× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ১৯ মে ২০২২, বৃহস্পতিবার , ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৭ শওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

চার ক্লু ঘিরে তদন্ত / অভিনেত্রী শিমুকে শ্বাসরোধে হত্যা

প্রথম পাতা

মরিয়ম চম্পা
১৯ জানুয়ারি ২০২২, বুধবার

দাম্পত্য কলহের জেরে গ্রীন রোডের নিজ বাসায় চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমুকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন স্বামী খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেল। অভিনেত্রীর গলায় দাগ পাওয়া গেছে। রশি অথবা ওই জাতীয় কিছু গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ ছাড়া তার দুই চোয়াল, ঘাড়সহ তিন স্থানে নখের আঁচড়সহ আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে, ফরেনসিক সূত্র। এদিকে নিহত শিমুর পরিবারের অভিযোগ স্বামী নোবেল মাদকাসক্ত হওয়ায় তাকে বিভিন্ন সময় শারীরিক নির্যাতন করতেন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে নোবেল এবং তার এক বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। এদিকে গত সোমবার সকালে কেরানীগঞ্জের কলাতিয়ায় একটি ব্রিজের পাশের ঝোপঝাড় থেকে বস্তাবস্তি অবস্থায় শিমুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতের বড় ভাই এস আই খোকন বোনের মৃতদেহ শনাক্ত করেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিনেত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না উল্লেখ করে রোববার রাতে শিমুর স্বামী রাজধানীর কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
ডায়েরিতে উল্লেখ করেন, তার স্ত্রী শিমু রোববার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে কাউকে কিছু না বলে চলে যায়। এরপর আর বাসায় ফেরত আসেননি।
সাধারণ ডায়েরিতে শাখাওয়াত নোবেলের পেশা হিসেবে বলা হয় বর্তমানে তিনি বেকার জীবনযাপন করছেন। এর আগে বাংলামোটরে তার মোটরপার্টসের দোকান ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বামী এবং দুই ছেলে-মেয়ে রাজধানীর গ্রীন রোডের ৩৪ গ্রীন রোড, ফ্ল্যাট নাম্বার ২০১ তৃতীয় তলায় থাকতেন। এই বাসার নিজ ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যা শেষে মরদেহ ফ্ল্যাটের কক্ষে লুকিয়ে রেখে লাশের কাছাকাছি কয়েক ঘণ্টা তিনি অবস্থান করেছেন। বস্তাবন্দি মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত শিমুর স্বামী গ্রীন রোডের বাসায় একদম স্বাভাবিক ছিলেন। রহস্যজনক কারণে সোমবার সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত তাদের ভবনের সিসি টিভি ভিডিও ক্যামেরা বন্ধ ছিল। এ ছাড়া এই দুই ঘণ্টা সময় শিমুর স্বামী তাদের গ্রীন রোডের বাসায় ছিলেন না। হত্যা শেষে লাশ গুম করতে তিনি বিভিন্ন ছক কষেন। সেই ছকের অংশ হিসেবে বাল্যবন্ধু এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদকে ডেকে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে একটি সাদা রংয়ের প্রাইভেট গাড়ির ব্যাগডালায় পাটের তৈরি বস্তায় ভরে মরদেহটি নিয়ে সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে তারা বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন। কেরানীগঞ্জ থানাধীন কলাতিয়ার হজরতপুর ইউনিয়নের আলীপুর ব্রিজের উত্তর পাশে মরদেহটি ফেলে আসেন। এ সময় মরদেহের পরনে নীল রংয়ের কামিজ এবং সাদা রংয়ের পাজামা ছিল। এ ঘটনার পর শিমুর স্বামী নাটকীয়ভাবে একাধিক গণমাধ্যমের কাছে সাক্ষাৎকারে বলেন, তার স্ত্রী দুইদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। মাওয়ায় শুটিং রয়েছে বলে বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যান।
পুলিশ ইতিমধ্যে মরদেহ বহনকারী গাড়িটি জব্দ করেছে। গাড়ির পেছনের ডালায় রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মরদেহ পাওয়ার পরপরই নোবেল এবং তার বন্ধু ফরহাদকে সঙ্গে নিয়ে গতকাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দিনভর অভিযান পরিচালনা করে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করেন। শিমুর বড় ভাই হারুন অর রশিদ বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় নোবেল, তার বন্ধু ফরহাদকে প্রধান এবং অজ্ঞাত আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত জীবনে শিমু-নোবেল দম্পতির সংসারে দুটি ছেলেমেয়ে রয়েছে। চার ভাই-বোনের মধ্যে শিমু ছিল তৃতীয়। শিমুর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। এ ছাড়া তার নিজের কোনো উপার্জন ছিল না। পারিবারিক কলহের জেরে বিভিন্ন সময় তিনি শিমুকে শারীরিক নির্যাতন করতেন। এর আগেও একাধিকবার তিনি শিমুর গায়ে হাত তুলেছেন। পরবর্তীতে নিজেরাই মীমাংসা করে নিয়েছেন। শিমুর বড় ভাই হারুন বলেন, আমার বোনকে এভাবে মেরে ফেলবে আমরা কখনো চিন্তা করতে পারিনি। কি এমন দোষ করেছিল শিমু তাকে প্রাণেই মেরে ফেললো। সমস্যা হলে আমাদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করতে পারতেন। খুনির দৃষ্টান্তমূলক এবং সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন এই অভিনেত্রীর ভাই।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার শাহাবুদ্দিন কবীর মানবজমিনকে বলেন, শনিবার শেষ রাতে হত্যা শেষে মরদেহ নিয়ে সারাদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। রোববার রাতে মরদেহ কেরানিগঞ্জে ফেলে দিয়ে সাধারণ ডায়েরি করে শিমুর স্বামী।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিভাগের জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দাম্পত্য কলহের জেরে চিত্রনায়িকা শিমুকে তার স্বামী খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেল হত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। হত্যাকাণ্ডে আসামির বাল্যবন্ধু এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদ জড়িত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, অভিনেত্রী শিমু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার আগেই জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। সেই সঙ্গে জব্দ করা হয়েছে মরদেহ লুকানোর কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন আলামত। হত্যার মোটিভ হিসেবে তিনি বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে এই হত্যাকাণ্ড। তদন্তের স্বার্থে এর বাইরে কিছু বলা যাচ্ছে না। তার স্বামী হত্যার দায় স্বীকার করে প্রাথমিকভাবে বলেছে দাম্পত্য কলহের কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হত্যার পর মৃতদেহ লুকিয়ে নিখোঁজ নাটক সাজাতে চেয়েছিল তারা।
মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, চিত্রনায়িকা রাহিমা ইসলাম শিমুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল দুপুরে মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় শিমুর। এ সময় তার গলায় আঘাতের দাগ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে রশি অথবা ওই জাতীয় কিছু গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘বর্তমান’ ছবির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় অভিনেত্রী শিমুর। এরপর দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, চাষী নজরুল ইসলাম, শরিফ উদ্দিন খান দিপুসহ আরও বেশকিছু পরিচালকের প্রায় ২৫টির মতো চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন শা?কিব খান ও অমিত হাসান?সহ বেশকিছু তারকার সঙ্গে। চল?চ্চি?ত্রের পাশাপা?শি ক?য়েক?টি টি?ভি নাটকে অভিনয় ও প্রযোজনা ক?রে?ছেন তিনি। শিমু বাংলা?দেশ চল?চ্চিত্র শিল্পী সমিতির সহ?যোগী সদস্য ছিলেন।
অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় স্বামী নোবেল ও নোবেলের বন্ধু আব্দুল্লাহ ফরহাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শুনানি শেষে সন্ধ্যায় ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই রিমান্ডের আদেশ দেন। এর আগে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক চুন্নু মিয়া আসামিদের আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আসামিদের দণ্ডবিধি আইনের ৩০২ ও ৩৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই চুন্নু মিয়া বলেন, কি কারণে একজন নায়িকাকে হত্যা করা হলো? এর পেছনের রহস্য কি? হত্যার উদ্দেশ্য উদ্ঘাটনের জন্য আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। এর আগে এই তদন্ত কর্মকর্তা, ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর উল্লেখ করে একজন নায়িকাকে হত্যা করে ঢাকার অদূরে লাশ গোপন করার জন্য কেরানীগঞ্জে লাশ ফেলে যাওয়া এবং এই হত্যার সঙ্গে আরও কারা জড়িত রয়েছে তা নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করেন। পাশাপাশি আগামী ২৭শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর