× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ১০ আগস্ট ২০২২, বুধবার , ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১২ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

মৃত 'মীরজাফর', জীবিত 'মীরজাফর'!

মত-মতান্তর

ড. মাহফুজ পারভেজ
১৩ নভেম্বর ২০২১, শনিবার

পলাশীর ষড়যন্ত্রকারী 'মীরজাফর' মারা গেছেন কয়েক শতাব্দী আগে। হাজার বছর আগে, গ্রিক ও রোমান রাজদরবারের ট্রেইটর, কন্সপিরেটর প্রভৃতি চক্রান্তকারী ও গুপ্ত ষড়যন্ত্রীরাও তিরোহিত হয়েছেন। তথাপি, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের প্রলম্বিত ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। 'মৃত মীরজাফরের' মতো আলোচিত হন 'জীবিত মীরজাফর'।

পোষাক, চেহারা, আচরণ দেখে 'মীরজাফর' শনাক্ত করা যায় না। মীরজাফর থাকে আর দশজনের সঙ্গে মিশে। হাবভাব অনুযায়ী তাকে মনে হয় আনুগত্যের প্রতীক। অথচ তার মনের মধ্যেই লুক্কায়িত থাকে ষড়যন্ত্রের হিংস ছোবল। ফলে ইতিহাসে 'মীরজাফর' কেবল একটি নামই নয়, একটি চক্রান্তমূলক জঘন্যতম বৈশিষ্ট্য বিশেষ।
'মীরজাফর' একজন ব্যক্তি হিসাবে নাউন বা বিশেষ্য। আবার খলতার অভিধা হিসাবে 'মীরজাফর' বিশেষণ। একজন ব্যক্তির নাম যা-ই হোক না কেন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তিনি 'মীরজাফর' হতে পারেন। কেবল ১৯৫৭ সালেই নয়, কালে কালে বহুজন 'মীরজাফর' হয়েছেন এবং হবেন। 'মীরজাফর' নামের চরিত্র বা ক্যারেক্টার সর্বকালের সর্বসমাজেই গোপনে জীবন্ত। কখন যে কে 'মীরজাফর' নামক ঘৃণ্যতম স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবেন, সেটাই যেকোনও শাসকের জন্য চূড়ান্ত ভয়ের বিষয় ও চরম বিপদের কারণ।

বাংলার রাজনীতির আদি যড়ষন্ত্রের অন্ধি-সন্ধি সম্পর্কে জানতে হতভাগ্য শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহ, আগ্রাসী দখলদার রবার্ট ক্লাইভের পাশাপাশি যড়ষন্ত্রী 'মীরজাফর'কেও সম্যকরূপে জানা জরুরি।

কিন্তু নবাব সিরাজের একাধিক জীবনী আছে। ক্লাইভেরও মস্ত বড় জীবনচরিত রচিত হয়েছে ইংরেজ ও ইংরেজ অনুগত লেখকের হাতে। অথচ কুটিল রাজনীতির জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র 'মীরজাফর'কে নিয়ে গবেষণা বা জীবনীগ্রন্থ আছে বলে জানা যায় না। ফলে একজন মীর জাফর আলী খান, কেন এবং কি কারণে কুখ্যাত 'মীরজাফর' হয়ে উঠলেন, সেটা প্রায়শই অস্পষ্ট থাকে। কি পরিস্থিতি এবং কাদের প্ররোচনায় একদার বীর সেনাপতি 'মীরজাফরে' রূপান্তরিত হলেন, তা অজানা থেকে যায়।

বর্গি-মারাঠা হামলাকারীদের দমন ছাড়াও বিভিন্ন যুদ্ধে মীর জাফর আলী খান সামনের কাতারে থেকে লড়েছিলেন। নবাব আলীবর্দি খানের বিশ্বস্ত অনুচরদের অন্যতম ছিলেন এই সেনাপতি ও আত্মীয়। কিন্তু আলীবর্দি খানের মৃত্যুর পর তরুণ সিরাজ নবাব হলে আগের সেই সাহসী ও দুর্ধর্ষ সেনাপতি মীর জাফর আলী খানকে আর দেখতে পাওয়া পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় এক ক্ষুব্ধ রাজপুরুষরূপে ঘৃণ্য যড়যন্ত্রী 'মীরজাফর'কে।

অতএব কোন্ প্রেক্ষাপটে, কি কারণে এবং কাদের প্ররোচনায় তিনি নিন্দিত 'মীরজাফরে' পরিণত করলেন নিজেকে, এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে তার বা তার কার্যক্রম সম্পর্কে পুরোটা জানা অসম্ভব। জগৎশেঠ, রায় বল্লভদের না জানলেও 'মীরজাফর'কে জানা হয় না। এটা জানা এজন্যই জরুরি এই কারণে যে, বিশেষ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্বার্থগত কারণে যে কোনও মানুষই 'মীরজাফর' হয়ে যেতে পারেন। এমনটি ব্রিটিশ আমলে যেমন হয়েছে, আজকেও হওয়া সম্ভব। এজন্য সিরাজ বা ক্লাইভের মতো 'মীরজাফরের' জীবনীও জানা জরুরি, যা থেকে কোনও মানুষের 'মীরজাফরে' রূপান্তিত হওয়ার প্রবণতা সম্পর্কিত ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

'মীরজাফরের' কোনও জীবনী না থাকলেও একটি নাটকে 'মীরজাফর'কে কেন্দ্রীয় চরিত্র করা হয়েছে। কলকাতার ব্রাত্য বসুর 'মীরজাফর' নাটকটি গিরিশ মঞ্চে কমবয়সি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছেলেমেয়ের মনোসংযোগ আকর্ষণ করেছিল, যারা 'মীরজাফর' সম্পর্কে নতুন করে সবিস্তারে জানতে চায়, এমনটিই সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়।

নাটকটির তরুণ দর্শকরা ছিল ঝকঝকে। শুধু স্মার্ট ফোন নয়, জাপানি ঔপন্যাসিক মুরাকামির উপন্যাস এবং ইরানি চলচ্চিত্রকার মাজিদ মাজিদির সিনেমা নিয়েও এরা ওয়াকিবহাল। আবার ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট পলিটিক্স থেকে কর্পোরেট কালচারের খুঁটিনাটিও শিখে ফেলছে তারা। এরা 'মীরজাফর' দেখে মুগ্ধ হয় বলেও মিডিয়াকে জানিয়েছে।

কেন তারা মুগ্ধ? কী আছে 'মীরজাফরে'?‌ তা জানতে নাটকের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায়। 'আজকাল' পত্রিকার এক পুজাসংখ্যায় ব্রাত্য বসুর নাটকটি প্রকাশিত হয়েছিল। নাটক না দেখলেও নাটকটি আমি পড়েছি। নাটকের ব্যাপক জনপ্রিয়তার খবর পেয়ে আমি আবারও সেটি পড়ি।

নাটকের মূল কাহিনী নিয়ে বেশি বলার কোনও মানে হয় না। কম-বেশি সকলেই তা জানেন। পলাশীর যু্দ্ধের পরের সাত বছরের বাংলার ইতিহাস এতে আছে। ষড়যন্ত্রবাদী যুদ্ধে সিরাজকে সরিয়ে, জনসমর্থন নয়, দখলদার ইংরেজের বদান্যতায় 'মীরজাফর' বাংলার সিংহাসনে বসলেন। তারপরই পুতুল 'মীরজাফর'কে ভর করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির থাবা বাড়তে লাগলো। এই হল প্রেক্ষাপট। মূলত দুজনের গল্প। 'মীরজাফর' এবং লর্ড ক্লাইভ। সিরাজ তখন রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যপটের অন্তরালে ও মৃত। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার অলিন্দে আসীন জগৎশেঠ, রায় বল্লভদের পোয়াবারো। সে সময় তাদের লোভ, লালসা, ক্রূরতা, জয়, পরাজয়ের গল্পটিই নাটকে বলা হয়েছে। মানব চরিত্রের গহীনের অন্ধকারে আলো ফেলতে ফেলতে ভয়ে, বিস্ময়ে, চমকে উদ্ভাসিত হয়েছে ইতিহাসের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও নির্মমতা।

কিছুদিনের জন্য বাংলায় ‘‌মীরজাফর জিন্দাবাদ’ শ্লোগান উচ্চারিত হলেও কালের বিচারে তা নিভে যায়। দৃশ্যপটে আসে ক্লাইভ প্রমুখের প্রকৃত উপস্থিতি। মূল যড়ষন্ত্রের জায়গাটিতে পৌঁছার আগে মীরজাফর আসলে অন্তর্বতীকালীন কুহেলিকা। এই সত্যের বয়ানে ইতিহাস থেকে থিয়েটারটি লাফ দিয়ে স্পর্শ করেছে প্রকৃত বাস্তবতা।

আসলে ইতিহাস সুখপাঠ্য হলেও এর সমকালীন বাস্তবতাতেই মানুষের মূল আগ্রহ। ফলে নাটকের মঞ্চের চারপাশে 'মীরজাফর' এবং পেছনের প্রকৃত যড়ষন্ত্রীগণের ছবি দেখতে পেয়ে নতুন প্রজন্ম উদ্বেলিত। ইতিহাসের সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন অনুসন্ধানে তারা মনোযোগী।

ইতিহাসের 'মীরজাফর' আসলে শুধু নিজেকে দেখান না, চারপাশে লুকিয়ে থাকা আরও অনেক 'মীরজাফর'কেও উন্মোচিত করেন। আমাদের কালে, আমাদের আশেপাশে ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা বিষধর 'মীরজাফর' গং সম্পর্কে জানান দেন ইতিহাসের 'মীরজাফর'। মৃত 'মীরজাফরের' হাত ধরে খিলখিল করেন জীবিত 'মীরজাফরগণ'!

অতীত ইতিহাসের যড়ষন্ত্রকারীদের অন্যতম একজন 'মীরজাফর' বর্তমানের যড়ষন্ত্রমূলক কালো-কুটিল-বিশাল চক্রব্যূহে বিরাজমান 'মীরজাফর' সম্পর্কে জানার মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন নাটকের মঞ্চে। হলের দর্শকদের আনন্দ ও জ্ঞান বর্দ্ধন করেছে 'মীরজাফর' শিরোনামের নাটকটি। ইতিহাস বা নাটক, যেকোনও মাধ্যমের অবলম্বনে বর্তমানের প্রকৃত 'মীরজাফর' চিনতে পারাটাই আসলে জরুরি। কারণ 'মৃত মীরজাফর' প্রাসঙ্গিক হলেও বর্তমানের কালপ্রবাহে লুক্কায়িত 'জীবিত মীরজাফর' অনেক বেশি বিপদজনক।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর