ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার

মৃত সন্তান প্রসব নূর সাদিয়ার কান্না

মিজানুর রহমান কক্সবাজার থেকে | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার, ১১:২৮

নূর সাদিয়া। বয়স আঠারো কি উনিশ। বাড়ি রাখাইনের মংডু আলী তাইন্‌জু, বাঘঘোনা পাড়ায়। ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রথম মা হচ্ছেন। এজন্য এবারের ঈদে বাপের ভিটায় যাননি। উল্টো মা এসেছেন তার বাড়িতে। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু ঈদের পঞ্চম দিনের লোমহর্ষক একটি ঘটনা তার জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। ভেঙে যায় তার স্বপ্ন। গ্রামে গণ্ডগোলের খবর আগেই পেয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ি ছাড়েননি। আচমকা তার বাড়িতে আগুন দেয় বর্মী বাহিনী। তাদের আক্রমণে পাশের ঘরের এক পুরুষ নিহত হন। নির্যাতিত হন অন্য নারীরাও। বর্মীরা (স্থানীয়ভাবে মগ বলে পরিচিত) তেড়ে আসে সাদিয়ার দিকে। আতঙ্কিত সাদিয়া চোখ বন্ধ করে দৌড়ান। পাশের ঝোপে গিয়ে হুঁশ ফিরে। স্বামী আবু বকর সিদ্দিক, মা মিনারা বেগম আর ছোট ভাই মো. ফরিদও যে যার মতো করে পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হন। রাতে একে অন্যের খোঁজ পান। ৪ জন একসঙ্গে রওনা হন বাংলাদেশের দিকে। দুর্গম পথ। পেছনে তাড়া করছে মগ যুবকরা। আছে বর্মী সেনাদের গুলির আশঙ্কা। আতঙ্ক নিয়ে পুরো পথ হেঁটেছেন। কক্সবাজারের টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছাতেই সন্ধ্যা। বাধ্য হয়ে রাত কাটান সেখানে। পরদিন পৌঁছান কক্সবাজার শহরে, মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ায়। এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় হয়। সেখানেই প্রসব করে মৃত ছেলে সন্তান। স্থানীয়রা বলছেন, রাখাইনের মৃত্যুকূপ থেকে পালিয়ে সাদিয়া জীবন বাঁচাতে পারলেও পথেই তার স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। শেষ হয়ে যায় তার মা হওয়ার সম্ভাবনা! মৃত সন্তানকে পেটে বহন করতে হয়েছে ১২ ঘণ্টার বেশি সময়। সঙ্গে অসহ্য যন্ত্রণা। আশেপাশের কেউ ঘুমাতে পারেনি ওই রাতে। সাদিয়া হাউমাউ করে কেঁদেছেন সারা রাত। স্থানীয় দাই দিল বাহারের ভাষ্য, মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। প্রথম তো। হেঁটে-গাড়িতে এসেছে অনেক রাস্তা। খুব দুর্বল ছিল। রাতের পুরোটা এত কান্না করেছে। ভোরে সন্তান খালাস হয়েছে। তখনও কান্না করেছে। কিন্তু এখন সে আর কাঁদে না। সরজমিন সাদিয়ার আশ্রয়স্থল ঘুরে তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক চেষ্টার পরও সাদিয়ার কোনো প্রতিক্রিয়া নেয়া সম্ভব হয়নি। কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের মধ্যম কুতুবদিয়াপাড়ার অবস্থান। সেখানে আপন মামা মফিজুর রহমানের ঝুপড়ি ঘরে রয়েছেন সাদিয়া ও তার পরিবার। ছোট্ট ৬ হাত বাই ৮ হাত একটি ঘরে রয়েছেন তিনি। সঙ্গে আরো দুটি পরিবারের ১৬ জন নারী-পুরুষ, শিশু। সে এক অবর্ণনীয় অবস্থায় রয়েছে ওই প্রসূতি। আশেপাশের ঘরগুলোর অবস্থাও একই। দু’দিন আগে সন্তান প্রসব হওয়া ওই রোহিঙ্গা নারীর প্রতি আশেপাশের লোকজনের দরদ থাকলেও তাদের সহায়তা করার সামর্থ্য নেই বললেই চলে। সাদিয়ার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি অবশ্য বাংলাদেশের একটি কওমি মাদরাসা থেকে দাওরা হাদিস শিক্ষা নিয়েছেন। ৪ বছর আগে বার্মায় ফিরেন। রাখাইনের একটি ফুকানিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করছিলেন। ছোটখাটো আয়ে মোটামুটি ভালোই চলছিল তার সংসার। কিন্তু জীবনের এক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না তিনি। বলেন, ‘আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে ভাই। আমার স্ত্রী অসুস্থ। জানি না কবে সুস্থ হবে। সে সুস্থ হলে ক্যাম্পে চলে যাবো। ওখানে তো লোকজন ত্রাণ দিচ্ছে। এখানে তো মামা শ্বশুরের ওপর বোঝা হয়ে আছি। দেখি কি হয়?’ আবু বকর জানান, তিনি এখানে ভিক্ষার চেয়ে মাদরাসায় পড়ানোর চিন্তা করছেন। এ জন্য চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে যাওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি। ওই এলাকায় ৪ বছর আগে তিনি পড়াশোনা করেছেন। পরিস্থিতি ভালো হলে আবু বকর রাখাইনে ফেরত যেতে চান বললেও পরক্ষণে তিনি বলেন, যে অবস্থা হয়েছে আমাদের ফিরে গিয়ে আর কি হবে? বাড়িতে, গ্রামে, বাজারে সবকিছুতে আগুন দিয়েছে তারা। লুটপাট করেছে মগরা। সেখানে ফিরে বাড়ির কোনো চিহ্ন পাবো বলে তো মনে হয় না।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।