ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার

জেদ করে বলেছিলাম, লেখক হতে চাই

| ১৪ আগস্ট ২০১৭, সোমবার, ৯:৪৬

জন্মের দেশকাল ব্যাপারটা দৈবের। জন্ম নেবার ইচ্ছেটাও আমাদের বিন্দুবিসর্গের একেবারে বাইরে। জন্ম নেবার পর, অনেকগুলো বছর পেরিয়ে এসে একদিন আমি দেখে উঠি- সৌভাগ্য আমারÑআমি এমন একটা দেশকালে জন্ম পেয়েছিলাম। আমি জন্মেছিলাম ঘোর ব্রিটিশকালে, হিন্দুপ্রধান এলাকায়, মুসলিম পরিবারে। এই তিনের পরিসরে এই যে আমি বেড়ে উঠি, আমাকে দেয় ইংরেজি ভাষা সাহিত্য তথা পাশ্চাত্যে অধিগম্যতা, আমি নিশ্বাস লয়ে লয়ে বড় হই ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতি ও পুরাণের আবহে, আর একই সঙ্গে মুসলিম ঐতিহ্যের ভেতরেও আমার বর্ধন ঘটতে থাকে। এদিক থেকে আমার বালকবেলার হিন্দু বন্ধুদের তুলনায় কি এখনকার তাদের প্রায় সবারই তুলনায় অনেক বড় একটা মানব-মানচিত্রে নিজেকে আমি দেখতে পাই। এই অনুভবটি আমার অক্ষরপাতের প্রতিটি মসি-শোণিতে আছে বলেই আমি মনে করি। বাঙালিকে যে আমি বাঙালি বলে জানি, বাংলা ভাষাকে যে আমি জীবন-অপরূপতারই ভাষা জেনে পৃষ্ঠার পটে এরই তুলিকায় মানুষের ভেতর-বাইরের ছবি এঁকে চলি, তা ওই অনুভব আর জন্মসূত্রের ওই দৈবনির্ণীত দেশকাল থেকেই।
আমার জন্ম হয় ছোট্ট একটি শহরে, প্রায় গ্রামই বলা যায় তাকে- সেই যে গ্রামটিকে পেয়েছিলাম দেখেছিলাম জেনেছিলাম, সেই গ্রামখানি সেই গ্রামজীবন তার হাজার বছর বয়সী শেকড় নিয়ে আজও আমার ভেতরে মাটিরস টানে। এই মাটি তো কেবল মাটি নয়, কোরআনের সেই কথা- মাটি থেকেই মানুষের নির্মাণ, অতিরেকে মাটি আসলে মানুষই বটে। মানুষের সেই বয়ান যে আমি অক্ষরে অক্ষরে ধরতে চাই, ধরার চেষ্টা এই এতটা কাল করে আসছি, সেটি ওই আমার গ্রামে জন্ম নেবার কারণে বলেই এখন শনাক্ত করি। শহরে-নগরে জন্ম নিলে কী হতো? রবীন্দ্রনাথ এক মহানগরে জন্ম নিয়েছিলেন, ওখানেই যদি তিনি বৃত্তাবদ্ধ হয়ে থাকতেন তাহলে জোড়াসাঁকোর রবি ঠাকুরই হয়ে থাকতেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হতেন না- হয়েছেন, শিলাইদহে এসেছিলেন বলেন, তাঁর অন্তর-শেকড়টিকে তিনি গ্রামের মাটিতে মানুষের বিতানে রোপণ করতে পেরেছিলেন বলে।
সেই বালকবেলা থেকেই ঝোঁকটা ছিল লেখার দিকে। আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বালককালে প্রথম যেদিন জানলাম এটি এক মানুষেরই রচনা, বিস্মিত হয়ে গেলাম। আমি মনে করতাম, গাছ যেমন আপনা থেকেই, ঘাস যেমন, হাওয়া যেমন, আকাশের সূর্য বা রাতের নক্ষত্র যেমন, ওই কবিতাটিও আপনা থেকে হওয়া। এর পেছনে কারও কোনো চাষবাস নেই। এক বাইশে শ্রাবণের পর তেইশে, মফস্বলে খবরের কাগজ আসে একদিন দেরিতে, সেদিন সময়ের আগেই ডিসপেনসারি বন্ধ করে বাবা এলেন বাড়িতে, মাকে বললেন, রবীন্দ্রনাথ কাল মারা গেছেন। চমকে উঠে জানতে চেয়েছিলাম, কে তিনি? বাবা বললেন, সেই যে তোমার- আমাদের ছোট নদী!- ওইটে যিনি লিখেছেন, তিনি। বিস্ময় আমাকে জাগিয়ে তোলে। মানুষই তবে লেখে!
আমার বাবাকে লিখতে দেখেছি। চিকিৎসক তিনি, লিখতেন হোমিও চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর বই। রাত জেগে লিখতেন। বাবার পাশেই আমি ঘুমোতাম। ঘুমোবার চৌকির পাশেই তাঁর লেখার টেবিল। সকাল থেকে তাঁর রোগী দেখার ভিড়, সারা দিন ওই, ছুটি পেতেন অধিক রাতে, বই লেখার অবসরই তাঁর ছিল শেষ রাতে। হঠাৎ একেকটা রাতে জেগে উঠে ঘুমজড়ানো চোখে দেখতে পেতাম, লণ্ঠনের আলোয় বাবার মুখখানা অন্ধকারে পদ্মফুলের মতো ফুটে আছে, ঝুঁকে পড়ে তিনি লিখে চলেছেন, রাতের নির্জন স্তব্ধতার ভেতরে শব্দ উঠছে খস্ খস্ খস্, কাগজের ওপরে তাঁর কলম চলছে, দোয়াতে কলম ডুবিয়ে কালি নিচ্ছেন, ভাবছেন, আবার লিখছেন। এই ছবিটা আজও এতটাই স্পষ্ট, যেন এখনই দেখছি। কেউ যখন এখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, লেখার ব্যাপারটা আমার মনে এলো কী করে? এখন আমি মনে করি, বাবার ওই নিশুতি রাতের ছবিটা, ওই ছবিটাই!
তখনই আমি ভাবি, আমাকেও লিখতে হবে। বাবা যে কাজটি রাতের ঘুম থেকে উঠে করেন, যে কাজটি করার সময় তাঁর মুখখানি পদ্ম হয়ে ওঠে, ওই কাজটিই আসল কাজ। মনের ভেতরে ঝোঁক আর সামাল দিতে পারি না। প্রতিজ্ঞাটিই শুধুÑ লেখক হব! কিন্তু তা বললে হয়? বাবা চান আমি আর কিছু নয়, ডাক্তার হই। খুব জোর করতে লাগলেন, বিজ্ঞান ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিলেন কলেজে, কিন্তু ঝোঁক বলে কথা! বাড়ি পালালাম। বাড়ি পালিয়ে দেড় বছর পরে যখন ফিরে এলাম, বাবা হার মানলেন। বললেন, ‘বেশ! যা ইচ্ছে হ! লেখক হতে চাস তো জেনে রাখ, তোর যক্ষ্মা হবে, পাজামা ছেঁড়া থাকবে, ময়লা শার্ট গায়ে উঠবে, পায়ের স্যান্ডেল ক্ষয়া, পকেটে ফুটো পয়সা নেই, মদ খেয়ে মাতাল হয়ে নর্দমায় গড়াবি। এর পরও তুই লেখক হতে চাস?’
কী যে ভূতে পেয়েছিল আমাকে! জেদ করে তৎক্ষণাৎ বলে উঠি, হ্যাঁ, হতে চাই।
আজ বুঝি, ঝোঁকটা যে ছিল, ঝুঁকি আমি সেই সেদিনই নিয়ে ফেলি। লেখক, শুধু লেখক, এছাড়া আর কিছুই আমি হব না। ঝুঁকিটা এই ছিল যে আমাদের সেকালে শুধু লিখে সংসার দূরে থাক, নিজেকেও প্রতিপালন করা যেত না। আমি ঝুঁকি নিলাম লেখাকেই পেশা করে নেব। সারাক্ষণের চাকরি এই লেখা, আর কিছু নয়, নিজেকে নিজে দেওয়া এই চাকরিটাই আমি করে যাব। এ এমন এক চাকরি, এ থেকে অবসর নেওয়া নেই, এর প্রভিডেন্ট ফান্ড-টান্ড কিচ্ছু নেই, তবু করব- করেও আসছি এই এতটা কাল। উনিশ শ একান্ন সালের মে মাসে আমার লেখা প্রথম ছাপা হয়েছিল, সে হিসাবে আজ তেষট্টি বছর। শুধু লিখেই চলেছি। ঝোঁকটা দিনে দিনে বেড়েছে, এখনো প্রতিদিন লেখার টেবিলে যখন বসি, প্রথম দিনের সেই ঝোঁকটারই নবায়ন পাই আমার ভেতরে, তবে ঝুঁকিটা আর বোধ করি না তেমন তীব্র করে, কারণ এখন ওটি সয়ে গেছে! সময় বদলেছে, বাবা যে-সময়ের পরিসরে লেখক-জীবনের পতন ও বিপন্নতার কথা বলেছেন, সেটাও আর সর্বাংশে এখন সত্য নয়। তবে, ভুলে যেন না যাই যে একটি সফল মানুষের পেছনেই কিন্তু নিরানব্বইটি লাশও পড়ে থাকে- তারা পারেনি, হয় তাদের ঝোঁকটা মরে গেছে কিংবা ঝুঁকিটাতে ভয় পেয়ে তারা একসময় বইঠাই ছেড়ে দিয়েছে।
আমি ছাড়িনি! বাবার আরও একটি কথা মনে রেখেই আমি লেখার টেবিলে এখনো বসি। কলকাতায় বাবা বছর দুয়েক মেডিকেল কলেজে পড়ে আর্থিক অনটনের কারণে সে পড়া ছেড়ে হোমিওপ্যাথিতে যান। সেই মেডিকেল কলেজে প্রথম দিনের ক্লাসে ইংরেজ অধ্যাপক যে কথাটি বলেছিলেন, কত দিন গল্প করেছেন তিনি বালক আমার কাছে যে একজন চিকিৎসকের থাকা চাই এই তিন- ইগলস আই, লায়নস হার্ট, লেডিস ফিঙ্গার- বাজপাখির মতো সন্ধান চোখ, সিংহের মতো নির্ভীক হৃদয় আর নারীর কোমল হাত। লেখার শুরু থেকেই আমি চিকিৎসকের ওই তিনকে একজন লেখকের জন্যও অনন্য প্রয়োজন বলে দেখে উঠেছি।
হয়ে ওঠার গল্প! কী করে হয়ে উঠলেন আজকের আপনি সৈয়দ হক? প্রশ্নটাই অবান্তর। কিছু একটা হবার জন্য কলম ধরিনি। হ্যাঁ, লেখক হতে চেয়েছিলাম, কলম ধরে কেউ কিছু লিখলে তাকে তো লেখকই বলতে হয়, নাকি? কিন্তু লেখা? সে কি হচ্ছে? হয়েছে? চারদিকের বন্দনাস্তুতি কি অখ্যাতির ধ্বনি আমার ওপর দিয়ে বহে যায়, হাঁসের মতো আমি জল আর পাঁক ঝেড়ে উঠি। আমার চোখ মহাকালের দিকে। যে-মানুষ যে-দেশ আর যে-কালের ভেতরে আমি জন্মটা পেয়েছিলাম, আর নিজেকে একদিন যে-কাজটা এর ঝুঁকিসমেত গ্রহণ করেছিলাম, কাজটা কি ঠিকমতো করে যাচ্ছি? দাউ দাউ করে আগুনজ্বলা পাটাতনে দাঁড়িয়েও, ইংরেজি কবিতায় পড়া সেই বালকের মতো আমি কি বলতে পারছি- পিতা, আমাকে বলো, তোমার আদেশ কি আমি পালন করতে পারছি?
উত্তরটা যদি মহাকাল দেয়।
তবে ততদিন আমি বেঁচে থাকব না। আর, এই বেঁচে থাকার কালে যে বাদ্যি রব শুনি- কর্কশ কি মধুর, কান তাতে দিই না। কারণ, হয়ে ওঠার চেষ্টাটাই এখনো আমি করে চলেছি। রেখো মা দাসেরে মনে- এই পঙ্ক্তিটি নিরন্তর আমার ভেতর থেকে উচ্চারিত হয়। মধুহীন তুমি আমাকে কোরো না, হে জননী। মধু না-ই আহরণ করতে পারি, মধু পান করবার ঠোঁট আমার উদ্গ্রীব ও অক্ষয় রেখো তুমি।

  •  সৈয়দ শামসুল হক : কবি, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক। জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫, কুড়িগ্রাম। বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং একুশে ও স্বাধীনতা পদকে ভ’ষিত।

* সূত্র মতিউর রহমান সম্পাদিত ‘সফলদের স্বপ্নগাথা: বাংলাদেশের নায়কেরা’

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।