× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ১০ আগস্ট ২০২২, বুধবার , ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১২ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

সঙ্কটে মানবিকতার জয় কিংবা পরাজয়

মত-মতান্তর

ড. মাহফুজ পারভেজ
১৮ নভেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার

যুগে যুগে, ঐতিহাসিকভাবেই, সঙ্কটে মানুষের মানবিকতার জয় হয়েছে। যুদ্ধ, মারি, মন্বন্তর, সংঘাত, বিপদ ও সঙ্কটে মানবিক হৃদয়বৃত্তিতে মানুষ দাঁড়িয়েছে বিপন্ন মানুষের পাশে। এমনকি, সঙ্কটাপন্ন ও রোগাক্রান্ত চিরশত্রুকেও সাহায্য করতেও পিছপা হয়নি সমাজের মানুষ।

সঙ্কটে মানবিকতার জয় নিয়ে মহত্তম উপন্যাস, নান্দনিক চলচ্চিত্র রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চরম নৃশংসতার মধ্যেও প্রস্ফুটিত হয়েছে মানবিকতার দীপ্তি। বরং সঙ্কটে মানবিকতার জয়ই সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচায়ক।

বাস্তবিক অর্থে মানবিকতার বন্ধন ব্যতিরেকে সমাজ চলতে পারে না। যত কিছুই হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানবিকতার জয়ধ্বনি করতে হয়। এই চিরায়ত শিক্ষা মনে হয় অবক্ষয়ের পথে।
বরং এক চরম নিষ্ঠুর অমানবিকতায় শিহরিত হচ্ছে সমাজ।

করোনাকালের ঘোরতর সঙ্কটেও দেখা গেছে ভুল রিপোর্ট ও মিথ্যা সার্টিফিকেট বিক্রি হয়েছে। আইলা, ঘূর্ণিঝড়ে অসহায় গৃহহীন মানুষের জন্য বরাদ্দ চাল, ডাল, অর্থ তছরুপ করা হয়েছে। বকশিসের টাকা না পেয়ে অক্সিজেনের নল খুলে মরণাপন্ন রোগীকে মেরে ফেলা হয়েছে। বাস ভাড়া না পেয়ে বা বিতণ্ডার জেরে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়েও মানুষ মারা হয়েছে।

এখন বাসভাড়া বিষয়ক সঙ্কটে চলছে চরম অমানবিকতা। ভাড়া নিয়ে তর্কের এক পর্যায়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয়া হলো এক যাত্রীকে। কী ভয়ঙ্কর ও নিষ্ঠুর কাহিনি! গত ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে চলন্ত বাস থেকে যাত্রীকে ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম নগরীতে। নগরীর শুক্রবার লালখান বাজার ইস্পাহানি মোড়ে রাত নয়টার দিকে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

যদিও এ ঘটনার পর যাত্রীকে ফেলে দিয়ে বাসটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে চালক। কিন্তু অন্য যাত্রীরা টাইগারপাস এলাকায় বাসটি আটক করে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। এ ঘটনায় বাসের চালক ও তার সহকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ভুক্তভোগী যাত্রী বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় এ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।

এহেন অমানবিকা কেবল চট্টগ্রামে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানেই দৃষ্টিগোচর হয়, যা মানুষ ও মানবিকতাকে ভূলুণ্ঠিত ও মর্মাহত করে। শুধু সাধারণ ও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই নয়, সঙ্কটকালেও মানবিকতার বদলে নৃশংসতা বা অমানবিকতার প্রদর্শনী সত্যিই বেদনাদায়ক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানবতাহীন পাশবিক সমাজের ভবিষ্যৎ কোথায়? কোন গন্তব্যে চলেছে এই অমানবিকতার তাণ্ডব?

ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মানুষ মানবিকতা প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা দেখে ভাবতে কষ্ট হয়। ভয় ও দুর্ভাবনা বাড়ে। হতাশা বৃদ্ধি পায়। অথচ ঐতিহাসিকভাবেই মানবসমাজ ও জীবন নৈতিকতা ও মানবিকতাপূর্ণ ছিল। পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গনও ছিল সৌহার্দ্যে ভরপুর।

কেন এবং কিভাবে যেন সমাজ থেকে শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতা ব্যাপকভাবে উধাও হয়ে গেছে। সেবা দেয়ার বা সেবা নেয়ার সময়ও থাকে না মানবিকতার স্পর্শ। মানুষ কেবল ছুটছে ক্ষমতা, শক্তি, আত্মস্বার্থের বিশাল চাহিদার দিকে। সবাই হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছে অর্থ ও আধিপত্যের পেছনে অতৃপ্ত মনে, অশান্ত ও অস্থির হৃদয়ে। অল্পে সন্তুষ্ট থেকে সহজ-সরল, সুস্থ ও সুন্দর জীবন-যাপনে সকলের অনীহা।

ব্যক্তিজীবনের এমন নেতিবাচক পরিবর্তন হলো কেন? কে বা কারা এমন অমানবিকতার বিকাশ ঘটাচ্ছে? এসব প্রশ্ন সুরাহা হওয়া দরকার। কাউকে না কাউকে মানবিকতার পক্ষে, সৌহার্দ্যের পক্ষে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই হবে। নচেৎ অমানবিকা ও স্বার্থপরতা চলতেই থাকবে।

কোনও কোনও দার্শনিক বলছেন যে, 'মানুষের অনৈতিক ও অমানবিক কর্মকাণ্ডে পৃথিবী এখন বেসামাল। অর্থবিত্ত ও প্রতাপের মোহে আর সব করণীয় ভুলে মানুষ এখন ছন্দহারা, দিশাহারা। ফলে মানব মনে নেমে এসেছে শূন্যতা, হতাশা ও অস্থিরতা ও বিষণ্নতা।'

শুধু তাই নয়, ‘শক্তি যার জীবন তার’ বিবর্তনবাদের প্রবক্তা চার্লস ডারউইনের এই তত্ত্ব প্রকৃতির নিয়ম ও পরিসরে যেন প্রবলতর হয়ে উঠছে। ক্ষুদ্র, দুর্বল, ভিন্নমতের জন্য কোনও পরিসরই রাখা হচ্ছে না। অথচ মানব জাতির বেলায় এই নীতি মেনে নেওয়া মানে পশু জীবনে নেমে যাওয়ার শামিল।

মানব সভ্যতার উত্থান পতন এক চলমান প্রক্রিয়া। মহান আল্লাহ্‌ পবিত্র কোরানে বার বার উল্লেখ করেছেন, মানব সমাজে যখনই নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্রষ্টা-সচেতনতা লোপ পায় তখন তিনি সেই সভ্যতা ধ্বংস করে দেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে, যেমন- ঝড়, তুফান, খরা, অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, মহামারী ইত্যাদি দিয়ে।

এতোসব শিক্ষা দেখেও আমরা সতর্ক হই না। আত্মস্বার্থ ও অমানবিকতাকেই গ্রহণ করি। মানবিকতার পরাজয়েও দুঃখিত বা পীড়িত হই না। এমন প্রক্রিয়ায় মানবতার যে স্খলন, পতন ও পরাজয় হচ্ছে, তা ঠেকাবে কে?
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর