× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠিইতিহাস থেকে
ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, বুধবার , ৫ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩ হিঃ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানে অভিভূত পাকিস্তান

মত-মতান্তর

পথিক হাসান
২৯ অক্টোবর ২০২১, শুক্রবার
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ তার স্থান করে নিয়েছিল। মূলত বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে শোষণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল পাকিস্তানের অর্থনীতি। ফলে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশ পেয়েছিল একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত অবকাঠামো ব্যবস্থা। তখন অনেক অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্বনেতারা বাংলাদেশকে একটি আশাহীন অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে "তলাবিহীন ঝুড়ি" বলে অভিহিত করেছিলেন। স্বাধীন দেশ হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারেও সন্দিহান ছিলেন অনেকে। কিন্তু, ফিনিক্স পাখির মতন ভস্ম হতে বাংলাদেশের উদয়ে বিশ্ব আজ বিস্মিত এবং উদ্বেলিত।
যদিও চলার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের বাস্তবতা ছিল বেশ কঠিন। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিশ্রুত শোষণমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, দুর্বৃত্তরা তা পছন্দ করেনি। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থই তাদের কাছে অধিক প্রিয় হয়ে উঠেছিল। ফলে, দীর্ঘসময় ব্যাপী রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগী হয় এদেশের মানুষ। কিন্তু, সময় এখন বদলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে তার বাবার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি এদেশের মানুষ যারা দেশে এবং বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে তাদেরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। অবশ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব ছাড়া এটি প্রায় অসম্ভব ছিল। বাংলাদেশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে উদীয়মান তারকা হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত এবং সমৃদ্ধদেশে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর। দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এখন বিশ্বের অনেক দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি পাকিস্তানের সাংবাদিকেরাও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের প্রশংসা করছেন। পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় এবং মতামত বিভাগেও বাংলাদেশের প্রশংসা করছে।
পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক "এক্সপ্রেস ট্রিবিউন" ৫ই অক্টোবর "বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য উত্থান" শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে 'বাংলাদেশ অপ্রত্যাশিত এবং চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখিয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ২০০৬ সালে পাকিস্তানকে অতিক্রম করেছিল এবং এরপর থেকে এটি প্রতি বছর পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে এবং নেতৃত্ব স্থানীয় অর্থনীতিবীদদের অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির একটি। বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের কাছাকাছি এবং পাকিস্তানের চেয়ে বেশি।
একজন পাকিস্তানি অর্থনীতিবীদ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক উপদেষ্টা পাকিস্তানের আরেকটি সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল -এ ২৪ মে, ২০২১ তারিখে ‘এইড ফ্রম বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তার নিবন্ধে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান যদি এর অর্থনীতি পূর্ণগঠনে সচেষ্ট না হয় তবে ২০৩০ সালে বাংলাদেশের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
খ্যাতিমান পাকিস্তানি সাংবাদিক জায়গাম খান, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাপিটাল টিভিতে 'আওম' শিরোনামের একটি টেলিকাস্ট টক-শোতে অংশ নেওয়ার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে পাকিস্তানের অগ্রগতি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করার পরামর্শ দেন। তিনি টকশোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পাকিস্তানকে সুইডেনের পরিবর্তে বাংলাদেশের আদলে গড়ে তুলতে আহবান জানিয়েছেন। এটা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি পাকিস্তানকে সুইডেনের আদলে উন্নত দেশে পরিণত করবেন।

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনিস আহমার তার প্রবন্ধের শিরোনামে লিখেছেন, আজ পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ কিভাবে এবং কেন উন্নত? ২০২১ সালের ২১ মার্চ 'এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে' বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশকে "কাঙ্গাল" হতে একটি "অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত দেশে" রূপান্তরিত করতে চারটি বিষয় অবদান রেখেছে: নেতৃত্ব, উদ্ভাবন, পরিকল্পনা এবং মালিকানা।
এমনকি, পাকিস্তান টুডে, দ্য পাক অবজারভার, ফ্রন্টিয়ার পোস্ট (পাকিস্তানের প্রধান ইংরেজি দৈনিক) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদেশের অর্থনীতি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি হচ্ছে। 'পাকিস্তান অবজারভার' এর একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিতে উদীয়মান তারকা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। 'পাকিস্তান টুডে' তার একটি নিবন্ধে লিখেছে, বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ তার অর্থনীতিকে সচল রাখতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ 'পাকিস্তানের ক্রিশ্চিয়ান পোস্ট' এ, পাকিস্তান সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উত্থানের মডেল অনুসরণ করতে পারে শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে বিপুল মূল্যস্ফীতি হতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অবশ্যই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান মডেল অনুসরণ করতে হবে।
২৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের 'ডেইলি পার্লামেন্ট টাইমস' পাকিস্তান সহ দক্ষিণ এশিয়া বাংলাদেশের 'ইকোনমিক রাইজ মডেল' অনুসরণ করতে পারে শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। লেখক বলেছেন, বাংলাদেশ যদি শ্রীলঙ্কাকে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিতে পারে, আইএমএফ হতে প্রাপ্ত ঋণ আদায়ে ব্যর্থ সোমালিয়া এবং সুদান এর সেই ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ, কোভিডে মহামারিতে ইন্দোনেশিয়াকে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দিয়ে সাহায্য করতে পারে, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে পারে তবে, পাকিস্তানকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার মাধ্যমে বাংলাদেশ অবশ্যই সম্মানের দাবিদার।

২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ পাকিস্তানের আরেকটি জনপ্রিয় স্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'ডেইলি সুন টাইমস' "পাকিস্তান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান অনুসরণ করতে পারে" শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এতে পাকিস্তান সরকারকে সরাসরি বাংলাদেশকে অনুসরণ করার বিষয় উল্লেখ করা হয়। একসময়কার পাকিস্তানের শোষিত উপনিবেশ হিসেবে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি অতি মর্যাদার বিষয়। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এর একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, এশিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানের মতন অর্থনৈতিতে দ্রুত বর্ধনশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশ তার স্থান করে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। এটা সত্যিই অবাক করার বিষয় যে পাকিস্তান এখন বাংলাদেশের প্রশংসা করছে। যদিও বাংলাদেশের বয়স পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৭৪ বছরের তুলনায় মাত্র ৫০ বছর পার করল। পাকিস্তান যদি এ দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ না করত, তাহলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো অনেক বেশি এগিয়ে যেত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানে পাকিস্তানও এখন বিস্মিত এবং তাদের প্রশংসাকে সর্বজনবিদিত বাংলাদেশের সাফল্যের প্রতিচিত্র হিসেবে গণ্য করা যায়।

লেখক: গবেষক ও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর বিশ্লেষক।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর