ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার

ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের

| ২৫ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার, ৬:০০

ওরিয়ানা ফালাচি। ইতালীয় বংশোদ্ভূত একজন সাংবাদিক। ৭০ দশকে দুনিয়া কাঁপিয়েছিলেন সাক্ষাৎকারভিত্তিক সাংবাদিকতা করে। বরেণ্য, বিতর্কিত রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কদের সাক্ষাৎকার নিতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছেন লৌহমানব ও লৌহমানবীদের। তার আক্রমণাত্মক প্রশ্ন অনেককে করেছে ক্ষীপ্ত। পরিণতিতে তাকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যেতে হয়েছে অনেক দেশ থেকে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সত্য বের করার কৌশল থেকে কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। উপমহাদেশের তিনজন রাষ্ট্রনায়কÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার নিয়ে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী গ্রন্থে তিনটি সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে বইটির অনুবাদ করেছেন আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। বইটি ছেপেছে আহমদ পাবলিশিং হাউস। জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার কিভাবে নিয়েছিলেন তার একটি চমকপ্রদ বয়ান রয়েছে বইতে।  
জুলফিকার আলী ভুট্টো
চমকে দেয়ার মতো আমন্ত্রণ। এসেছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর তরফ হতে এবং বুঝে উঠার কোনো উপায় ছিল না। আমাকে বলা হলো যত শিগগির সম্ভব আমাকে রাওয়ালপিন্ডি যেতে হবে। অবাক হলাম, কেন? প্রত্যেকটা সাংবাদিক কমপক্ষে একবার তাদের দ্বারা আহূত হবার স্বপ্ন দেখে যাদেরকে তারা অনুসন্ধান করবে। সেই ব্যক্তিত্বগুলো হারিয়ে যায় বা নেতিবাচক সাড়া দেয়। কিন্তু স্বপ্ন যুক্তিহীন এবং সন্দেহে তার পরিসমাপ্তি। ভুট্টো কেন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর জন্যে কি আমার কাছে বার্তা দিতে চান? ইন্দিরা গান্ধীকে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সাথে চিত্রিত করার কারণে আমাকে শাস্তি দেবেন? প্রথম ধারণা দ্রুত নাকচ করলাম। শত্রুর সাথে যোগাযোগ করার জন্যে তার বাহকের প্রয়োজন নেইÑ এ জন্যে সুইস বা রুশ কূটনীতিক আছেন। দ্বিতীয় ধারণাও বাতিল করে দিলাম। শিক্ষিত ও ভদ্রলোক বলে ভুট্টোর সুনাম আছে। এ ধরনের লোকেরা সাধারণত তাদের আমন্ত্রিত অতিথিকে হত্যা করে না। আমার তৃতীয় অনুমানটা হলো, তিনি হয়তো চান আমি তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। আমার হৃদয় চমৎকারিত্বে পূর্ণ হলো। বাংলাদেশের হতভাগ্য প্রেসিডেন্ট মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আমার নিবন্ধ পাঠের পরই ভুট্টোর মনে হয়তো বিষয়টা উদয় হয়েছিল। আমার সন্দেহের উপর বিজয়ী হলো আমার অনুসন্ধিৎসা এবং আমি আমন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেও তাকে জানতে দিলাম যে, তার অতিথি হলেও আমি সবার ক্ষেত্রে যে স্বাধীন বিচার বিবেচনায় লিখি, এক্ষেত্রেও তার কোন হেরফের হবে না এবং যে কোন ধরনের সৌজন্য বা তোষামোদে আমাকে কিনে ফেলা সম্ভব হবে না। ভুট্টো জবাব দিলেন : অবশ্যই, তাই হবে। এবং মানুষটি সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা হলো তাতেই।
এ মানুষটি সম্পর্কে পূর্ব ধারণা করা যায় না। অসম্ভব গোছের। নিজের মর্জিতে এবং অদ্ভুত সিদ্ধান্তে পরিচালিত হন। তীক্ষè বুদ্ধিমান। ধূর্ত, শিয়ালের মতো বুদ্ধিমান। মানুষকে মুগ্ধ করতে, বিভ্রান্ত করতেই যেন তার জন্ম। সংস্কৃতি, স্মরণশক্তি ও ঔজ্জ্বল্য দ্বারা লালিত তিনি। শহুরে আভিজাত্য তার জন্মাবধি। রাওয়ালপি-ি বিমানবন্দরে দু’জন সরকারি অফিসার আমাকে স্বাগত জানিয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে বললেন যে, প্রেসিডেন্ট আমাকে এক ঘণ্টার মধ্যে স্বাগত জানাবেন। তখন সকাল দশটা। গত আটচল্লিশ ঘণ্টা আমি বিনিদ্র কাটিয়েছি। আমি প্রতিবাদ করলাম; না এক ঘণ্টার মধ্যে নয়। আমার একটা ভালো গোসল এবং সুনিদ্রা প্রয়োজন। অন্য কারো কাছে এটা খুব অপমানজনক মনে হতো। তার কাছে নয়। তিনি সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সাক্ষাৎ মুলতবি রাখলেন এই বলে যে, রাতে আহারটা আমার সাথেই করবেন বলে আশা করছেন। বুদ্ধিমত্তার সাথে সৌজন্য যোগ হলে তা অবদমনের সেরা অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। এটা অনিবার্যই যে তার সাথে সাক্ষাৎ আন্তরিকতাপূর্ণ হবে।
ভুট্টো আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন হাসি ছড়িয়ে খোলা হাত বাড়িয়ে। তিনি দীর্ঘ, মেদবহুল। তাকে দেখতে একজন ব্যাংকারের মতো, যে কাউকে পেতে চায় তার ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্যে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সের চেয়েও অধিক বয়স্ক মনে হয় তাকে। তার টাক পড়ছে এবং অবশিষ্ট চুল পাকা। ঘন ভুরুর নিচে তার মুখটা বিরাট। ভারি গাল, ভারি ঠোঁট, ভারি চোখের পাতা। তার দু’চোখে রহস্যজনক দুঃখময়তা। হাসিতে কিছু একটা লাজুকতা।
বহু ক্ষমতাধর নেতার মতো লাজুকতায় তিনি দুর্বল ও পঙ্গু। তিনি আরো অনেক কিছু, ইন্দিরা গান্ধীর মতো। সবারই নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব। যতই তাকে পাঠ করা হোক, ততই অনিশ্চিত হতে হবে। দ্বিধায় পড়তে হবে। একটু ঘুরালে ফিরালে প্রিজমে যেমন একই বস্তু বিভিন্ন রূপে দেখা যায়, তিনি সে রকম। অতএব তাকে বহুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এবং তার প্রতিটিই যথার্থ উদার, কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট, কমিউনিস্ট, নিষ্ঠাবান ও মিথ্যুক। নিঃসন্দেহে তিনি সমসাময়িককালের সবচেয়ে জটিল নেতাদের একজন এবং তার দেশে এ যাবৎ জন্মগ্রহণকারী নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শুধুই একজন। যে কেউ বলবে, ভুট্টোর কোনো বিকল্প নেই। ভুট্টো মরলে পাকিস্তান মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
তার ব্যক্তিত্ব ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে বাদশাহ হোসেনকেই বেশি মনে করিয়ে দেবে। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট একটি দেশকে পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠে। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি মাটির পাত্র হিসেবে লৌহপাত্র দ্বারা, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ দ্বারা দলিত মথিত। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি আত্মসমর্পণ না করতে বা কোনো কিছু ছেড়ে না দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো প্রতিরক্ষা ব্যুহ ছাড়াই বন্দি শিল্পীর মতো সাহসিকতার সাথে তিনি সবকিছু প্রতিরোধ করেন। অন্যভাবে তাকে দেখে জন কেনেডির কথা মনে পড়বে। কেনেডির মতো তিনি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন, সে কারণে তার কাছে কিছুই অসম্ভব ছিল না। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বিজয় করাও নয়। এ জন্যে ব্যয় যাই হোক না কেন। কেনেডির মতো তার একটি স্বচ্ছন্দ, মধুর ও সুবিধা ভোগের শৈশব ছিল। কেনেডির মতো ক্ষমতার দিকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল জীবনের প্রারম্ভেই।
অভিজাত জমিদার পরিবারে তার জন্ম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কেলিতে এবং পরে বৃটেনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি ডিগ্রি নিয়েছেন আন্তর্জাতিক আইনে। ত্রিশ বছর বয়সের পরই তিনি আইয়ুব খানের একজন মন্ত্রী হন, যদিও পরে তাকে অপছন্দ করেন। যখন তার বয়স চল্লিশের কিছু কম তখন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রীদের একজন ছিলেন। বেদনাদায়ক ধৈর্যের সাথে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ পর্যন্ত পৌঁছেন। কিছু সহযোগীর দ্বারা এ পর্যন্ত আরোহণকে তিনি নিষ্কণ্টক রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের বস্তু। যারা ক্ষমতা ভালোবাসে তাদের পেট শক্ত, নাকটা আরো শক্ত। বদনামে তাদের কিছু আসে যায় না। ভুট্টো বদনামের তোয়াক্কা করতেন না। তিনি ক্ষমতা ভালোবাসেন। এ ধরনের ক্ষমতার প্রকৃতি আন্দাজ করা শক্ত। ক্ষমতা যে তার কাছে কি তা বুঝা যায় না। যারা সত্য বলে এবং বয়স্কাউটসুলভ নৈতিকতা প্রদর্শন করে এমন রাজনীতিবিদদের থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দেন তিনি। তার কথা শুনে এ বিশ্বাস হবে যে তার লক্ষ্য অত্যন্ত মহৎ এবং তিনি সত্যি সত্যি একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু করাচিতে তার সমৃদ্ধ জাঁকজমকপূর্ণ লাইব্রেরি দেখলেই বুঝা যাবে যে, মুসোলিনি ও হিটলার সম্পর্কিত গ্রন্থাবলী সম্মানের সাথে রূপালী বাঁধাই এ সমৃদ্ধ। যে যতেœর সাথে এগুলো সংরক্ষিত তাতে উপলব্ধি করা সহজ যে এগুলোর উপস্থিতি শুধু গ্রন্থ সংগ্রাহকের আগ্রহের কারণেই নয়। সন্দেহ ও ক্রোধ দানা বেঁধে উঠবে। তাকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, তার সত্যিকার বন্ধু ছিলেন সুকর্ণ ও নাসেরÑ এই দুই ব্যক্তিই সম্ভবত সদিচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন, কিন্তু তারা উদারনৈতিক ছিলেন না। ভুট্টোর গোপন স্বপ্ন একনায়ক হওয়া। রূপালী বাঁধাইয়ের গ্রন্থগুলো থেকেই তিনি কি একদিন তার জ্ঞান আহরণ করবেন? স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং বিরোধী দলের কোন রাজনৈতিক অর্থ কখনো ছিল নাÑ এমন একটি দেশ সম্পর্কে অজ্ঞ পাশ্চাত্যের লোকেরাই এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। এসবের বদলে সে দেশে বিরাজ করেছে দারিদ্র্য, অবিচার এবং নিপীড়ন।
ভুট্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎকার সমাপ্ত হয়েছে ছয় দিনে পাঁচটি পৃথক বৈঠকে। তার অতিথি হিসেবে তার সাথে কয়েকটি প্রদেশও সফর করেছি এ সময়ে। পাঁচটি বৈঠকে আলাপের সূত্রও হয়েছে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। প্রথম সাক্ষাৎকার বৈঠক হয় রাওয়ালপি-িতে, আমার উপস্থিতির দিন সন্ধ্যায়। দ্বিতীয় আলোচনা লাহোরের পথে বিমানে। তৃতীয় বৈঠক সিন্ধুর হালা শহরে। চতুর্থ এবং পঞ্চম বৈঠক করাচিতে। আমি সব সময় তার পাশে বসেছি, টেবিলেই হোক আর যাত্রাপথেই হোক এবং চাইলে আমি তার একটা চিত্রও আঁকতে পারতাম। ভুট্টোকে অধিকাংশ সময়ই দেখেছি পাকিস্তানি পোশাকে, হালকা সবুজ জামা এবং স্যান্ডেল পায়ে। সমাবেশে বক্তৃতার সময় মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কর্কশভাবে চিৎকার করেন, প্রথমে উর্দু পরে সিন্ধিতে। বক্তৃতার সময় দু’হাত আকাশে ছুড়তে থাকেন। সবকিছুর মাঝে প্রকাশ করেন তার কর্তৃত্ব। হালার জনসমাবেশে অসংখ্য লোক যখন তার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে, শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও সেখানে। কিন্তু তিনি কক্ষে বসে লিখছেন। যখন সভাস্থলে পৌঁছলেন তখন রাত। কার্পেটের উপর দিয়ে রাজপুত্রের মতো পা ফেলে তিনি এগিয়ে মঞ্চে উঠলেন। রাজপুত্রের মতোই আসন গ্রহণ করলেন এবং আমিও তার পাশে বসলামÑ বেশ কিছু গোঁফওয়ালা লোকের পাশে আমিই একমাত্র মহিলা, যেন সুপরিকল্পিত একটা প্ররোচনা। আসনে বসে তিনি দলের নেতাদের অভ্যর্থনা জানালেন। সবশেষে একজন দরিদ্র লোক, তার সাথে নিয়ে এলো রঙ্গিন কাপড় ও মালায় সজ্জিত একটি বকরী। এটি তার সামনে কোরবানি করা হবে। (চলবে)

 

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।


Salim

২৬ জুলাই ২০১৭, বুধবার, ১০:০৩

Dear Matiur Rahman Chowdhury Sir, we really want to read your column Jokhon Shangbadik Chelam. Please Sir