× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার , ৬ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১২ সফর ১৪৪৩ হিঃ
চিকিৎসা পেতে ভোগান্তি

কমছে না ডেঙ্গু

প্রথম পাতা

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার

করোনার মধ্যে ডেঙ্গু জ্বর আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ডেঙ্গুর নতুন ধরনে মানুষ বেশি অসুস্থ হচ্ছেন। বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। সরকার ৬টি হাসপাতালকে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঘোষণা করলেও দু-একটি ছাড়া বাকিগুলোতে যথেষ্ট সেবা মিলছে না। তাই ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। মানুষ উপায় না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ছুটছেন। আর এতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ কমার লক্ষণ দেখছেন না।


এদিকে, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা কমে এলেও এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। মশাবাহিত এই ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যুর খবরও দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এক জরিপে দেখা গেছে, এডিস মশার ঘাঁটি মগবাজার, ইস্কাটন, বাসাবো ও গোড়ান এলাকায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসেও ডেঙ্গু মশা কমার লক্ষণ দেখছি না। এজন্য সুখবর দেয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, এডিস মশা সেপ্টেম্বরে বেশি হওয়ার কারণ হলো আবহাওয়া। ড. কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি নগরবাসীকে আরও সচেতন হতে হবে। এই বছর এপ্রিল ও মে মাস থেকেই বেশ বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা, এই তিনটা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। ফলে জুন মাস থেকেই আমরা আশঙ্কা করছিলাম যে, এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হতে পারে। এসব মিলিয়ে আমাদের ধারণা, সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবটা বেশি থাকবে। আরেকটি কারণ হলো, আমাদের দেশে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। যেমন কোনো একটা এলাকায় সংক্রমিত এডিস মশা দেখা যায়, তখন যদি সেই সংক্রমিত এডিস মশা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে জ্যামিতিক হারে রোগটির বিস্তার দেখা যায়। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ডেঙ্গুর যে রিপোর্টটি পাচ্ছি, আসলে কিন্তু তারচেয়ে সংক্রমণ অনেক বেশি। কারণ অনেক বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে বা বাসায় চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে যায় না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পহেলা জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত  দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ২২১ জন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন আগস্ট মাসেই। এই এক মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৬৯৮ জন। সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে ৩ হাজার ৮৬৫ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকা শহরের বাসিন্দারা। তবে সারা দেশেই ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি ডেঙ্গুর এই সংক্রমণ সারা দেশের মানুষের জন্য নতুন ভীতি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গুর নতুন সেরোটাইপ বা একটি ধরন শনাক্ত করেছেন। ডেনভি-৩ নামের এই ধরনে ঢাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ধরনের কারণে রক্তের কণিকা প্লাটিলেট দ্রুত কমে যায়। এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডেঙ্গু রোগের নতুন ধরনে আগের চেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, দেশে ডেনভি-৩ ধরনের ডেঙ্গু ধরন আমরা প্রথম দেখতে পাই ২০১৭ সালের দিকে। তার আগে ডেঙ্গুর আরও দুইটি ধরন, ডেনভি-১ ও ২) শনাক্ত হয়েছিল। ডেনভি-১ ও ২ এর বিরুদ্ধে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু নতুন এই ধরনটি আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। আগে কেউ ডেঙ্গুর কোনো ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার পর, আবার যদি এই ডেনভি-৩ ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে যান, তাহলে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার আশঙ্কা বেশি হয়। এবারের ডেঙ্গুতে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে।

গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হাসান কনক এ ব্যাপারে জানান, আগের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর শুরুতেই তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা ও বমির উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে পেট ব্যথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে তীব্র জ্বর সব সময়ই ছিল। কিন্তু এবার শুরুতেই একদম প্রথম দিনই শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। তাই আগে যেমন বলা হতো জ্বর হলেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার দরকার নেই; কিন্তু এখন তা না। জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে, ডেঙ্গু শনাক্ত হলে সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। তীব্র জ্বরের পাশাপাশি শরীর ব্যথা বা শারীরিক দুর্বলতাও ডেঙ্গুর অন্যতম একটি লক্ষণ; যা আগেও দেখা যেতো। তবে এবারে যাদের এই সমস্যাটা হচ্ছে তারা খুবই ‘সিভিয়ারলি দুর্বল’ হয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, এবারের ডেঙ্গুতে খাওয়ার রুচিও চলে যাচ্ছে। যার কারণে খুব দ্রুত রক্তচাপ কমে যাচ্ছে। ডেঙ্গু এ বছর শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে ডা. রাশেদুল হাসান কনক বলেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত যেসব শিশু মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি, তাদের বেশির ভাগই পাঁচ থেকে সাতদিনের মধ্যে মারা গেছে, চিকিৎসার সময়ও পাওয়া যায়নি। সবাই ধরেই নিয়েছে ভাইরাল ফিভার, আরেকটু দেখা যাক’, আর এতেই বিপদ এসেছে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। তার পরামর্শ, জ্বর হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। বিগত প্রায় ২০ ধরেই দেশে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এ কারণে নতুন করে আক্রান্তদের অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো সংক্রমিত হচ্ছেন। ডেঙ্গুতে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলেও শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ পর্যায়ে যায় বলে জানান ডা. রাশেদুল হাসান কনক। তিনি বলেন, এবারের পরীক্ষাতে এনএসওয়ান পজেটিভের (ডেঙ্গু পরীক্ষা) সঙ্গে সঙ্গে আইজিজি (আগে সংক্রমিত) পজেটিভ পাচ্ছি। এ জন্যই খুব সম্ভবত, যত দিন যাচ্ছে, ডেঙ্গুর রূপ তত খারাপ হচ্ছে। বর্তমান আবহাওয়া এই পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে-তা এডিশ মশার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ। থেমে থেমে হওয়া এই বৃষ্টি ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখবে। বাড়িতে থাকা ফুলের টব নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে। যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে একদিন পর পর জমে থাকা পানি ফেলে দিতে হবে। কারণ, তৃতীয় দিনের মধ্যেই ডিম থেকে মশার জন্ম হয়ে যায়। তাই তিন দিনের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। রাস্তাঘাট আমরা বদলাতে পারবো না। কিন্তু নিজে যদি সচেতন হই, নিজের বাড়ির ভেতরটা পরিষ্কার রাখা যায়, তাহলেও কিছুটা রক্ষা হবে।

ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩২১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছেন গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪৬ জন। দেশে সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে ৩ হাজার ৮৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গুতে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের এই কয়েকদিনে ৮ জন, আগস্টে মারা গেছেন ৩৪ জন এবং জুলাইতে ১২ জন। আগস্টে ৭ হাজার ৬৯৮ জন, জুলাইয়ে ২ হাজার ২৮৬ জন এবং জুন মাসে ২৭২ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭৫ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৭১ জন। ঢাকার ৪১টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে মোট ভর্তি রোগী আছেন ১ হাজার ৮০ জন। অন্যান্য বিভাগে বর্তমানে ভর্তি আছেন ১৯১ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ২২১ জন। সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন ১২ হাজার  ৮৯৬ জন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর