× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২৮ অক্টোবর ২০২০, বুধবার

গোলপাতার ঘরে ক্রিকেট রানী

মন ভালো করা খবর

ইশতিয়াক পারভেজ | ২৭ জানুয়ারি ২০২০, সোমবার, ১১:৩৬

গোলপাতার ছোট্ট ঘরে জন্ম। এখানেই বেড়ে ওঠা। বিধবা মা আর চার ভাইবোনকে নিয়ে নানা বাড়িতে উঠেন। কয়েকটি বাঁশের উপর সুন্দরবন থেকে আনা গোলপাতার ছাউনি। দুঃখ আর কষ্ট ছিল তাদের সঙ্গী। কিন্তু ক্রিকেট বদলে দিয়েছে তাদের জীবন। গোলপাতার ছাউনি ঝেড়ে ফেলে সেখানে এখন উঠেছে পাকা বাড়ি। সুখ এখন হাতের মুঠোয়।
এ কাহিনী ক্রিকেট রাণী সালমা খাতুনের। বললেন, সালোয়ার কামিজ পড়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিলাম। ভাবিনি কোনো দিন এই ক্রিকেট থেকে বদলে যাবে আমার জীবন।  খেলে টাকা পেয়েছি, তা দিয়ে নানীর দেয়া জমিতে এখন আমাদের পাকা বাড়ি। এখন স্বপ্ন একটা গাড়ি হবে। সেই গাড়িতে মাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবো। দেশের নারী ক্রিকেটের জাগরণের সঙ্গে বদলেছে আমার জীবনও। শুধু আমার কেন! আরো অনেকের। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল ভাইদের দেখে অনেকেই ক্রিকেটে আসে। এখন শুনি আমাকে দেখেও অনেক মেয়ে ক্রিকেট খেলছে। ভাবতেই ভালো লাগে আমার মতো সালমা খাতুনের ভক্ত আছে। আমাকে দেখেও অনেক মেয়ে ক্রিকেট খেলতে আসে।’  

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট জাগরণের প্রেরণা সালমা খাতুন। ১১ বছর ধরে তার জীবনের সঙ্গে বদলে গেলো এই দেশের নারী ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়ার চিত্রও। তার দলের হাত ধরেই এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা। এরপর এসএ গেমসে স্বর্ণ, দুটি বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের ট্রফি। সবশেষ এবছর শুরুতে ভারতের মাটিতে চারদলীয় টুর্নামেন্টে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সালমার দল। এক সময় ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুই ফরম্যাটেই অধিনায়ক ছিলেন তিনি। এখন শুধু টি-টেয়েন্টিতে। কিন্তু এই সাফল্যের কারিগরের জীবনটাও কেটেছে অসহনীয় এক সংগ্রামে। যা শুনে হয়তো চোখে আসবে জল, আবার আনন্দে ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠবে হাসির রেখাও।

যেভাবে ক্রিকেটে আসা: আমার যখন ৭ বা ৮ বছর বয়স তখন থেকেই মামাদের সঙ্গে খেলতাম। তখন মনে হতো যদি জার্সি পরে খেলতাম। এরপর একদিন আমাদের সুযোগ এলো খুলনার কোচ সালাউদ্দিন (প্রায়াত মোহাম্মদ সালাউদ্দিন) স্যার ও পিলু (ইমতিয়াজ হোসেন পিলু) স্যারের হাত ধরে। এরপর ১২ বছর ধরে ক্রিকেট খেলছি।
ট্রাউজার ও জার্সি পরার অভিজ্ঞতা: আমি তো সালোয়ার কামিজ পরে খেলতাম। আমার মনে আছে যখন সালাউদ্দিন স্যারের কাছে যাই সেদিনও তাই পরা ছিল। আমার কাছে জার্সি কেনার মতো টাকা ছিল না। স্যার আমাকে তখন ট্রাউজার-জার্সি, জুতা কিনে দেন। তা দিয়ে প্রায় কয়েক বছর খেলেছি। শুরুতে মানুষ যেন কিভাবে তাকাতো। আমি নদী পার হয়ে মাঠে যেতাম। লোকজন তাকিয়ে থাকতো। কেউ কেউ পিছন থেকে নানা কথা বলতো। আমি লজ্জা পেতাম। যে কারণে বাসা থেকে জার্সির উপরে অন্য একটা কিছু পরে আসতাম।

পরিবারই শক্তি: আমরা চার ভাই-বোন। আমি সবার ছোট। মা আমাকে সবরকম সমর্থন দিয়েছেন। তার কাছ থেকেই আমি সাহস পেয়েছি। মেয়ে মানুষ বিয়ে কেন দেয় না, এমন অনেক কথা হয়তো মাকে শুনতে হয়েছে। আর এখনতো মানুষ প্রশংসা করে।

ভাবিনি ক্রিকেটে খেলে টাকা পাব: আমরা যখন ক্রিকেট শুরু করি তখন টাকার কথা ভাবাই যেত না। যা টুকটাক পেতাম তা থেকেই বাঁচাতাম। আর বছরে একবার যে ব্যাট-বল বা জার্সি পেতাম সেগুলোকেই অনেক যত্ন সহকারে ব্যবহার করতে হতো। এক জোড়া জুতা দিয়ে আমরা দুই তিন বছর চালিয়েছি। পরে অবশ্য একটু একটু করে টাকা বেড়েছে। সেখান থেকেই নিজের জন্য একটু করে রাখতাম, সংসারে দিতাম। ২০০৭-এ জাতীয় দলের হয়ে মালয়েশিয়াতে গিয়েছিলাম। সেবার বিদেশে দৈনিক খাওয়ার জন্য যে টাকা পেয়েছি আমরা মেয়েরা সেখান থেকে বাঁচাতাম। কেউ ৩০ কেউ ২০ হাজার টাকা বাঁচিয়ে দেশে নিয়ে এসেছিল। আমি ২৫ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। তাতেই কি যে খুশি! এত টাকা আমার কাছে!

২৫ হাজার টাকায় স্বপ্ন: আমার কাছে ২৫ হাজার টাকা মানে তখন অনেক বড় কিছু। কারণ আমার পরিবার খুলনায় যে বাসায় থাকি সেটি ছিল গোলপাতায় করা। মানে বাঁশের বেড়ার উপর গোলপাতা দিয়ে ছাউনি দেয়া। খুব কষ্ট হতো আমার মায়ের চার সন্তান নিয়ে এমন ঘরে থাকতে। তাই আমি ঠিক করে ফেলি, বাসায় ফিরেই গোলপাতার পরিবর্তে টিনের ছাউনি দিবো। তবে যেহেতু মামা বাড়িতে থাকি তারা রাজি হলেন না। মন খারাপ হয়ে যায়। কী করবো ভাবছিলাম। আমার নানি  আমার মাকে যে ছোট্ট একটু জায়গা দিয়েছিলেন সেখানে ঘর করার সিদ্ধান্ত হলো। মা বললেন কোনোভাবে যদি বাঁশের বেড়ার পরিবর্তে পাকা করে তোলা যায় তাহলে ভালো হয়। কিন্তু ২৫ হাজার টাকায় কী তা হয়! কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমার কোচ পিলু স্যারের কাছ থেকে আরো কিছু টাকা ধার নিয়ে পাকা বাড়ি তুলতে শুরু করলাম পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল দিয়ে। আমার মনে হলো সেটিই আমার স্বপ্নের পাকা বাড়ি। কী যে ভালো লেগেছে মায়ের মুখে হাসি দেখে। আমার মাও ভীষণ খুশি যে তার ছেলেরা যা করতে পারেনি আমি মেয়ে হয়ে তা করেছি। এরপর আস্তে আস্তে ক্লাবে খেলতে শুরু করলাম। টাকাও বেশ ভালো পাচ্ছিলাম। শুরুতে যেখানে পাকা তিনটি রুম সেটিকে পাঁচটি করেছি।

এখন আর আগের মতো নেই: এশিয়া কাপ জয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের ‘অনেক ভালো’ বলার সাহস পেতাম না।
এখনতো মেয়েদের অধিকার অনেক। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও দারুণ সমর্থন দেন। সব মিলিয়ে বলবো যদি ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারি তাহলে এই নারী দল ছেলেদের মতোই দেশকে অনেক কিছু দেবে। আমরাতো এখন নিয়মিত শিরোপা আনছি। বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে ভয়টাই জয়ের পথ দেখিয়েছে। এইতো ভারতের মাটিতেই ওদের হারিয়ে এলাম। কারণ আমরা ভারতের সঙ্গে নিয়মিত হারতাম। তা থেকেই দলের সবাই মিলে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছি। তা এখন সত্যি।

প্রতিবন্ধকতা এখনো আছে: প্রতিবন্ধকতা একেবারে নেই, তা বললে ভুল হবে। তবে আগে বাবা-মায়েরা যে কোনো ধরনের খেলাতেই মেয়েদের দিয়ে সাহস পেতেন না। এখন কিন্তু অনেক বাবা-মা মেয়েদের খেলতে নিয়ে আসেন। তারা চান তাদের মেয়েটি বড় ক্রিকেটার হোক। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো তা ধরে রাখা। এতে করে পাইপ লাইনে অনেক ক্রিকেটার আসবে। কারণ, আমরা তো আর চিরদিন খেলবো না। তখন কাউকে তো হাল ধরতে হবে।

বিয়ে কোনো বাধা নয়: ক্রিকেট না খেললে বাবা-মা আমাকে বিয়ে দিতেন। কিন্তু ক্রিকেটার হওয়ার পর সেসব থেকে অনেক দূরে। এমনকি পরিবার থেকেও। এখন যেটা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে মনে হয় দেশের জন্য কিছু করতে হবে। আমার দলটিকেই আমি পরিবার মনে করি। তাদের সঙ্গেই আমার সুখ-দুঃখ ভাগ করি। হ্যাঁ, বিয়েতো সবার স্বপ্ন থাকে। আমাদের এক দু’জন বিয়েও করেছে। আমিও হয়তো করবো। এমন নয় যে মেয়েরা ক্রিকেট খেলে বলে বিয়ে হবে না। কারণ, আমরা যখন খেলা শুরু করি তখন থেকে এখন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এখন মানুষ আর বাঁকা চোখে দেখে না। পরিবারকে কটু কথা শোনায় না। বরং  আমাদের দেখলে মানুষ এগিয়ে আসে, কথা বলে। পরিবারকেও বেশ সম্মান দেয়। যদি আল্লাহ কপালে রাখেন আর কেউ আমাকে বিয়ে করতে চায় হয়তো সংসার করবো। কিন্তু যাই করি, মাঠ আমি ছাড়তে পারবো না। কারণ, আমার কাছে মনে হয় ক্রিকেট এখন আমার জন্য খেলা নয়, দায়িত্ব। যদি আমি দুই, তিনজন মেয়ে ক্রিকেটারও তৈরি করে দিতে পারি দেশের জন্য, মনে করবো কিছুটা হলেও আমার দায়িত্ব পালন করেছি। দেশ আমাকে যা দিয়েছে সেই ঋণ তো শোধ করতে পারবো না।

কোচ হতে চাই: হ্যাঁ, একদিন ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিতে হবে। কোনো দিন আমি টাকার চিন্তা করে খেলি নাই। পুরোটাই ছিল ভালবাসা। যেহেতু অন্য কিছু না করে ক্রিকেটকে প্রফেশন বানিয়েছি। তাই টাকা আসলে ভালো লাগতো এই ভেবে যে সংসারটা চলে যাবে। এ কারণে অনেক মেয়েও সাহস করে খেলতে আসছে। তাই খেলা ছাড়লেও ভালোবাসার কারণে ক্রিকেট ছাড়তে পারবো না। আমি চাই কোচ হয়ে সেই সব মেয়েদের পথ দেখাতে। যারা ক্রিকেট দিয়ে দেশের সম্মান আনবে আর নিজেদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চায়।

তবুও আফসোস: আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে আর তা শেষ করতে পারিনি। এখন মনে হয় যদি পড়ালেখাটা শেষ করতে পারতাম তাহলে হয়তো আরো ভালোভাবে ক্রিকেট খেলতে পারতাম। অধিনায়ক হিসেবে সব দিক থেকে যোগ্য থাকতাম।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর