ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার

ভুট্টো নিজেই দেখলেন সৈন্যরা কিভাবে একটি সংবাদপত্র অফিস ভেঙ্গে ফেলছে

| ২৭ জুলাই ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ৯:০৭

ও. ফা.: ইয়াহিয়া খান এখন কোথায়? তার ব্যাপারে আপনার কি সিদ্ধান্ত?
জু. আ. ভু.: রাওয়ালপিণ্ডির কাছে এক বাংলোতে তিনি গৃহবন্দি। হ্যাঁ, বাংলোটা সরকারি। তাকে নিয়ে আমার বেশ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটার দায়দায়িত্ব অনুসন্ধান করার জন্য আমি একটা ওয়ার কমিশন গঠন করেছি। ফলাফল পাবার অপেক্ষা করছি এবং তাতে সিদ্ধান্ত নিতে আমার সুবিধা হবে। কমিশন যদি তাকে দোষী দেখে তাহলে তার বিচার হবে। আমরা যে পরাজিত হয়েছি, এ পরাজয় ইয়াহিয়া খানের- মিসেস গান্ধী যদি সত্যিই যুদ্ধ জয় করে থাকেন, তাহলে প্রথমেই তাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত ইয়াহিয়া খান ও তার মূর্খ তোষামোদকারীদেরকে। এমনকি তাকে কিছু বুঝানোও মুশকিল- শুধু আপনার মেজাজ খারাপ হবে।
ঢাকার ঘটনার পর এপ্রিল মাসে তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাকে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছিল। নিজের উপর আস্থাশীল, পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে। তিনি আমাকে মদপান করতে দিলেন। বললেন, “আপনারা রাজনীতিবিদরা আসলেই শেষ হয়ে গেছেন।” এরপর বললেন যে, শুধু মুজিবই নয়, আমাকেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিবেচনা করা হয়েছে। আমিও নাকি পাকিস্তানের ঐক্যের বিরুদ্ধে একজন প্রবক্তা ছিলাম। “আপনাকে গ্রেপ্তার করার জন্য সবসময় চাপের মধ্যে ছিলাম জনাব ভুট্টো।’ আমি এতটা উত্তেজিত হয়েছিলাম যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি। উত্তর দিলাম যে, আমি কখনো তার অনুসারী হবো না। কারণ তার পথ দেশকে ধ্বংস করবে।
আমি হুইস্কির গ্লাসটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করলাম। জেনারেল পীরজাদা আমাকে থামালেন, আমার হাত ধরলেন। “আসুন, শান্ত হোন, বসুন এবং আবার কথা বলুন।’ আমি শান্ত হয়ে আবার ভিতরে গেলাম। তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে, মুজিব ও আমার মধ্যে বিরাট একটা পার্থক্য রয়েছে। মুজিব একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী, আমি তা নই। নিষ্ফল প্রচেষ্টা। আমার কথা শোনার পরিবর্তে তিনি শুধু গ্লাসের পর গ্লাস মদপান করছিলেন।
ও. ফা.: মি. প্রেসিডেন্ট আমরা কি একটু পিছনের দিকে ফিরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে পারি যে, কিভাবে সেই ভয়াল মার্চের আগমন ঘটলো- সেটা নৈতিকভাবে সমর্থন করা যায় কিনা?
জু. আ. ভু.: ২৭শে জানুয়ারি মুজিবের সাথে আলোচনার জন্য ঢাকা যাই। আপনি যদি তার সাথে আলোচনা করতে চান, তাহলে আপনাকে ঢাকায় তীর্থযাত্রা করতে হবে- কারণ তিনি কখনো রাওয়ালপিণ্ডি আসতে সম্মত হন না। আমি গেলাম এমন এক পরিস্থিতিতে ঠিক যেদিন আমার বোনের স্বামী মারা গেছেন। লারকানায় আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করতে নেয়া হচ্ছিল। আমার বোন এতে খুবই মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন। নির্বাচনে মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল এবং আমার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্তু তিনি ছয় দফার উপর খাঁড়া থাকতে চাচ্ছিলেন। ফলে আমাদেরকে একটা সমঝোতায় পৌঁছার চেষ্টা করতে হচ্ছিল। ইয়াহিয়া খানের দাবি ছিল চার মাসের মধ্যে আমাদেরকে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। তা না হলে জাতীয় পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেয়া হবে। মুজিবকে বুঝানো, সে এক কঠিন কাজ। যার মাথায় ঘিলু নেই, তার কাছে তা আশাও করা যায় না। আমি যুক্তি দেখালাম, ব্যাখ্যা করলাম এবং তিনি একই সুরে বার বার বলছেন: “ছয় দফা, আপনি কি ছয় দফা মানেন?” প্রথম, দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় বারও আমি আলোচনা চালাতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু চতুর্থ বৈঠকে জোর করা হলো যে, দুই প্রদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্যের বন্দোবস্ত তাদের স্ব স্ব পছন্দ অনুযায়ী স্থির করা হবে। তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং ঐক্যের আর কি থাকে? তাছাড়া, এটা প্রায় জানাই ছিল যে, মুজিব পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক করতে চায় এবং তিনি এ জন্য ১৯৬৬ সাল থেকেই ভারতের সাথে সম্পর্ক রেখে আসছিলেন। ফলে জানুয়ারিতে আমাদের আলোচনা বাধাগ্রস্ত হলো এবং ‘মার্চে’ উপনীত হলাম।
মার্চ মাসের মাঝামাঝি ইয়াহিয়া খান করাচিতে এলেন এবং আমাকে বললেন যে, তিনি ঢাকা যাচ্ছেন- আমি তার সাথে যেতে চাই কিনা? আমি তাকে জানালাম যে, মুজিব যদি আমার সাথে আলোচনায় সম্মত হয় তাহলে যেতে পারি। ইয়াহিয়া খান স্বয়ং একটি টেলিগ্রামে আমাকে ঢাকা থেকে জানালেন যে, মুজিব আমার সাথে কথা বলতে রাজি। ১৯শে মার্চ আমি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এবং ২১শে মার্চ মুজিবের সঙ্গে দেখা করলাম, ইয়াহিয়া খানও সাথে ছিলেন। অবাক হলাম, মুজিব অত্যন্ত শান্ত এবং খোশমেজাজে। তিনি বললেন, “মি. প্রেসিডেন্ট আমি আপনার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে এসেছি। ভুট্টোর সাথে আমার করার কিছু নেই। সাংবাদিকদের আমি বলবো যে, প্রেসিডেন্টের সাথে আমি সাক্ষাৎ করেছি এবং ভুট্টো সাহেবও সেখানে ছিলেন,” তার কণ্ঠে আনুষ্ঠানিকতার সুর। ইয়াহিয়া খান বললেন, “না, না, মুজিব সাহেব। আপনি আপনার নিজের কথাই বলবেন।” মুজিব শুরু করলেন, “জলোচ্ছ্বাসে অসংখ্য লোক নিহত হয়েছে। অসংখ্য লোক।” এই হলো লোকটির ধরন। হঠাৎ করে তার অসুস্থ মনে এমন একটি কথা বলে বসতেন, যার সাথে আসল কথার কোন সঙ্গতিই নেই। মতিভ্রষ্টের মতো বলতেই থাকবেন। এক পর্যায়ে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। আমি কিভাবে জলোচ্ছ্বাসের জন্য দায়ী? আমি কি এমন একজন যে জলোচ্ছ্বাস পাঠিয়েছি? মুজিবের উত্তর ছিল- হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো এবং বলা যে, তাকে একজন মৃতের জানাজায় যেতে হবে।
ও. ফা.: বলুন মি. প্রেসিডেন্ট।
জু. আ. ভু.: কথা হলো, আপনি যখন মুজিবের প্রসঙ্গে বলবেন, সবকিছু অদ্ভূত মনে হবে। আমি বুঝি না কি করে বিশ্ব তাকে গুরুত্ব দিতে পারে। ভালো কথা, আমি উঠে দাঁড়ালাম, বাইরের কক্ষ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে, যদিও তিনি তা চাচ্ছিলেন না। সে কক্ষে তিনজন ছিলেন, ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা, মিলিটারি সেক্রেটারি এবং তার রাজনৈতিক কসাই; জেনারেল ওমর। মুজিব বলতে শুরু করলেন, “বাইরে যান, সবাই বাইরে যান। ভুট্টোর সাথে আমার কথা আছে।” তারা তিনজন চলে গেলেন। তিনি বসে আমাকে বললেন, “ভাই, ভাই। আমাদেরকে একটা সমঝোতায় আসতে হবে। আল্লাহর দোহাই।” আমি রীতিমতো বিস্মিত। তাকে বাইরে নিয়ে এলাম, যাতে কেউ তার কথা শুনতে না পায়। বাইরে এসে তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন যে, আমার অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানটা নেয়া উচিত এবং তিনি পূর্ব পাকিস্তান নেবেন। আরো বললেন যে, গোপন একটা বৈঠকের ব্যবস্থা তিনি করে ফেলেছেন। সন্ধ্যার পর তিনি আমাকে নিতে লোক পাঠাবেন। আমি তাকে বললাম যে, তার এ ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি চোরের মতো অন্ধকারে কলাগাছের নিচে সাক্ষাৎ করার জন্য ঢাকা আসিনি। আমি পাকিস্তানকে ভাঙতে চাই না। তিনি যদি বিচ্ছিন্নতা চান তাহলে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর নির্ভর করে জাতীয় পরিষদে সে প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। কিন্তু এ যেন প্রাচীরের কাছে কথা বলা। আমাদের মুখপাত্রদের মাধ্যমে আলোচনা পুনরায় শুরু করার ব্যাপারে আপোষ হলো। কিন্তু ফল কিছুই হলো না। সেই দিনগুলোতে তিনি ক্ষ্যাপার মতো ছিলেন, যে কোনো ব্যাপারে তার মাথা গরম হতো। এভাবে আমরা ২৫শে মার্চে পৌঁছলাম।
ও. ফা: ২৫শে মার্চ আপনি কি সন্দেহ হওয়ার মতো কিছু লক্ষ্য করেন নি?
জু. আ. ভু.: আমি একটু অস্বস্তির ভাব অনুভব করেছি, অদ্ভুত একটা অনুভূতি। প্রত্যেক সন্ধ্যায় আমি ইয়াহিয়া খানের কাছে গিয়ে রিপোর্ট করতাম যে, আমার ও মুজিবের মধ্যে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। ইয়াহিয়া খান কোনো আগ্রহ দেখাতেন না। বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, অথবা টেলিভিশন সম্পর্কে অভিযোগ করতেন অথবা ক্ষোভ প্রকাশ করতেন যে, তার প্রিয় গানগুলো শুনতে পাচ্ছেন না- রাওয়ালপিণ্ডি থেকে রেকর্ডগুলো এসে পৌঁছায়নি। ২৫শে মার্চ সকালে তিনি আমাকে এমন কথা বললেন, যাতে আমি উদ্বিগ্ন হলাম: “আজ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো প্রয়োজন নেই। আগামীকাল আমরা তার সাথে দেখা করবো। আপনি এবং আমি। তবু বললাম, ‘ঠিক আছে’ এবং রাত আটটায় আমি মুজিবের দূতের কাছে সবকিছু বললাম এবং তিনি বিস্ময় প্রকাশ করলেন, ‘ঐ কুত্তার বাচ্চাটা ইতিমধ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছে।’ আমার বিশ্বাস হলো না। প্রেসিডেন্টের বাসভবনে টেলিফোন করে বললাম যে, ইয়াহিয়ার সাথে কথা বলবো। তারা আমাকে বললো যে, তাকে ডিস্টার্ব করা যাবে না। জেনারেল টিক্কা খানের সাথে তিনি নৈশভোজে বসেছেন। আমি টিক্কা খানকে ফোন করলাম। তারাও জানালো যে, তাকে ডিস্টার্ব করা যাবে না, কারণ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তিনি নৈশাহারে বসেছেন। তখনই আমার উৎকণ্ঠা শুরু হলো এবং নিশ্চয়ই কোনো কৌশল বলে সন্দেহ হলো। আমি রাতের খাবার খেতে গেলাম। এরপর ঘুমোতে। গুলির শব্দে এবং অন্যান্য কক্ষ থেকে দৌড়ে আসা বন্ধুদের গোলযোগে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। দৌড়ে জানালার কাছে গেলাম, আল্লাহ আমার সাক্ষী, আমি কাঁদলাম। কেঁদে বললাম, ‘আমার দেশটা শেষ হয়ে গেল।’
ও. ফা.: কেন? আপনি জানালা দিয়ে কি দেখলেন?
জু. আ. ভু.: আমি কোনো নির্বিচার হত্যাকাণ্ড দেখিনি। কিন্তু দেখলাম সৈন্যরা ‘পিপল’ অফিসটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। বিরোধীদলীয় এই সংবাদপত্রটির অফিস ইন্টারকন্টিনেন্টালের ঠিক সামনেই ছিল। লাউড স্পিকারে সৈন্যরা লোকদের নির্দেশ দিচ্ছিল চলে যাওয়ার জন্য। যারা বাইরে বেরিয়ে এলো, তাদের একপাশে দাঁড় করানো হলো মেশিন গানের মুখে। আরো কিছু লোককে ফুটপাথের উপর দাঁড় করানো হলো। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ঘিরে রেখেছে বেশকিছু ট্যাংক। যে কেউ আশ্রয় লাভের জন্য ছুটাছুটি করছে তারা সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ছে। সকাল আটটায় জানতে পারলাম, মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি খুশি হয়েছিলাম যে, তিনি জীবিত আছেন এবং এটুকু ভাবনা হয়েছিল যে সৈন্যরা তার সাথে একটু দুর্ব্যবহারও করতে পারে। এরপর আমি ভাবলাম, তার গ্রেপ্তারে আপোষের একটা পথ বেরুতে পারে। তারা নিশ্চয়ই মুজিবকে একমাস বা দু’মাসের বেশি কারাগারে রাখবে না এবং এরই মধ্যে আমরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবো।
ও. ফা.: মি. প্রেসিডেন্ট, শেখ মুজিব আপনাকে বলেছিলেন, ‘আপনি পশ্চিম পাকিস্তান নিন আর আমি পূর্ব পাকিস্তান নেই।’ ফলটা শেষ পর্যন্ত তাই দাঁড়ালো। এ জন্যে কি আপনি তাকে ঘৃণা করেন?
জু. আ. ভু.: মোটেও না। আমি ভারতীয় ধরনে অর্থাৎ ভণ্ডামি করে বলছি না। আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথেই বলছি। ঘৃণার বদলে আমি তার জন্যে দারুণ আবেগ অনুভব করি। তিনি অযোগ্য, বিভ্রান্ত, অশিষ্ট, বোধহীন। কোনো সমস্যা। নিষ্পত্তির অবস্থায় তিনি ছিলেন না- তা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা আন্তর্জাতিক যে সমস্যাই হোক না কেন। তিনি শুধু জানেন, কি করে গলাবাজি করা যায়, কথার তুবড়ি ছুটানো যায়। আমি তাকে চিনি সেই ১৯৫৪ সাল থেকে এবং আমি তাকে কখনো গুরুত্ব দেইনি। শুরু থেকেই বুঝেছিলাম যে, তার মধ্যে কোনো গভীরতা নেই, প্রস্তুতি নেই, শুধু অগ্নিবর্ষণ করতে জানেন। কোনো ধ্যান-ধারণা নেই তার। তার মাথায় একটি ধারণাই ছিল- বিচ্ছিন্নতা। এ ধরনের একজন লোককে দেখে শুধু করুণাই হয়।
১৯৬১ সালে ঢাকায় এক সফরে গিয়ে আবার তার সাথে সাক্ষাৎ হলো। আমার হোটেলের লবিতে দেখেছিলাম। তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘হ্যালো মুজিব। চলুন এক কাপ চা খাওয়া যাক।’ তখন সবেমাত্র জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন তিনি। তিক্ততায় পরিপূর্ণ এবং সেদিনই কেবল তার সাথে শান্তভাবে আলোচনা করা সম্ভব হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান কিভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা শোষিত হচ্ছে, উপনিবেশের মতো দেখা হচ্ছে, এখানকার রক্ত শুষে নেয়া হচ্ছে- কথাগুলো সত্য। আমার একটা বই-এ আমি এ কথাগুলোই লিখেছি। তিনি কোনো উপসংহারে পৌঁছতে পারলেন না। তিনি ব্যাখ্যা করতে পারলেন না যে, ত্রুটিটা আসলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে। তিনি সমাজতন্ত্র ও সংগ্রামের কথা বলেননি। অপরদিকে তিনি বললেন, জনগণ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয় এবং কেউই সশস্ত্র বাহিনীর বিরোধিতা করে না। সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষেই দেশে বিরাজমান অন্যায় অবিচার দূর করা সম্ভব। তার সাহস ছিল না- কোনোদিনই ছিল না। তিনি কি আসলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন- ‘এই বাংলার বাঘটি?
ও. ফা.: তিনি এ কথাও বলেছেন যে, তার বিচারের সময় তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং গ্রেপ্তারের পর তার আচরণ ছিল বীরোচিত। তিনি এমন একটা সেলে ছিলেন, যেখানে ঘুমানোর জন্য একটা মাদুর পর্যন্ত ছিল না।
জু. আ. ভু. : আসল কথা শুনুন। তিনি কোন সেলে ছিলেন না। তাকে রাখা হয়েছিল একটা অ্যাপার্টমেন্টে যেটা গুরুত্বপূর্ণ রাজবন্দিদের জন্যই ছিল। মিয়ানওয়ালীর কাছে লায়ালপুরের পাঞ্জাব জেলে। একথা সত্য, তাকে সংবাদপত্র পড়তে ও রেডিও শুনতে দেয়া হতো না। কিন্তু পাঞ্জাবের গভর্নরের পুরো লাইব্রেরিটাই তাকে দেয়া হয়েছিল এবং বাস্তবিকপক্ষে তিনি খুব ভালোভাবে ছিলেন। এক পর্যায়ে তারা তাকে একজন বাঙালি বাবুর্চিও দিয়েছিল, কারণ তিনি বাঙালি খাবার খেতে চাইতেন। বিচারে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন এবং কিভাবে? তিনি তার পক্ষে দু’জন সেরা আইনবিদ চাইলেন; কামাল হোসেন ও এ কে ব্রোহী- তার আইন বিষয়ক উপদেষ্টা ও বন্ধু। কামাল হোসেন জেলে ছিলেন। ব্রোহী বাইরে। ব্রোহীকে পাওয়ার অর্থ সর্বোত্তমকে পাওয়া।আপনাকে আরো কিছু কথা বলছি। প্রথমে ব্রোহী ব্যাপারটা হাতে নিতে চাননি। কিন্তু ইয়াহিয়া খান তাকে বাধ্য করলেন। তিনি চারজন আইনবিদ সহকারীকে নিয়ে বিচারে হাজির হলেন। রাষ্ট্র তাদের ফি দিয়েছে। এটাই স্বাভাবিক ছিল। ব্রোহীর একমাত্র দোষ, বেশি কথা বলা, বাচালতা। সুতরাং লায়ালপুর থেকে করাচিতে ফিরে তিনি মুজিবের সাথে তার আলাপ-আলোচনাগুলো ব্যক্ত করে বলতেন যে, তাকে দোষী সাব্যস্ত করা কঠিন-মুজিব পাকিস্তানের ঐক্য এবং ইয়াহিয়া খানের প্রতি তার শ্রদ্ধার কথা অত্যন্ত নমনীয়ভাবে বলেন। মুজিব বারবার ইয়াহিয়া খানের উল্লেখ করেন, চমৎকার মানুষ, দেশপ্রেমিক এবং আমিই নাকি তার এ অবস্থার জন্য দায়ী। জেনারেল পীরজাদাও আমার সম্পর্কে মুজিবের একই বক্তব্যের কথা বলেছেন। পীরজাদাকে আমি বলেছি, ‘তাকে আমার কাছে দিয়ে দেখুন, তিনি আমাকে চমৎকার মানুষ ও দেশপ্রেমিক বলবেন এবং আপনাকে অপমান করবেন।’
ও. ফা.: কিন্তু বিচারে তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তার সাজা হয়েছিল।
জু. আ. ভু.: না। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তখন থেকে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে সম্পূর্ণ ইয়াহিয়া খানের এখতিয়ারে ছিল তার সাজার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি। এই শাস্তি পাঁচ বছর বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ডও হতে পারতো। কিন্তু ইয়াহিয়া কোনো সিদ্ধান্তই নিলেন না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং তার মনে আরো অনেক কিছু ছিল।
ও. ফা.: মুজিব আমাকে বলেছিলেন যে, তারা তার কবর খুঁড়েছিল।
জু. আ. ভু.: আপনি জানেন সেই কবরটা কি ছিল? এয়ার রেইড শেল্টার। তারা কারাগারের চারপাশের প্রাচীর ঘেঁষে খুঁড়েছিল। বেচারী মুজিব। ভীত হয়ে সবকিছুর মধ্যে মৃত্যুর নিশানা দেখেছে। কিন্তু আমি মনে করি না যে, ইয়াহিয়া তাকে হত্যা করার কথা ভাবছিলেন। ২৭শে ডিসেম্বর আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি উন্মত্ত, মাতাল। তাকে দেখতে মনে হচ্ছিল ডোরিয়ান গ্রে’র পোর্ট্রেট। আমাকে বললেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভুল ছিল মুজিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়া। আপনি মনে করলে তা করতে পারেন।’
ও. ফা.: আপনি কি বললেন?
জু. আ. ভু. : আমি বললাম যে, আমি তা করবো না এবং অনেক ভেবেচিন্তে, আমি মুজিবকে মুক্তি দিতেই প্রস্তুত হলাম। সেনাবাহিনীর কথিত বর্বরতার কারণে সকলের দ্বারা নিন্দিত পাকিস্তানের জন্য কিছু সহানুভূতির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ভাবলাম ক্ষমাশীলতায় অনেক সহানুভূতি পাওয়া যাবে। এছাড়া আমি ভাবলাম যে, এই উদারতায় যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে আনার কাজ ত্বরান্বিত হবে। অতএব বিলম্ব না করে লায়ালপুরে নির্দেশ পাঠালাম মুজিবকে রাওয়ালপিণ্ডিতে আমার কাছে নিয়ে আসতে। নির্দেশটা সেখানে পৌঁছলে মুজিব আতঙ্কিত হয়ে পড়লো। জড়ানো কথায় তিনি বলতে চাচ্ছিলেন যে, তারা তাকে এখান থেকে বের করে মেরে ফেলবে। সফরের সময়টাতেও তিনি সুস্থির ছিলেন না, এমনকি তার জন্য নির্দিষ্ট বাংলোতে এলেও একই অবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য চমৎকার বাংলো। আমি যখন একটি রেডিও, একটি টেলিভিশন এবং বেশকিছু কাপড় চোপড় নিয়ে সেখানে গেলাম তিনি অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘আপনি এখানে কি করছেন?’ আমি তাকে বিস্তারিত বললাম যে, আমি প্রেসিডেন্ট হয়েছি। তার সুর পাল্টে গেল সাথে সাথে। দু’হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললেন যে, তার জীবনে এর চেয়ে আনন্দের কোনো খবর নেই। আল্লাহ সব সময় আমাকে পাঠাচ্ছেন তাকে রক্ষা করার জন্য...। এরপরই আমি যা ভেবেছিলাম, তিনি ইয়াহিয়া খানকে আক্রমণ করে আমাকে বললেন যে, আমি তার মুক্তির বিষয় বিবেচনা করতে পারি কিনা। লন্ডন হয়ে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পূর্বে আমি আরো দু’বার তার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। দুবারই তিনি কোরআন শরীফ বের করে কোরআন স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবেন। ভোর তিনটায় আমি যখন তাকে বিদায় জানাই তখনো বিমানে তিনি এই প্রতিজ্ঞা করেছেন। প্রতিজ্ঞার সাথে আমার বুকে বুক মিলালেন, আমাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং বললেন, ‘চিন্তা করবেন না মি. প্রেসিডেন্ট, আমি শিগগিরই ফিরে আসবো। আপনার সুন্দর দেশকে আমি আরো ভালোভাবে জানতে চাই। আপনার সাথে শিগগিরই আমার দেখা হবে, খুব শিগগির।’ (চলবে)

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।