× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠিইতিহাস থেকে
ঢাকা, ২ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার , ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিঃ

তালেবান নয়, দুর্নীতিই পতন ঘটালো সরকারের!

অনলাইন

তারিক চয়ন
(১ মাস আগে) অক্টোবর ২১, ২০২১, বৃহস্পতিবার, ২:৩৫ অপরাহ্ন
ফাইল ফটো

চলতি অক্টোবর মাসে 'অপারেশন এনডুরিং ফ্রিডম' তথা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের ২০ তম বার্ষিকী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আফগান সরকার এই সময় পর্যন্ত নিজেকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে পারেনি। যার অন্যতম কারণ সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি।

বিখ্যাত বৃটিশ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্ট এর 'আফগান সরকার নিজের দুর্নীতির কারণেই নির্মূল হয়েছে' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- শাসকদের অন্যতম প্রাচীন রোগ দুর্নীতি দ্বারা আফগান সরকার মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল। পুলিশ এবং সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সেবা দিতে 'বকশিস' দাবি করতো।

আহমদ শাহ কাতাওয়াজাই নামের এক সাবেক আফগান কূটনীতিক বলেছেন, "আফগানিস্তানে জন্ম সনদ থেকে শুরু করে মৃত্যু সনদ পর্যন্ত যা যা কিছু আছে সবকিছু পেতেই কোন না কোনভাবে ঘুষ দিতে হবে"।

আফগানিস্তান পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শীর্ষ পর্যবেক্ষণ সংস্থা স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকন্সট্রাক্টশন (এসআইজিএআর) এর প্রধান জন সপকো গেলো বছরই সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, এই মুহূর্তে আফগান সরকার 'সবচেয়ে ছদ্মবেশী যে হুমকি'র মুখোমুখি তা হলো দুর্নীতি। তিনি যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছিলেন কিভাবে আফগানিস্তানে দুর্নীতির কারণে জনসাধারণ এবং সরকারের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে, যার কারণে নাগরিকদের সর্বাধিক মৌলিক পরিষেবাগুলি পেতেও সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হতো। আফগান সরকার দুর্নীতির অভিযোগের বা সমালোচনার কোনো সক্রিয় প্রতিক্রিয়া দেখায়নি বলেও দাবি করেন জন সাপকো।

ওয়াহিদুল্লাহ আজিজি নামে বার্লিন ভিত্তিক একজন বিশ্লেষক এবং দুর্নীতি বিরোধী কর্মী প্রখ্যাত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনে লিখেছেন- "দ্য ডগস আর ইটিং দেম নাও: আওয়ার ওয়ার ইন আফগানিস্তান" বইয়ের লেখক, সাংবাদিক গ্রিম স্মিথ সম্প্রতি বার্লিনে তার "দ্য গোস্টস অফ আফগানিস্তান" নামক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর প্রাক্কালে আমাকে বলেন যে, গত ২০ বছরে যে দুর্নীতি হয়েছে তা আফগান সরকারের পতনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও এটিকে 'সাইড ইস্যু' হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

আজিজি লিখেছেন, আফগানিস্তানের দুর্বল বিচার বিভাগ প্রায়শই শক্তিশালীদের ইচ্ছার সামনে ঝুঁকে পড়ে, যারা তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক সংযোগের কারণে সুবিধা নিতে পারে। অন্যরা যারা কম ভাগ্যবান এবং এই ধরনের সুবিধা পেতে অক্ষম তাদের ঘুষ দিতে হয় এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে হতাশায় ভোগেন। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষ (এক অনুমান অনুসারে ৮০ শতাংশ) অনানুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা ব্যবহার করে অথবা সাহায্যের জন্য তালেবানদের কাছে ফিরে যায়। আফগান সরকারের বৈধতাকে (যা তার খুব প্রয়োজন ছিল) দুর্বল করতে এ সবকিছু একটা বড় প্রভাব ফেলেছিল।

দুর্নীতি যে তালবানদের ক্ষমতা দখলে ব্যাপক সাহায্য করেছিলে তার প্রমাণ পাওয়া যায় দ্য ওয়ার্ল্ডকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জন সপকোর বক্তব্যেওঃ শেষ পর্যন্ত এটি (দুর্নীতি) তালেবানদের সাফল্যে অবদান রেখেছে। আফগান জনগণ দেখেছিল যে তাদের সরকার কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অযোগ্য এবং তারা এটাও দেখছিল যে অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। সুতরাং, সরকারের প্রতি তাদের আর কোন সম্মান থাকে না এবং সরকারের উপর থেকে তারা নিজেদের সমর্থনও তুলে নেয়। তারা দেখেছিল, সরকার তাদের অর্থ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদার ও দাংগাবাজদের দিচ্ছে।

দ্য ওয়ার্ল্ড ওই প্রতিবেদনে বলে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে শুরু থেকেই সেই সাহায্য প্রচেষ্টা জর্জরিত হয়।

আফগানিস্তান সরকারের পতনের সঙ্গে দেশটির সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার অভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতির যোগসূত্র দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ এবং পর্যবেক্ষক।

আগস্টে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর আজমল আহমেদি জানান, দেশে দুর্নীতি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ায় তা নেতাদের আত্মবিশ্বাসে বেশ বড় চিড় ধরিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই কি তালেবানের পুনরুত্থানের কারণ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, এটা একমাত্র কারণ নাকি বড় কারণ? তাহলে আমি বলবো এটা একটা অনেক বড় কারণ"।

আজমলের সুরেই কথা বলেন আফগানিস্তান বিষয়ক জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ দূত পিটার গ্যালব্রেইথ। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়- সরকারের পতন বিষয়ে পিটার বলেছেন, "আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনীর তুলনায় তালেবান বাহিনী অনেক ছোট। সরকারি বাহিনীর মতো তাদের কাছে আধুনিক কোনো অস্ত্রশস্ত্রও নেই। এমনকি তাদের কোন বিমানবাহিনীও নেই। কিন্তু, সরকারে এত দুর্নীতি হয়েছে যে, পুলিশ সদস্য ও সৈনিকেরা মাসের পর মাস বেতন পাননি। তাদের ঠিকমতো গুলি ও খাবার সরবরাহ করা হয়নি। এর মধ্যেই যখন পতন শুরু হয়, ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তাদের কেউ তালেবানের বিরুদ্ধে লড়তে চান না"।

তবে, এটাও ঠিক, আফগানিস্তানের সরকার দুর্নীতি বিরোধী বেশকিছু ভালো পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো সফল হয় নি। 'এন্টি করাপশন এজেন্সি'র অনেকেই সরকারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করার পরিবর্তে ব্ল্যাকমেইলিং করেন। তদুপরি আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি ভবন এবং এমপিদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্নীতি আরো বেড়েছে।
দুর্নীতি আফগান সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুপ্রবেশ করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি এবং তার পূর্বসূরি হামিদ কারজাই দুজনই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এন্টি করাপশন এজেন্সিকে "আক্রমণকারী কুকুর" হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

যদিও তালেবানরা দুর্নীতির বিষয়ে একেবারেই সহনশীল নয় বলে পরিচিত কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যে যুদ্ধের ময়দানে সাফল্য অর্জনের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে সেটা বলাবাহুল্য।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর