× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, বুধবার , ৭ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৩ সফর ১৪৪৩ হিঃ
আফগানিস্তান

যুক্তরাষ্ট্রের তিন ট্রিলিয়ন ডলারের ‘পরিত্যক্ত যুদ্ধ’!

এক্সক্লুসিভ

আমীর খসরু
২৭ জুলাই ২০২১, মঙ্গলবার

এখানে মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব পুনরুদ্ধারের জন্য পুনরায় তড়িঘড়ি করে ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছে। ট্রাম্প আমলে যে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছিল, সেই একই দেশ এখন পুনরায় ন্যাটোকে জোরদার ও আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী করতে তৎপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের কর্মতৎপরতার কারণে ন্যাটো এবং এর ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং শৈথিল্যের মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাশাপাশি চীনের নিপুণ কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আগে থেকে নেয়া উদ্যোগগুলো মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো মিত্রদের মনোবল কতোটা চাঙ্গা আছে-তা বিবেচনার দাবি রাখে।
ইতিমধ্যে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিসিয়েটিভ (বিআরআই) এবং এর আওতায় চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর উদ্যোগ বিস্তর এগিয়ে গেছে। এ ছাড়া বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১শ’ বিলিয়ন ডলার মূলধনের চীনের এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশসহ ১০৩টি দেশ ইতিমধ্যে এর সদস্য হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাবে থাকা লাতিন আমেরিকার বহু দেশ এখন তাদের যুক্তরাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে চীনের দিকে ঝুঁকেছে। এ ছাড়া এ বছরেরই মধ্যভাগে চীনের সবশেষ উদ্যোগ ‘চীন-সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিজ প্রভার্টি এলিভিয়েশন অ্যান্ড কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ গঠন করা হয় এবং এতে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান। মালদ্বীপও যেকোনো সময় এতে অংশ নেবে। অনেক বিশ্লেষক নবগঠিত এই সংস্থাকে অকার্যকর সার্কের বিকল্প ও ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিকল্প জোট হিসেবেই মনে করছেন।
চীনের এসব উদ্যোগের বিপরীতে গত মধ্য জুনে জি-৭ দেশগুলোর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড’ বা বিথ্রিডব্লিউ নামের একটি উদ্যোগের প্রস্তাব করে এবং তা গৃহীতও হয়। তবে চীন যখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে তখন বিথ্রিডব্লিউ’র উদ্যোগ কতোটা সফল হবে এবং ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ওই তহবিল কবে যোগাড় ও কার্যকর হবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এসব উদ্যোগ এবং এর পাশাপাশি মালাক্কা থেকে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক বৈরিতার ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব দেখা দেবে অচিরেই।
ইতিমধ্যে তালেবানদের মনে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার ও যুদ্ধ পরিত্যক্ত ঘোষণার মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হয়েছে। ধারণা করা যায় যে, এ কারণেই তালেবানরা নিজেদের মানসিকভাবে আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী ভেবে কম সামরিক শক্তিতেই আফগানিস্তানের একের পর এক এলাকা দখল করছে। ইতিমধ্যে বহু এলাকায় খুবই কম শক্তি প্রয়োগে বেশকিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নিয়েছে। বিভিন্ন দেশের মানুষও মনে করে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরাজয় থেকে যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষা নেয়নি বলেই আবার আফগানিস্তান যুদ্ধকে তারা পরিত্যক্ত ঘোষণা ও সেনা প্রত্যাহারের মধ্যদিয়ে দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে হেরে গেছে। এক্ষেত্রে ১৯৬৯ সালে প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ (Forein Affairs January 1969 Issue)-এ হেনরি কিসিঞ্জার ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছিলেন, সেখানে তিনি বলেন, We (US) fought a military war; our opponents fought a political one. We sought physical attrition; our opponents aimed for our psychological exhaustion. In the process, we lost sight of one of the cardinal maxims of guerrilla war: the guerrilla wins if he does not lose. The conventional army loses if it does not win.
তালেবানদের আদর্শ যতটাই জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হোক না কেন হেনরি কিসেঞ্জারের বক্তব্যের সঙ্গে আফগান পরিস্থিতিরও যে মিল রয়েছে এবং যেকোনোভাবেই হোক এটা খুঁজে পাওয়া যায়।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) গত ১২ই জুলাই এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যান্য হিসাবে এর পরিমাণ ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেয়াসহ সবমিলিয়ে ২০৫০ সাল নাগাদ এই ক্ষতির মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ২৪৪৮ জন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিক, সাধারণ আফগান, তালেবান সদস্যসহ সবমিলিয়ে প্রায় ২ লাখ মানুষকে এই যুদ্ধে জীবন দিতে হয়েছে। এরমধ্যে মানবিক সহায়তাকারী ৪৪৪ জন এবং ৭২ জন সাংবাদিককেও জীবন দিতে হয়েছে। ৪৭ হাজার ২৪৫ জন সাধারণ আফগান নাগরিক এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরাজয়ের পর নিজ দেশেই যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ওই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ গড়ে ওঠেছিল। হয়তো আফগান যুদ্ধ নিয়েও এমন প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মনে ওঠতে পারে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয় অনেকেরই মনেই এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জীবনহানির কি অর্থ হতে পারে?
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ যোশেফ স্টিগলিজ ও লিন্ডা বিময-এর ইরাক যুদ্ধের উপরে লিখিত The Three Trillion Dollar War: The True Cost of the Iraq Conflict- গ্রন্থে বলেছেন, yThe failure in Iraq was not the result of a single mistake but the culmination of doyens of mistakes made over a period of years.P
এই প্রশ্ন আফগান যুদ্ধ সম্পর্কেও উঠতে পারে। অবশ্য এখনই উঠেছে।
(আমীর খসরু, প্রধান নির্বাহী, স্টাডি গ্রুপ অন রিজিওনাল অ্যাফেয়ার্স, ঢাকা)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর