আমি আমার লেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আজও আমি লিখেছি প্রায় চার পৃষ্ঠা।

রবিবার ৩০ নভেম্বর ২০০৮ দিন ৫৯৮
আমার শেষ জামিনের রায়ে স্বাক্ষর দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জেলা কোর্টের সংশ্লিষ্ট বিচারক এখনো জামিননামায় স্বাক্ষর করেননি। আইন উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। কারণ হলো, পাবলিক প্রসিকিউটরের অসহযোগিতা। কেবলমাত্র আমার মুক্তিতে বাধা সৃষ্টি করার জন্যই আজ তিনি আদালতেই আসেননি। আমার অধিকাংশ সহবন্দী একদিনের মধ্যে সবকিছু ম্যানেজ করে জেল থেকে বের হয়ে গেছেন, এমনকি কেউ কেউ জামিনের রায় হবার দিনই সবকিছু শেষ করে ফেলেছেন। অথচ আমি রায় ঘোষণার পরেও চারদিন ধরে অপেক্ষা করছি। আমি এ-ও শুনেছি যে, জামিননামা কার্যকর করতে গিয়ে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকের অনুমোদন নিতেও কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এইমাত্র আমাকে জানানো হলো যে, সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র জেল কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছেছে।
আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার খোকনের মাধ্যমে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, কোতোয়ালী থানার ফৌজদারি মামলায় জামিনের বিরুদ্ধে সরকার কোনো আপিল করবে না। এতদসত্ত্বেও অ্যাটর্নি জেনারেল আজ চেম্বার জজের আদালতে একটি আপিল পেশ করেছেন। সেখানে আপিলটি প্রত্যাখ্যান করে হাইকোর্ট ডিভিশনের দেওয়া জামিনের পক্ষে আদেশ বহাল রাখা হয়েছে। আমার আশঙ্কা রয়েছে যে নাইকো মামলায়ও অ্যাটর্নি জেনারেল আবার আপিল আবেদন করতে পারেন। শেষ অবধি কী হবে কেউই জানে না। তাই মুক্তির পথে পদে পদে বাধা।
হাস্যকর অ্যালকোহল মামলা ও নাইকো মামলা ছাড়াও সরকারের পেটোয়া বাহিনী আমার বিরুদ্ধে আরো ৪টি মামলা একের পর এক দায়ের করেছে। যখনই আমার মুক্তি একেবারে আসন্ন হয়েছে তখনই তারা নতুন মামলা দিয়েছে। এফডিআর-এ আমার আয়সংক্রান্ত বিবরণীতে উল্লেখিত একই ঘটনার একই অভিযোগে পৃথক ৪টি ধারাবলে ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সম্পত্তি ও আয়সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের অধীনে, কর ফাঁকির মামলা করা হয়েছে আয়কর অর্ডিনেন্সের অধীনে আর দু’টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে ফৌজদারি দণ্ডবিধির অধীনে। আশ্চর্যজনকভাবে অ্যালকোহল ও নাইকো মামলাসহ ছয়টি মামলার সবকয়টিতেই আমাকে দুই-তিনবার করে সুপ্রীম কোর্টের প্রত্যেকটি ডিভিশনে আবেদন করতে হয়েছে। যখনই হাইকোর্ট বিভাগ আমাকে জামিন দিয়েছে। আপিল বিভাগ তা স্থগিত করে দিয়েছে। এরপর মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে জামিন পাওয়ার জন্য আমাকে ফিরে যেতে হয়েছে হাইকোর্ট ডিভিশনে, যার জন্য দুইবার মেডিক্যাল বোর্ড গঠনে আরো প্রায় দুই মাস সময় অতিরিক্ত লেগে গেছে। এরপরও সরকার জামিনের বিরুদ্ধাচরণ করে আপিল দায়ের করেছে এবং আপিল বিভাগ মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে আপিল গ্রহণ না করা অবধি আমাকে লড়ে যেতে হয়েছে। চিন্তায় শিহরিত হই যে, কী রকম যন্ত্রণা, শঙ্কা ও উত্তেজনা আমাকে পোহাতে হচ্ছে।

সোমবার ১ ডিসের ১০০৮ দিন ৫৯৯
আজ সকালে, ১৭ দিন পরে আমার জেল হাসপাতালের বাইরের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। খবর আসতে শুরু করেছে যে, আর কোনো প্রতিবন্ধকতা আমার সামনে নেই এবং মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জেল কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছেছে। তবে এখন অবধি তারা উচ্চতর কর্তৃপক্ষের শেষ নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। নিদারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও আমি ইতিমধ্যে আমার বই ফাইল, যাবতীয় সরঞ্জামাদিসহ সুটকেসগুলো গোছাতে শুরু করেছি। দুপুরে জনগণের ভিড় জমতে শুরু করেছে। আমি জানালা দিয়ে তা দেখতেও পাচ্ছিলাম। তারা ক্রমাগত একের পর এক স্লোগানও দিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে বিকাল ৫টার দিকে ডিআইজি কাগজপত্রসহ আমার কামরায় এলেন। ১ বছর ৭ মাস ১৮ দিন পর শেষাবধি আমার মুক্তি হলো। আল্লাহ তা’আলার কাছে আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।
আমার কক্ষ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে শত শত মানুষ ফুলের তোড়া নিয়ে সমবেত হলো আমার চারপাশে। সেখান থেকে আমাকে নিয়ে গেল নিচ তলায়। যেখানে অপেক্ষা করছিল হাজার হাজার মানুষ। শত শত ফুলের তোড়াবাহী জনতার মধ্যে থেকে ভালো করে সুবিধামতো আমার ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো ক্যামেরাম্যান ও মিডিয়াকর্মীরা। আমার ছাদ খোলা পাজেরো গাড়ির চারদিকে তখন ভিড় করেছে সবাই। আমার কাছে আশ লাগছিল এত হাজার হাজার মানুষ হঠাৎ করে এলো কোত্থেকে? কেউ কেউ নিশচয়ই এসেছে নোয়াখালী থেকে। কিন্তু অন্যরা? এ ছিল আমার জীবনের এক মহামুহূর্ত, একজন রাজনীতিবিদের জন্য পরম পাওয়ার একটি দিন। খোলাজিপে দাঁড়িয়ে আমি হাত নেড়ে, সালাম ফিরিয়ে, ফুল ও পুষ্পস্তবক গ্রহণ করে মুহুর্মুহু স্লোগানের মধ্যে সকলের অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছিলাম। ছাত্র-যুবক-নারী-পুরুষ- জীবনযাত্রার সকল স্তরের গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সেখান থেকে শহীদ জিয়ার কবর অবধি যেতে আমার সময় লেগে যায় প্রায় দুই ঘণ্টা।
মাজার জিয়ারত শেষে খোলাজিপে দাঁড়িয়ে আমি এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলাম। এতে হাতে ধরা লাউড স্পীকারে আমি আইনের শাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় আমার স্পৃহা ও আন্দোলনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে আমার মুক্তির আনন্দে শরীক হওয়ার জন্য সকলকে জানালাম আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
রাত ৯টায় বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার সকল আত্মীয়স্বজন ও বিপুলসংখ্যক বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষী সেখানে অপেক্ষা করছে অধীর আগ্রহে। শুধু নেই আমার প্রিয়তম মুখগুলো- হাসনা, আমান ও আনা।

(চলবে..)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর