× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ১৬ অক্টোবর ২০২১, শনিবার , ৩০ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৯২)

‘আমি ছিলাম এক দুরভিসন্ধিমূলক চক্রান্তের শিকার’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
৪ জুলাই ২০২১, রবিবার
সর্বশেষ আপডেট: ৬:৩৯ অপরাহ্ন

চতুর্থ অধ্যায়
উপসংহার
বন্দিত্ব আমার জীবনে নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে এবার তা ছিল কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এবার একজন ব্যক্তি হিসেবে আমার জন্য এই অভিজ্ঞতাটি ছিল সত্যি ভয়াবহ ও দুঃখময়, তবে গোটা জাতির জন্য এ এক বিরাট দুঃসংবাদ। আসলে অবৈধ, দিকচিহ্নবিহীন ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিহীন একটি সরকার দেশকে ঠেলে দিয়েছে অতল অন্ধকারাচ্ছন্ন এক সুড়ঙ্গের ভেতর, যে সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে আলোর কোনো আভাস নেই বলে মনে হয়েছে। এ সময়টাতে সরকারের প্রশাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েছে এবং সামাজিক নিয়মশৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের ঘটেছে চরমতম অবনতি। বাংলাদেশ তার ৩৮ বছরে একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ও দুটি সামরিক শাসনামল প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু সেনা সমর্থিত অবৈধ সরকার জরুরি আইনের ছদ্মাবরণে যে দুটি বছর শাসন করেছে তা ছিল সকলের মধ্যে জঘন্যতম।
এ সময়ে গোটা জাতি দেখেছে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর কুঠারাঘাত, মানবাধিকারের অনিয়ন্ত্রিত লঙ্ঘন এবং অবশেষে দেশটিকে জরাজীর্ণ ও ভগ্নদশায় ফেলে রেখে জেনারেলদের পলায়ন। রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রকে কেবল দুর্বলতরই করে গেছে। যে সমস্ত সুযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, সে ধরনের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
বিচার প্রশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে এদের অস্তিত্বই বিলুপ্তির পথে চলে গেছে। উদীয়মান ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ওপর নির্মম আঘাতের ফলে তারা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের সকল অর্থনৈতিক কর্মকা- থেকে সরিয়ে নিয়েছে, যে কারণে ব্যবসা বাণিজ্য সংকুচিত হয়েছে। অর্থনীতির উন্নয়নের সব রকমের খাতগুলো দিকনিদের্শনাহীনভাবে নিচে নেমে গিয়ে গোটা রাষ্ট্রকে ঠেলে দিয়েছে পেছনের দিকে। খাদ্য ও সারের মহাসংকটের ফলে মানুষ অভুক্ত থাকতে বাধ্য হয়েছে। দুর্ভিক্ষের করাল অভিশাপ গ্রাস করেছে। কোটি কোটি মানুষকে এবং চরম অমানবিক অবস্থার মধ্য দিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত হয়েছে মৃত্যুর চরমতম শিকার। যারা ক্ষমতায় এসেছিল দেশকে রক্ষা করার ধ্বনি দিয়ে, মানুষ দেখেছে তাদের হাতেই চূড়ান্ত ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন ও শারীরিক অত্যাচার, সুবিচারের অনুপস্থিতি, ক্যাঙ্গারু কোর্টে বিচারকার্য পরিচালনা, স্ত্রী ও সন্তানদের গ্রেফতার, বিশিষ্ট লোকদের নির্বিচারে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অন্ধকূপে প্রেরণ। এসব হলো তাদের অশেষ অপকর্মের এক ভগ্নাংশমাত্র। রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির গোড়াপত্তনের যে লক্ষ্য তারা সামনে নিয়ে এসেছিল তা অচিরেই জাতিকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য এক মিথ্যা বাগাড়ম্বর স্লোগান হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। এ সময়ে রাজনীতিবিদেরা কারাবন্দী হিসেবে যে নির্যাতন ও নাজেহালের শিকার হয়েছেন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় তা ছিল নিকৃষ্টতম।
বাংলাদেশের জন্য এ ছিল এক মহাদুর্যোগকাল, ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়। এ সময়ে আমরা আরো দেখেছি- স্বৈরতন্ত্রের উত্থান, মৌলিক অধিকার রহিতকরণের ধারা, বিচার প্রশাসনে সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতা ও এখতিয়ার খর্বকরণের প্রক্রিয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সামাজিক অপরাধের উল্লেখ্য ব্যাপকতা এবং দ্রুততম গতিতে অর্থনৈতিক অবনমিতা। এ সময়ে দেখা গেছে, কীভাবে অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক একটি সরকার সমাজের মৌলিক আচ্ছাদনকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে এবং বাংলাদেশকে পরিণত করেছে এক পরাজিত রাষ্ট্রে। জাতি আরো দেখেছে কীভাবে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আদর্শ ভূলুষ্ঠিত হয়ে পড়ে এবং কীভাবে সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানকে সংরক্ষণ, প্রতিরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থ হয়, কীভাবে আইনজীবী ও বিচারক যারা সর্বদা ছিলেন গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার, তারা নির্বিচারে মূক ও নীরব দর্শকে পরিণত হন, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতার অবৈধ দখলদারকে সমর্থন দিতে থাকেন।
একজন বন্দী হিসেবে শাস্তি ও যন্ত্রণার শিকার হয়ে আমি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এই বর্ণনা থেকে সরকারের মানসিকতা ও পরিকল্পনার ওপর তার একটি ক্ষুদ্র অংশ পাওয়া যাবে। দুজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাসহ এ সময়ে আরো অনেক দেশবরেণ্য নেতা আমার মতোই একই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নাই। রিমান্ডে থাকাকালে যৌথবাহিনীর ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অন্ধকূপে দু’চোখ বাঁধা অবস্থায় নির্যাতন, নিপীড়ন, অপমান ও নাজেহালকরণ; পরিবারের সাথে থাকার অধিকার হরণ ও তার ফলে সন্তানদের ওপর মনো-দৈহিক প্রতিক্রিয়া; নিদারুণ অর্থকষ্টের ভেতর দিয়ে পরিবারবর্গের দেশের বাইরে অবস্থান এবং অন্যের কাছ থেকে ধার করে চলতে গিয়ে মানসিক অপমান ও গঞ্জনার শিকার হওয়া; আমাদের প্রতিবন্ধী সন্তানকে তার স্ত্রীর সাথে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিতকরণ; মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্ভট অভিযোগ পত্রিকায় প্রকাশিত করে আমাদের গুলশানের বসতবাটিতে অব্যাহতভাবে নিরপত্তাহীনতা সৃষ্টি; বিনা বিচারে আটক রাখার কারণে আমার ওপর সৃষ্ট মানসিক নির্যাতন; আমার ‘ল’ প্রাকটিস ও চেম্বারের ধ্বংস সাধন; আমার গ্রেফতারের পর থেকে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা আইন ব্যবসার অর্জন থেকে আমাকে বঞ্চিতকরণ; ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার ফলে বাসাবাড়ির সকল ব্যয় সংকুলানে আমার চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হওয়া; প্রিজন ভ্যানে করে অত্যন্ত দুরবস্থার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করানোসহ জেল কর্তৃপক্ষের অপমান, নির্যাতন ও নাজেহালকরণ; টিভি চ্যানেলসহ পত্রিকায় মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে চরিত্রহনন ও খ্যাতি বিনষ্টকরণ; কোনো যুক্তি বা ব্যাখ্যা না দিয়ে হঠাৎ করে আমাকে লেখার জন্য সাদা কাগজ সরবরাহ স্থগিতকরণ; আমার কোর্ট ফাইল ও বই বাজেয়াপ্তকরণ; জেলখানায় আমার সাথে দেখা করতে এসে নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সকলকে জেলগেটের বাইরে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে উন্মুক্ত আকাশের নিচে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে অপমান করা; জেলগেটে দর্শনার্থীদের সাথে অন্যান্য বন্দীদের সাথে খোলা প্রকোষ্ঠে গাদাগাদি করা অবস্থায় বসে থেকে কোনো প্রাইভেসি ছাড়া মাত্র ২০ মিনিট কথা বলা; প্রত্যেক দর্শনার্থীকে আমার সাথে দেখা করতে আসার সময় এবং দেখা করে ফিরে যাওয়ার সময় দুবারই অপমানজনকভাবে শারীরিক তল্লাশ করা; তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যেমন, নগদ টাকাপয়সা এবং মোবাইল ফোন জমা দেওয়া এবং প্রায় ক্ষেত্রেই আর ফিরে না পাওয়া; ২০০৭ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এবং ২০০৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৮ সালের মার্চ অবধি কোনো আইনজীবীকে আমার সাথে পরামর্শের জন্য দেখা করতে না দেওয়া; অন্যান্য দর্শনার্থীর মতো আইনজীবীদেরও গেটের বাইরে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করানো; চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গমনে ঘন ঘন বাধার সৃষ্টি করে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক রকমের ঝুঁকি সৃষ্টি করা; জেলখানার ভেতরে চিকিৎসা সেবার নিম্নমান এবং অধিকাংশ সময় যখন জরুরি কারণে ডাক্তারের প্রয়োজন হয়েছে তখন সে ডাক্তারের দেখা না পাওয়া; কোনো কারণ না দেখিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বন্দীদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে বদলি করে দেওয়া; বন্দীদের প্রাইভেসিকে ক্ষুণœ করে তাৎক্ষণিক নির্দেশে ঘরের দরজা ও জানালার পর্দা গুটিয়ে ফেলা; ঘুমানোর সময় ঘরের বাতি অবিরাম জ্বালিয়ে রাখা; চৌকি বা রান্নাঘর বন্ধ করে সূর্যাস্তের আগেই রাতের খাবার সরবরাহ করে বন্দীদের পচা, বাসি ও দুর্গন্ধময় খাবার খেতে বাধ্য করা এবং তাদের পেটের সমূহ পীড়ার শিকারে পরিণত করা; মানবাধিকারের সকল ক্ষেত্র লঙ্ঘন করে বন্দীদের জেলখানা থেকে মুক্তি দিয়ে আবার জেলগেট থেকেই গ্রেফতার করা; বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে আটকাদেশ জারির পর দর্শনার্থী ও আত্মীয়স্বজনের ওপর দেখা করার নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন্দীদের একাকিত্বের যন্ত্রণা বাড়িয়ে তোলা এবং পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন বাইরে থেকে দরজা আটকে ১৭ দিন কঠোর বন্দিত্বে আবদ্ধ করা।
২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর যখন চূড়ান্তভাবে আমি কারাগার থেকে মুক্তি পাই। ততদিনে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে মনোনয়নের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। নিজের এবং আমার ঘরবাড়ি ও পরিবারকে সামাল দেওয়ার আগেই অত্যন্ত দুঃসময়ে এবং প্রতিকূল পরিবেশে আমাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। নির্বাচনযুদ্ধে যার ফলে আমার নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আমাকে ১৩৭০ ভোটের ব্যবধানে পরাজয়বরণ করতে হয়েছে। যদিও বিগত পাঁচটি নির্বাচনে আমার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সাথে আমার প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ছিল ৪০ হাজারের বেশি এবং প্রত্যেকবারেই তা ছিল আমার অনুকূলে। আমার জন্য এ ছিল এক ধরনের আঘাত ও একেবারেই অপ্রত্যাশিত। অবশ্য পরে দেখা গেছে যে, আমি ছিলাম এক দুরভিসন্ধিমূলক চক্রান্তের শিকার এবং সেনা সরকার আওয়ামী লীগের প্রার্থীদেরকে জয়ী করার জন্য নির্বাচনে কারচুপির ব্যবস্থা করে নিজেদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে ও নিজেদের অপকর্ম ঢেকে চামড়া বাঁচানোর ব্যবস্থা করেছে। পরবর্তীকালে মাত্র চার মাসের মাথায় আমি বেগম খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া বগুড়া-৭ নির্বাচনী এলাকা থেকে অনুষ্ঠিত এক উপনির্বাচনে ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি।
বাংলাদেশ আর কখনো আগের অবস্থানে ফিরে যাবে না। অসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির হার আশান্বিতভাবে বাড়বে না এবং দেশের বিরাট সংখ্যার জনগোষ্ঠী অবস্থান করবে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। ধনী ও গরীবের মধ্যে বৈষম্য ও ব্যবধান ক্রমাগতভাবে বাড়তেই থাকবে। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতির সুষ্ঠু পরিবেশ আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা অব্যাহতই থেকে যাবে। ভবিষ্যতে হয়তো নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে, কিন্তু তা হবে দেশটিতে একটি নতজানু সরকার প্রতিষ্ঠারই উপলক্ষ্য মাত্র। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি অনাকাক্সিক্ষত খাতে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন এর নিজস্ব কোনো গুণগত বৈশিষ্ট্য ও সার্বভৌম সত্তা থাকার সম্ভাবনা থাকবে কম।
ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে দেশটির অবস্থান ক্রমশ গুরুত্ব পাবে আর তাই দেশটিকে নিয়ে ষড়যন্ত্রও চলতে থাকবে। সর্বোত্তম ব্যবস্থা হিসেবে এ দেশে থাকবে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন এক ধরনের গণতন্ত্র। যেকোনো ভবিষ্যৎ সরকার তার পূর্বসূরী সরকারের চাইতে নিকৃষ্টতর হতে পারে এবং প্রজাতন্ত্র ক্রমশ তার রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে ফেলতে পারে। অর্থবহ সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রশক্তির ছায়াতলে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং আশা-আকাক্সক্ষা উজ্জীবিত হওয়ার কথা তা আপাতত বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। এই অবস্থা বিরাজ করলে বিচার বিভাগ ও সংবাদ মাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা আর কখনো ফিরে আসার সম্ভাবনা একেবারে কম।
এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বর্তমান বেআইনী সরকার বিকল্প কোনো রাজনৈতিক শক্তি, দল বা নেতৃত্ব গঠনে ব্যর্থ হয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত আবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রীর ওপরই সওয়ার হতে বাধ্য হবে। ফলে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি জরুরি আইন ঘোষণার সমস্ত উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সামগ্রিকভাবেই ব্যর্থ হবে। এ অভিযানে যেতে সংশ্লিষ্ট জেনারেলরা যে কতটুকু অদক্ষ ও অযোগ্য ছিলেন এ থেকে তারও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এর জন্য জাতিকে দিতে হয়েছে চরমতম মূল্য। দেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর, প্রতিটি শ্রেণীর, প্রতিটি  লোককে তারা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এই সরকার বয়ে এনেছে অবর্ণনীয় দুর্দশা, ক্ষুধা, মৃত্যু, কর্মহীনতা, অবনতিশীল ক্রয়ক্ষমতা ও দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি, যার ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি নির্দেশনা সূচকে ঘটেছে অবনতি। এর ক্ষতিপূরণ দেবে কে?
এ সময়টাতে আমরা লক্ষ্য করেছি দুটি পৃথক সরকারের অবস্থান। একটি ছিল ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাধারণ মানের বেসামরিক সরকার, যারা আমলাতন্ত্রের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করেছে এবং তাদের কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল না। অন্যটি ছিল সেনাপ্রধানের নেতৃত্বাধীন অদৃশ্য কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান একটি সরকার। যদিও সেনাপ্রধান ছিলেন সকল বিষয়ের নেতৃত্বদানকারী এবং ক্ষেত্রবিশেষে তিনি ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশও করেছেন, তথাপি আইনগতভাবে কোনো কর্তৃত্ব না থাকায় এ সময়টাতে জনগণ অব্যাহতভাবে নেতৃত্বশূন্যতার মধ্যেই অবস্থান করেছে।
এ বইয়ের দিনলিপিতে বিধৃত বিবরণী পড়লে দেখা যাবে একটি চেহারাবিহীন, সূত্রবিহীন, চিন্তাবিহীন, নেতৃত্ববিহীন, অদক্ষ, অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ সরকারেরই প্রতিচ্ছবি। তবে মাইনাস-টু থিওরির প্রবক্তা যারা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে মূলধারার রাজনীতি থেকে বহিষ্কার করতে চেয়েছিলেন, তারা এখনো জীবিত ও সক্রিয় রয়ে গেছেন। ভবিষ্যতেও যখন দুই বিবদমান নেত্রী পারস্পরিক রাজনীতি ও অসহিষ্ণুতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাবেন ও জনগণ তা আর রাজনৈতিকভাবে ধারণ করতে পারবেন না, তখন ঐ গোষ্ঠীই আবার ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করতে থাকবে। দুই নেত্রী তাদের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্যেকার দূরত্ব ক্রমশ কমিয়ে আনবেন- এমন সম্ভাবনা খুব কম। তাই সেই একই শক্তির পুনরুত্থানকে একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয় নেত্রীই তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি করেন এবং তাদের ব্যক্তিগত স্টাইলভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে সুশাসনের আওতায় বলে অনেকে মনে করেন। তার পরও এটাও প্রত্যাশা করা অসমীচীন হবে না যে, দুই নেত্রী এক সময় তাদের নিজ নিজ কক্ষপথের বাইরে বের হয়ে আসবেন। দেশের জন্য প্রদর্শন করবেন অসীম সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত এক নতুন পথ যা পুনরায় কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির আগ্রাসনের রাস্তা চিরদিনের জন্য অবরুদ্ধ করে দেশকে নিয়ে যাবে সবরকমের উন্নতির বিস্তৃততর চারণক্ষেত্রে।
এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে আগামী দিনে অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও চর্চায় গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য দুই নেত্রীই নিম্নে বর্ণিত রূপরেখায় একমত হবেন বলে সকলে প্রত্যাশা করে:

১. দলীয়ভাবে মনোনীত হওয়ার পর নিরপেক্ষতা রক্ষা করার জন্য স্পিকার এবং রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দান করা।

২. প্রশাসনকে দক্ষ, গতিশীল এবং নিরপেক্ষ রাখার জন্য মেধা এবং দক্ষতার উপর ভিত্তি করে সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনকে পুনর্বিন্যাস করা।

৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ভাবমূর্তিকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।

৪. বিরোধীদলের প্রতি উপযুক্ত সম্মান এবং সহনশীলতা প্রদর্শন করা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বর্জন করা।

৫. দ্বি-দলীয় (bipartisan) রাজনীতির চর্চা প্রবর্তন করা। জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ে বিরোধীদলের সাথে আলোচনা করা।

৬. সংখ্যানুপাতে সংসদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য সময় এবং আসন  বরাদ্দের বর্তমান নীতি পরিহার করা এবং বিষয়টি স্পিকারের এখতিয়ারে ছেড়ে দেওয়া।

৭. সংসদে বাজেট এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আলোচনার জন্য একই নীতি অনুসরণ করা।

৮. বিরোধীদলের আনীত মূলতবি প্রস্তাব বা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রস্তাবসমূহ গ্রহণ এবং আলোচনা করার ব্যবস্থা করা।

৯. মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত স্থায়ী কমিটিসমূহে সভাপতির দায়িত্ব সংখ্যানুপাতে বিরোধীদলের সদস্যদের উপর অর্পণ করা।

১০ পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি এবং পাবলিক আন্ডার টেকিংস কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধীদলের সদস্যদের উপর অর্পণ করা।

১১. সরকারি এবং বিরোধীদলের সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদের কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালীকরণের জন্য back benchersদের মধ্যে বিভিন্ন caucus গঠনের জন্য উৎসাহদান করা।

এই ন্যূনতম রূপরেখা যদি কার্যকর করা না যায় তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত একটা মহা-অনিশ্চয়তার পথে চলে যাবে যার কোনো সুনির্দিষ্ট চিত্র কারো পক্ষেই অনুমান করা সম্ভবপর নয়।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
Shohag
৫ জুলাই ২০২১, সোমবার, ৪:২১

Barrister moudud is a knowledgeable politician. Also great parliamentian.

অন্যান্য খবর