ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার

সিদ্ধান্ত নিলাম চাকরিতে ফিরবো না

| ১১ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার, ৯:০২

বাংলাদেশের জন্মের অব্যবহিত পর ব্র্যাকের অভ্যুদয় নেহাত কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং জাতীয় মুক্তি এবং আত্মবিকাশের যে প্রবল স্বপ্ন ও অভিলাষ আমাদের একাত্তরের মোহনায় এনে মিলিত করেছিল, সেই একই  স্বপ্ন থেকে ব্র্যাকের অভিযাত্রার সূচনা। একাত্তর এই কারণে অনন্য যে, আমরা নিজস্ব রাষ্ট্রে আমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করার পথ খুঁজে পেয়েছিলাম। নিঃসন্দেহে এ ছিল এক বড় অর্জন। এরই প্রেক্ষাপটে আমি ব্র্যাকের জন্ম, ক্রমবিকাশ ও বিস্তারকে মিলিয়ে দেখি। ব্র্যাক আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ফসল। আমাদের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ব্র্যাককে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের নিকষিত ফুল’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অভিধাটিকে আমার যথাযথ বলেই মনে হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা-মুহূর্তে আমি ছিলাম চট্টগ্রামে। আমি তখন শেল অয়েল কোম্পানির হেড অব ফিন্যান্স। পঁচিশে মার্চ ঢাকায় বিপুল হত্যাযজ্ঞের জবাবে শুরু হয়েছে প্রতিরোধযুদ্ধ। রক্ত, আগুন আর অশ্রু তখন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভূ-খ-ের প্রতিদিনের বাস্তবতা। পাকিস্তানিদের সীমাহীন বর্বরতার সে এক নারকীয় অধ্যায়। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে উপনীত আমরা। প্রশ্নটা ছিল দেশের স্বাধীনতার। মানুষের জীবনে এর চেয়ে মৌলিক প্রশ্ন আর কিছু হতে পারে না। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি ইংল্যান্ডে চলে যাব। সেখানে আমার শিক্ষাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে। লন্ডন আমার পরিচিত জায়গা। সেখানে গিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনসহ বৈদেশিক সাহায্য ও সমর্থন আদায়ে কাজ করতে পারব বলেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম। আমার ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছিল। মে মাসের মধ্যভাগে ইসলামাবাদ-কাবুল হয়ে আমার লন্ডনে যাওয়ার সে উপাখ্যান যেমন দীর্ঘ, তেমনি ঘটনাবহুল। সে কাহিনি এখানে নয়।
লন্ডনে পৌঁছে আমি আমার বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হলাম। শুধু ইংল্যান্ড নয়, ইউরোপজুড়ে আমরা স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন ও প্রচারমূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করলাম। যে সংগঠনের ব্যানারে আমরা কাজ করছিলাম, তার নাম ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’। পরে আমরা গড়ে তুলেছিলাম নিজেদের সংগঠন ‘হেল্প বাংলাদেশ’। এর মাধ্যমে স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে আমরা তহবিল গড়ে তোলার কাজটি করেছিলাম। শুধু প্রবাসী বাঙালি নয়, অনেক বিদেশিও আমাদের যুদ্ধের জন্য অকাতরে অর্থসাহায্য করেছিলেন। নানাভাবে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলাম। পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার, অর্থ সংগ্রহ, পথনাটক প্রভৃতি উপায়ে আমাদের কাজ চলছিল। ভেবেছিলাম, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু একাত্তরের ডিসেম্বরের মধ্যেই আমরা স্বাধীন হলাম। বিশ্ব-মানচিত্রে নতুন একটি দেশের নাম উৎকীর্ণ হলো।
আজ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, মুক্তিযুদ্ধ আমার ব্যক্তি-আমিকে অনেকটাই অন্যভাবে তৈরি করে দিয়েছিল। আমি ছিলাম এক বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদের চাকুরে। মোটামুটিভাবে সমাজবিচ্ছিন্ন সুবিধাভোগী এক নাগরিক। সেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর চাকরিতে ফিরব না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে কাজ করব। তদানীন্তন বৃহত্তর সিলেট জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম শাল্লা। এটি ছিল প্রধানত হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা। গ্রামবাসীর অধিকাংশই জেলে সম্প্রদায়ের। পাকিস্তানি সেনারা সম্পূর্ণ এলাকাটাকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। হাওর-বাঁওড়ে ভরা এই এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত করুণ। আমরা বুঝেছিলাম, সুগম এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনকর্মীদের তৎপরতা বেশি হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকেই যেতে চাইবেন না। সুতরাং আমরা এই দুর্গম জনপদে কাজ করব। যুদ্ধ আর রক্তপাতের অধ্যায় শেষ হয়েছে। এবার করতে হবে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। ধ্বংসস্তূপে গড়ে তুলতে হবে নতুন জীবন।
মুক্তিযুদ্ধ একটা বিষয়ে আমাদের প্রত্যয়ী করে তুলেছিল তা হলো, ঐক্যবদ্ধ মানুষকে পরাস্ত করা যায় না। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত একটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা সেদিন অস্ত্র হাতেই অবতীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু আমার ধারণা, অস্ত্রবল নয়, সেদিন মানুষের ঐক্যই ছিল আমাদের মূল শক্তি। আমরা যখন ব্র্যাক গড়ে তুলি, তখন এই ঐক্যের শক্তিকেই সম্বল করেছিলাম। ভেবেছিলাম, ঐক্যবদ্ধ মানুষকে নিয়ে এগিয়ে গেলে আমরা সফল হব। স্বাধীনতাযুদ্ধের বিজয়ের প্রেরণা তো সঙ্গে আছেই।
ভারতে আশ্রিত শরণার্থীরা শত্রুমুক্ত দেশে দলে দলে ফিরতে শুরু করলেন। শাল্লা এলাকার অধিবাসীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রধানত ভারতের বালাট ও মৈলাম শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশে ফিরে তাঁদের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয় কিছুই নেই তাদের। জীবিকার কোনো বন্দোবস্ত নেই। তাঁদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনসামগ্রী সংগ্রহ করতে হলে অর্থের প্রয়োজন।
লন্ডনে আমার ছোট একটি ফ্ল্যাট ছিল। যুদ্ধ চলাকালে আমি সেটি বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এ বাবদ আমার হাতে ছিল ছয় হাজার ৮০০ পাউন্ড। দেশে ফেরার সময় সে অর্থ আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। তা দিয়েই কাজ শুরু হলো। আমরা খুবই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছিলাম। এ অবস্থায় দাতা সংস্থাগুলো এগিয়ে এসে আমাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। ফলে আমাদের কাজে আরো গতি এলো।
শরণার্থীরা তাঁদের শূন্য ভিটায় জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের জাল বা নৌকা কিছুই ছিল না। সবই হারিয়েছিলেন তারা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সর্বস্ব হারানো এই মানুষগুলোকে ঘর তুলে দিতে হবে। আর জেলেরা যাতে মাছ ধরা শুরু করতে পারেন, সে জন্য জাল ও নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘর তৈরি ও নৌকা বানানোর জন্য প্রচুর বাঁশ-কাঠের প্রয়োজন হবে। ঠিক হলো, আসাম থেকে কুশিয়ারা নদীতে ভাসিয়ে আমরা বাঁশ-কাঠ নিয়ে আসব।
সেই দিনটার কথা আমার আজও মনে পড়ে। ১৯৭২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি। আগের দিন রাতে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে এসে আমি ডাকবাংলোয় রাত যাপন করেছি। সেখানে আমাদের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা এলাকায় ফিরে আসা শরণার্থীদের মধ্যে কাজ করছিলেন। সেই কর্মীদের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে চলেছি শাল্লায়। আমরা গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছি। পোড়া ভিটামাটিতে নিঃসম্বল, অসহায় মানুষ। পথে বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল বারবার। গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তাঁরা যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ দিচ্ছিলেন। নানা বিষয়ে মতবিনিময় হচ্ছিল। একটা বিষয় সেদিন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এত ধ্বংস আর বিনাশের পরও মানুষ আবার উঠে দাঁড়াবে।
এর আগে সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলীয় মানুষের মধ্যে এই অদম্য মনোবলের পরিচয় পেয়েছিলাম। তখন আমরা গিয়েছিলাম মনপুরার বিধ্বস্ত জনপদে। ১২ই নভেম্বরের রাতের সেই খ-প্রলয়ে বহু জনপদ সেদিন আক্ষরিক অর্থেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। সর্বস্বান্ত হাজার হাজার দুর্গত মানুষের জন্য আমরা সেদিন যৎসামান্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। এক রাতের ব্যবধানে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংস ও অকল্পনীয় বিপর্যয় সেদিন আমাকে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। সত্তরের প্রলয়ংকরী বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আামাদের মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হলো।
শাল্লাকে ঘিরেই আমাদের কাজ শুরু হলো। দরিদ্র মানুষের সঙ্গে আমাদের কর্মীরা মিশে গেলেন। তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখলাম। আমার নিজের তত্ত্বীয় ধারণাগুলোকে কাজের সঙ্গে মিলিয়ে নিলাম। অনেক ধারণা শুধরে নিলাম, বদলে নিলাম। প্রকল্প এলাকায় জরিপ চালিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ত্রিশ হাজার গৃহহীন মানুষের জন্য সাড়ে ছয় হাজার ঘর তৈরি করব। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আমরা প্রায় সাড়ে দশ হাজার ঘর বানিয়েছিলাম। কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল পোড়ামাটির শূন্যতা, কিছুদিনের মধ্যেই সেখানকার চালচিত্র পাল্টে গেল। গ্রামের পর গ্রামজুড়ে নির্মিত ঘরের চালার টিনগুলো দিনের আলোয় ঝকঝক করতে লাগল।
কিন্তু আমাদের বিস্মিত করে দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই দৃশ্যপট পূর্ববৎ হয়ে গেল। দরিদ্র মানুষ তাদের ঘরের চালার টিন খুলে অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দিতে লাগলেন! ভেবেছিলাম, আমরা গৃহহীন মানুষের একটি মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি। অথচ অবস্থা যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়ে গেল। ঘটনাটির তাৎপর্য ছিল অপরিসীম। ফলে যে মৌলিক শিক্ষাটি আমরা পেলাম তা হলো, বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বনের পথে পরিচালিত করা।
এ শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই শুরু হলো ব্র্যাকের শাল্লা প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্ব ছিল ত্রাণ ও পুনর্বাসনকেন্দ্রিক, দ্বিতীয় পর্ব উন্নয়নকেন্দ্রিক। প্রথম পর্বের কাজ ছিল সহজ, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে কর্মীদের জন্য প্রয়োজন হলো উন্নয়নবিষয়ক ধ্যান-ধারণা, আত্মনিবেদন ও অঙ্গীকার। দ্বিতীয় পর্বে এসে আমাদের কাজের ধারা পাল্টে গেল। এ সময় আমি প্রতি মাসে সাত দিনের জন্য শাল্লায় গিয়েছি। প্রায় দশ বছর আমি এটা নিয়মিতভাবে করেছি। উন্নয়ন সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আলোচনা করতে করতে অনেক রাত ভোর হয়ে গেছে। কর্মীদের কাছ থেকে বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমার চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণা দিয়ে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছি। এভাবে আমার জীবনধারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। দরিদ্র মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতায় এসে জীবনকে নতুন করে চেনা হলো আমার।
ব্র্যাকে আমরা মূলত তিনটি ধারায় উন্নয়ন কাজ করেছিলামÑ ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। এ জন্য দরিদ্র মানুষকে নিয়ে গড়ে তুলেছি গ্রাম সংগঠন। সংগঠিত মানুষ নিজেদের জীবনকে বদলে দেয়ার প্রয়াসে সমবেত হয়েছেন। ক্ষুদ্রঋণের কথা দিয়েই শুরু করি। কাজের সূচনায় ক্ষুদ্রঋণের বিষয়টি আমাদের ভাবনার মধ্যেই ছিল না। কাজ করতে করতেই এ ধারণাটা মাথায় এসেছিল। আগেই বলেছি, শাল্লা অঞ্চলের মৎস্যজীবীরা যুদ্ধচলাকালে তাঁদের নৌকা, জাল সব হারিয়েছিলেন। আমরা জেলেদের সেগুলো কিনে দেয়ার উদ্যোগ নিলাম। তাঁরা মাছ ধরা শুরু করলেন। এতদিন তাঁরা অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন। এবার তাঁদের জীবিকার সংস্থান হলো।
এরই মধ্যে জেলেদের একটা দল এসে আমাদের বলল, এখানে যে বিলটি আছে, তার নিলাম ডাক হবে। যদি আমরা তাদের দশ হাজার টাকা দিতে পারি, তাহলে তারা বিলটি লিজ নিতে পারবে। এই প্রথম কেউ আমাদের কাছে এসে ঋণ চাইল। আমরা জেলেদের দশ হাজার টাকা দিলাম। জেলেরা কথামতো এক বছর পর ঋণ শোধ করে দিলেন। এভাবেই ক্ষুদ্রঋণের ধারণার উদ্ভব হলো। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আমরা শুধু গ্রুপ ঋণ দিয়েছি, ১৯৭৬ সালে একক ঋণ দেয়া শুরু করি। কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের নিয়মও চালু হয়। তারপর আমাদের এই কর্মসূচি ক্রমেই বিকশিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আয়-রোজগার করে আত্মনির্ভরশীলতার পথ খুঁজে পেয়েছে। অথচ এই ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আমরা কম সমালোচিত হইনি। বলা হয়েছে, আমরা ব্যবসা করছি। কুসীদজীবী মহাজনদের সঙ্গে আমাদের তুলনা করা হয়েছে। আমরা একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে গরিব মানুষকে ঋণ দিয়েছি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা সেসব মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, যাঁরা ছিলেন নিঃসম্বল ও সম্পদহীন। ঋণ দিয়ে দরিদ্র মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান তৈরি করে আমরা কর্মসূচিকে সচল রেখেছি।
একইভাবে আমরা স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসূচি পরিচালনা করছি। গত শতকের আশির দশকজুড়ে আমাদের কর্মীরা ডায়রিয়ার প্রতিকারে দেশের প্রতিটি ঘরে গিয়ে খাওয়ার স্যালাইন বানানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন। দেশের প্রতিটি বাড়িতে হাজির হয়ে এত বড় একটি কর্মসূচি সফল করে তোলা ছিল নিঃসন্দেহে বড় একটা ঘটনা। এটি আমাদের মনে এই প্রত্যয় এনে দিয়েছিল যে স্থানীয় পর্যায়ে তো বটেই, জাতীয় পর্যায়েও যেকোনো কর্মসূচি আমরা সফল করে তুলতে পারি। এরপর শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে আমরা সরকারের সহযোগী হয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছি। এ ছাড়া যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি।
আশির দশকের মধ্যভাগে ব্র্যাকের অন্য যে কর্মসূচিটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, সেটি হলো উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি। সে সময় দেশের ৬০ শতাংশ ছেলেমেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো। ৪০ শতাংশ ছেলেমেয়ের স্কুলে যাওয়ারই কোনো সুযোগ হতো না। আবার স্কুলে যারা ভর্তি হতো, তাদেরও অধিকাংশ মাঝপথে ঝরে পড়ত। মাত্র ৩০ শতাংশ ছেলেমেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করত। এ অবস্থায় স্কুলে না যাওয়া এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা শিক্ষা কর্মসূচি শুরু করি। দেশজুড়ে আমাদের কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলে। কিন্তু গত শতকের নব্বইয়ের দশকে কিছু প্রতিক্রিয়াশীল লোক ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আমাদের এ কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমে পড়ে। দেশের অনেক জায়গায় তারা ব্র্যাকের স্কুলে অগ্নিসংযোগ করে, শিক্ষার্থীদের হুমকি দিতে থাকে, আমাদের কর্মসূচি বন্ধ করার দাবিতে তারা রীতিমতো নৈরাজ্য সৃষ্টিতে লিপ্ত হয়। কিন্তু তাদের এই অপপ্রয়াস সফল হয়নি। কিছুদিন পর তা-ব সৃষ্টিকারীরা ধীরে ধীরে তাদের বিরোধিতা গুটিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা কর্মসূচিকে আমরা নানাভাবে বিস্তৃত করেছি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি, কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কর্মসূচি, মেধাবিকাশ কার্যক্রম প্রভৃতি উদ্যোগ গ্রহণ করে আমরা আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি। এ পর্যন্ত ১ কোটি শিক্ষার্থী ব্র্যাক স্কুল থেকে কোর্স সম্পন্ন করেছে। এই পরিসংখ্যানের একটা দিক অত্যন্ত লক্ষণীয় যে এই শিক্ষার্থীদের ৬০ শতাংশই মেয়ে।
বস্তুত, শুরু থেকেই একটি বিশ্বাসে স্থির থেকে আমরা আমাদের কর্মসূচিগুলোকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি। তা হলো, আমাদের যাবতীয় উন্নয়ন প্রয়াসের কেন্দ্রে থাকবেন নারীরা। একটা কথা আমি প্রায়ই বলি, সংসারের অভাব মোকাবিলা তথা দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনায় নারীরা অত্যন্ত দক্ষ। দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত সংসারে তারাই হচ্ছেন উত্তম ব্যবস্থাপক। টানাপোড়েনের সংসারে ধারদেনা করে কীভাবে সংসার চালিয়ে নিতে হবে, সঙ্গিন মুহূর্তে কেমন করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, সেই সক্ষমতা যেন তাদের স্বভাবের মধ্যেই নিহিত আছে। এ জন্যই ব্র্যাকের যাবতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ এবং ব্যবস্থাপনায় আমরা ব্যাপকসংখ্যক নারীকে যুক্ত করেছি। আমাদের ক্ষুদ্রক্ষণ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে নারীর আর্থিক স্বাবলম্বন।
তবে একটা কথা আমি বলব, ব্র্যাকে কাজ করতে এসে যতগুলো ক্ষেত্রে আমি লড়াই করেছি, তার মধ্যে যে লড়াইটি সবচেয়ে বেশি মাত্রায় অসমাপ্ত থেকে গেছে সেটি হচ্ছে, নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লড়াই। বিগত চারটি দশকের বেশি সময় ধরে আমরা এ ক্ষেত্রে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছি, কিন্তু সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির শিকড়কে আমরা খুব একটা টলাতে পারিনি। সান্ত¡নার কথা এই যে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত আছে, নারীমুক্তির পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো জয় করার জন্য আমরা কাজ করে চলেছি।
বিশ্বজুড়েই দরিদ্র মানুষ তাদের জীবনমান বদলে দেয়ার লড়াই করে চলেছে। তাদের সেই সংগ্রামের সঙ্গে ব্র্যাক সব সময়ই একাত্ম। ব্র্যাক বর্তমানে বিশ্বের ১২টি দেশে কর্মসূচি পরিচালনা করছে। দেশগুলো হচ্ছে, আফগানিস্তান, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, লাইবেরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সাউথ সুদান, সিয়েরালিওন ও হাইতি। এসব দেশে কাজ করতে গিয়ে একটা জিনিস আমরা উপলব্ধি করেছি, পৃথিবীর সর্বত্রই দরিদ্র মানুষের জীবন বাস্তবতা, আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা এক ও অভিন্ন। সেই অভিন্নতার ক্ষেত্রটি চিহ্নিত করে সব দেশে আমাদের কর্মসূচি এগিয়ে চলেছে।
অবশ্য কখনো কখনো গভীর সংকটেও পড়তে হয়েছে আমাদের। ২০০৭ সালে আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনকালে আমাদের দু’জন সহকর্মী আবদুল আলীম ও নূর ইসলাম বন্দুকধারীদের দ্বারা অপহৃত হন। আবদুল আলীমকে তারা হত্যা করে। নূর ইসলাম দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পান। ২০০৮ সালে আমাদের আরো দু’জন সহকর্মী আখতার আলী ও শাহজাহান আলীকে অপহরণ করা হয়, পরে তারাও মুক্তি লাভ করেন। উন্নয়নকর্মী হিসেবে আফগানিস্তানের মাটিতে আবদুল আলীমের আত্মদানের শোকবিধুর গৌরবকে ব্র্যাক সব সময়ই বহন করে যাবে।
চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আজ আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন এক মিশ্র অনুভূতি আমাকে অধিকার করে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আমি যখন ব্র্যাকের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে এসেছিলাম, তখন কিন্তু ভাবিনি, এটাই হবে আমার স্থায়ী ঠিকানা।
শুরুতে ভেবেছিলাম, দু-তিন বছর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জীবন স্বাভাবিক হয়ে এলে পূর্বতন কর্মস্থলে ফিরে যাব। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি, উন্নয়ন কোনো আংশিক কাজ নয়, এটি পূর্ণ সময় ও সামগ্রিক অঙ্গীকার দাবি করে। মাঝে মধ্যে নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে, কী ছিল সেই প্রেরণা, যা আমাকে এই পথে চালিত করেছিল? আজ মনে হয়, সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধÑএ দুটি ঘটনার অভিঘাত আর আলোড়নই আমার জীবনধারাকে এই পথে প্রবাহিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে আমার মহিয়সী মায়ের স্মৃতি মাঝেমধ্যে মনে পড়ে। একটি অসাধারণ দয়ালু মন ছিল তার, বিপন্ন মানুষকে তিনি চাইতেন সর্বদাই সাহায্য করতে। মায়ের এই প্রবণতাটি হয়তো সামান্য পরিমাণে আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামগ্রিক বিচারে আমাদের সাফল্য কতটা? গন্তব্যের দিকে যেটুকু পথ আমাদের অতিক্রম করার কথা ছিল, তা কি আমরা করতে পেরেছি? এটা তো সত্য, দারিদ্র্যকে আজও পরাভূত করা যায়নি, নারী আজও বহুলাংশে অধিকারহীন এবং তার শতাব্দী-প্রাচীন বঞ্চনা ও অবমাননার আজও অবসান ঘটেনি। শিশু অধিকার আজও সুনিশ্চিত হয়নি, শিশুর অপুষ্টি আজও জ্বলন্ত সমস্যা। অর্থাৎ এখনো আমাদের অনেক পথচলা বাকি।
সুতরাং, গভীরতর অর্থে আমাদের আত্মতৃপ্তির কোনো অবকাশ নেই। তবু গত চারটি দশক জুড়ে যে চেষ্টা আমরা করছি, তার মূল্যও কম নয়। যে ব্র্যাক একদিন ছিল অঙ্কুর, তার মহীরুহ রূপ মাঝেমধ্যে আমাকেও বিস্মিত করে। তবে এর পেছনে আমার ভূমিকা নিতান্তই সূচনাকারীর, বাকি সব কৃতিত্বই আমার সহকর্মীদের। তাদেরই অক্লান্ত শ্রম এবং আত্মনিবেদনে আমরা এতটা পথ আসতে পেরেছি।

  •  ফজলে হসান আবেদ: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা। জন্ম ২৭ এপ্রিল ১৯৩৬ বানিয়াচং, হবিগঞ্জ। র‌্যামন ম্যাগসাইসাইসহ বহু পুরস্কার ও ব্রিটিশ সরকারের নাইট উপাধিতে সম্মানিত।
* সূত্র মতিউর রহমান সম্পাদিত ‘সফলদের স্বপ্নগাথা: বাংলাদেশের নায়কেরা’

 

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।


মোঃ আল আমিন

১১ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার, ১০:৪৩

আমার জীবণে পড়া লিখুনির মধ্যে এটি একটি লিখুনি, স্যার যেন গুটা পৃথীবির মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে পারে এ কামনাই করি। স্যাররের জীবন দির্ঘজীবি হক।

Jahid Chowdhury

১৪ আগস্ট ২০১৭, সোমবার, ৫:৫১

An icon of the World