× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ২২ মে ২০২২, রবিবার , ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ শওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

বিশেষ অ্যাপ দিয়ে নম্বর স্পুফিং, বিকাশ এজেন্টদের সর্বনাশ

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার
২৭ জানুয়ারি ২০২২, বৃহস্পতিবার
ফাইল ছবি

বিশেষ অ্যাপ দিয়ে বিকাশ হেল্পলাইন নম্বর স্পুফিং করে এজেন্টদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। চক্রটি দীর্ঘ ৭ বছর ধরে টাকা হাতিয়ে নিয়ে অনেক এজেন্টদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। শ্যালক-দুলাভাইয়ের চক্রটি বিকাশ এজেন্টদের টার্গেট করতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সাধারণ গ্রাহকদেরও প্রতারিত করেছে। প্রতারক চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিভিন্ন অসাধু সিম বিক্রেতার সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সিমকার্ড রেজিস্ট্রেশন করে। পরে বিকাশের বিক্রয় প্রতিনিধিদের (এসআর) নম্বর ক্লোন করে এজেন্টদের নম্বরে কল দিতো। পাশাপাশি বিকাশের হেল্পলাইন নম্বর ক্লোন করেও এজেন্টদের ফোন করতো। এজেন্টদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলে তথ্য আদান-প্রদান করে টাকা হাতিয়ে নিতো।
সাধারণ গ্রাহকদের হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন করে কৌশলে পিন কোড জেনে নিয়ে টাকা ট্রান্সফার করতো।  
অভিযোগের প্রেক্ষিতে র‌্যাব-৪ ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানা ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- মো. নুরুজ্জামান মাতুব্বর (৩৫), মো. সজীব মাতুব্বর (২১) ও মো. সুমন শিকদার (৪৫)। এদের মধ্যে নুরুজ্জামান ও সজীব সম্পর্কে শ্যালক-দুলাভাই। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১৩টি মোবাইল ফোন সেট ও বিভিন্ন কোম্পানির ২৪টি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বিকালে কাওরান বাজারের র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৪ অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।
র‌্যাব জানিয়েছে, চক্রটি তিন ধাপে প্রতারণা করতো। চক্রের প্রথম গ্রুপের সদস্যরা মোবাইল ব্যাংকিং হেড অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে বিক্রয় প্রতিনিধিদের (এসআর) মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে। এসআরকে মোবাইলে কল করে বিভিন্নভাবে মোটা অঙ্কের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে চক্রে যুক্ত করে। সময় সুযোগ বুঝে এসআররা প্রতারক চক্রের সদস্যদের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিয়ে সহযোগিতা করতো। এরপরই শুরু হয় টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া। তথ্য পেয়ে দ্বিতীয় চক্রের সদস্যরা এসআরের মোবাইল নম্বর স্পুফিং করে এজেন্টের নম্বরে কল দেয়। উন্নত সেবার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট হালনাগাদ করার অনুরোধ করে। তখন বলা হয় কল সেন্টার থেকে কল দেয়া হবে। তারা বিদেশি পেইড অ্যাপস্‌ ক্রয় করে মোবাইল ব্যাংকিং হেল্পলাইন নম্বরসহ বিভিন্ন টার্গেটেড নম্বর স্পুফিং করে। এজেন্টকে ফোন দিয়ে উন্নত সেবা পেতে সার্ভিস পরিবর্তনের জন্য অফার করে। প্রতারকরা এজেন্টদের মোবাইল ফোনের কিবোর্ড বা বাটনে বিভিন্ন অক্ষর বা সংখ্যা চাপতে বলে। ধাপে ধাপে বিভিন্ন তথ্য দিতে বলা হয়। কয়েকটি সংখ্যা দেয়ার এক পর্যায়ে একটি ওটিপি কোড পাঠানো হয়। এভাবে এজেন্টের কাছ থেকে পিন নম্বর নিয়ে এজেন্টের অ্যাকাউন্ট নিজেদের দখলে নিয়ে এজেন্টের অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ প্রতারক সদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের অন্যান্য সহযোগীদের কাছে ট্রান্সফার করে দেয়।  
র‌্যাব জানায়, তৃতীয় গ্রুপের সদস্যরা অসাধু সিম বিক্রেতাদের প্রতি সিম কার্ড বাবদ ১ হাজার টাকা দিয়ে অন্যের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধিত সিমকার্ড সংগ্রহ করে। পরে এসব নম্বর দিয়ে ভুয়া মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলে। এই প্রতারক চক্রের প্রত্যেক সদস্যের কাছে ৫০-৬০টির  বেশি বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির সিমকার্ড থাকে। প্রতারণার অর্থ এসব অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে পরবর্তীতে অন্য এজেন্ট থেকে ক্যাশ আউট, বিভিন্ন কেনাকাটায় পেমেন্ট, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্নভাবে টাকা উত্তোলন করে গ্রুপের সকল সদস্য মিলে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। ভাগ-বাটোয়ারার ক্ষেত্রে প্রতি এক লাখ টাকায় এসআর পায় ২০-২৫ হাজার টাকা। যে এজেন্টদের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করা হয় সে পায় প্রতি এক লাখ টাকায় ১০-১২ হাজার টাকা এবং বাকি ৬৫-৭০ হাজার টাকা প্রতারক চক্রের অন্যান্য সদস্যরা ভাগ করে নেয়। প্রত্যেক প্রতারণার কাজ শেষে প্রতারণায় ব্যবহৃত সিমকার্ডটি নষ্ট করে ফেলে দেয়।
র‌্যাব জানায়, চক্রের সদস্যরা নিজেদের গ্রেপ্তার এড়াতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মোবাইল নেট ব্যবহার না করে ওয়াইফাই/পকেট রাউটার ব্যবহার করে। চক্রটি সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গেও প্রতারণা করে। দুর্নীতিবাজ ডিএসআরদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের সাধারণ মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে। মোবাইল ব্যাংকিং হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন করে কৌশলে তাদের পিন কোড জেনে নেয় এবং স্মার্টফোনে অ্যাপস্‌ ব্যবহার করে সাধারণ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়।
র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্রের মো. নুরুজ্জামান মাতুব্বর ফরিদপুরের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। ২০০০ সালের শুরুতে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে স্যানিটারি মিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে তার নিজ এলাকা ফরিদপুরে গিয়ে কৃষিকাজ শুরু করে। ২০১৮ সালে মোস্তাক নামের একজনের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রতারণার কাজে যোগ দেয়। ২০২১ সালে পুলিশের কাছে ডিজিটাল প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার হয়। তিন মাস আগে জামিনে বের হয়ে পুনরায় এ প্রতারণার কাজে যোগ দেয়। নুরুজ্জামানের ১ ছেলে ও ২ মেয়ে আছে। তার নামে এখন পর্যন্ত ৩টি ডিজিটাল প্রতারণার মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার মো. সজীব মাতুব্বর ফরিদপুরের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে কাঠমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে ২০২১ সালে প্রথমে র‌্যাবের কাছে মাদক মামলায় এবং পরে পুলিশের কাছে ডিজিটাল প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার হয়। দুই মাস আগে জামিনে বের হয়ে পুনরায় এ প্রতারণার কাজে যোগ দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং ১ ছেলে সন্তানের জনক। তার নামে ১টি ডিজিটাল প্রতারণা এবং ১টি মাদক মামলা রয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার মো. সুমন শিকদার (৪৫) মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ১৯৯৬ সালে শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে যায়। ২০০১ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে মোবাইলের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০০৫ সালে মোবাইলের দোকানের কাজ বাদ দিয়ে স্থানীয় একটি এনজিওতে কাজ শুরু করে। ২০১০ সালে এনজিও বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় মোবাইলের দোকানে কাজ শুরু করে। ২০১৪ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ কোম্পানির এসআর হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০১৭ সালের শেষের দিকে আর্থিক প্রলোভনে প্রতারক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রতারিত অর্থের কমিশনের বিনিময়ে এই প্রতারক চক্রের কাছে বিকাশ এজেন্টদের তথ্য সরবরাহ করতো। সুমন দুই সন্তানের জনক।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর