× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার

আইন শিক্ষা ও আইনজীবী সনদপ্রাপ্তির জটিলতা প্রসঙ্গে

এক্সক্লুসিভ

| ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, শুক্রবার, ৯:০০

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি আইনজীবী সনদপ্রাপ্তির তিন ধাপের পরীক্ষার প্রথম ধাপে MCQ পরীক্ষাটি হয়ে গেল এবং পাস করাদের লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হয়েছে ইতিমধ্যে। প্রায় ৬৩ হাজারের মতো এলএলবি ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী MCQ পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং পরীক্ষার পরের দিনই ফল প্রকাশিত হয়। উত্তীর্ণের সংখ্যা ৮৭৬৫ যা ১৮ শতাংশের মতো। উত্তীর্ণদের বসতে হবে লিখিত পরীক্ষায়। এতে উত্তীর্ণদের যেতে হবে মৌখিক সাক্ষাৎকারে। পরিশেষে সনদপ্রাপ্তির এ সংখ্যা যে কত শতাংশে নেমে আসবে তাও অনুমানযোগ্য বলা যেতে পারে। তিন বছর বিরতির পর পরীক্ষাটি হওয়ার কথা ছিল ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে। অবশেষে কয়েকবার পেছানোর পর তা হলো ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২০।


ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর একটি প্রজ্ঞাপন ঘিরে ঘটে গেছে নানা ঘটনা। ২৩/০৪/১৪ তারিখে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রতি সেমিস্টারে ৫০-এর অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি না করানোর নির্দেশিকা জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনটি ছিল হাইকোর্টের দেয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধকরণ বিষয়ক।

উল্লেখ্য, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে এবং ২০১৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের দেয়া রায়কে বহাল রাখে আপিল বিভাগ ২৮শে ফেব্রুয়ারির এ পরীক্ষাটি ঘোষণা করছিল ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ। প্রায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৫০ ঊর্ধ্বের আওতায় এসে পড়ায় বার কাউন্সিল তাদের রেজিস্ট্রেশন দানে বিরত থাকে। এ অবস্থায় স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টে রিট আবেদন/পিটিশন দায়ের করেন। এ যাত্রায় এগিয়ে থাকেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। হাইকোর্ট পিটিশন গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রশন দেয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু বার কাউন্সিল-এর বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে। সর্বশেষ মাননীয় আপিল বিভাগ রিটকারী প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং তা আদায় সাপেক্ষে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দান করেন গত ২৬/০১/২০২০ এ। এ রায়ের ফলে শুধুমাত্র ২০১৮-এর ফল সেমিস্টার পর্যন্ত উত্তীর্ণরাই পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পায়।

উল্লেখ্য, প্রতি সেমিস্টারে ৫০ জন ছাত্র ভর্তি হলেও বাস্তবপক্ষে ঝরে পড়ার সংখ্যা প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ। ভর্তি লিস্ট এবং গ্র্যাজুয়েশন লিস্ট দেখলে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। ঝরে পড়ার কারণের মধ্যে আর্থিক সংকট, ইংলিশ মিডিয়াম হওয়ার কারণে ভাষাগত জটিলতা, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া, বিবাহ বন্ধনে, বিশেষত ছাত্রীরা, আবদ্ধ হয়ে যাওয়া, চাকরি বাকরিতে চলে যাওয়া, বিদেশে পাড়ি জমানো অথবা অন্য কোনো কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়া।
উল্লেখ্য, প্রথমসারির ৫-৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের সামর্থ্যের ওপর লক্ষ্য রেখে নির্ধারণ করা হয় শিক্ষা ব্যয়। এতদসত্ত্বেও গাঁও-গ্রামের সাধারণ মানুষগুলোর অনেকেই তাদের সন্তান বা ভাইবোনদের উকিল বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে মায়ের গলার হার আর কানের দুল, বাপের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি, ভাইয়ের ঘামঝরা অর্জন, অনেকে চাকরি করে, (কেউ বা) চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পাঠায় তাদের আপনজনদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়, যাতে তারা সনদ নিয়ে বেরিয়ে এসে ভারমুক্ত করতে পারে আপন-পরিজনদের। শত বেদনার মুখেও সন্তানদের গায়ে সাদার ওপর কালো কোর্ট-প্যান্ট আর টাইযুক্ত চেহারায় দেখতে উন্মুখ হয়ে থাকেন অভিভাকগণ। অথচ নিমিষেই তাদের আশা-নিরাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে আমরা আশা করি, দেশের সকল ক্ষেত্রে চলমান উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সঙ্গে আইন শিক্ষাকেও এর অংশীদার থাকার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল চলমান এ বিড়ম্বনা থেকে উত্তরণে যা যা করতে পারেন তা হলো :
১. এ যাবৎকাল যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ২০২০-এর জানুয়ারির পূর্বে ৫০-এর অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়েছে এবং এ যাবৎ যারা পাস করেছে তাদেরকে ২৬শে জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনের রায়ের আলোকে বিবেচনা করে শাস্তির আওতায় এনে ইন্টিমিশন দান করা।
২. কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি লিস্টে ৫০-এর অধিক শিক্ষার্থী স্থান পেলে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে অবহিত করে তা সংশোধনের তাগিদ দেয়া। (অবশ্য ৫০-এর বেশি ভর্তি করার প্রশ্ন আর আসবে না।
৩. যেহেতু ঝরে পড়ার শঙ্কা প্রায় ৫০ শতাংশ, অতএব, প্রতিঠানকে বেঁচে থাকার স্বার্থে ভর্তি তালিকা ২য় বছরে পৌঁছলে তা পাঠানোর বিধান করা।
৪. প্রতি বছর ন্যূনতম ১টি আইনজীবী সনদপ্রাপ্তির পরীক্ষা নেয়া।
৫. আইন শিক্ষাকে থিউরিটিক্যাল না রেখে বাস্তবভিত্তিক করা- অর্থাৎ কেইসভিত্তিক পুনর্বিন্যাস করার পদক্ষেপ নেয়া।
৬. আইনজীবী সনদপ্রাপ্তির জন্য একাধিক পরীক্ষা না নিয়ে সিনিয়রের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির অভিজ্ঞতা ও সনদকে গুরুত্ব দেয়া।
৭. শেষ সেমিস্টারে বাধ্যমূলক ইন্টার্নশিপ আরোপ করা যাতে ছাত্ররা আদালতপাড়ার এবং লিগাল ফার্মের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। কলেজগুলোতে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে পাঠদান এবং অনুরূপ প্রশ্নোত্তর দানকে উৎসাহিত করা।
৮. ইথিক্স এবং মর‌্যাল এডুকেশন বাধ্যতামূলক করা যাতে আইনজীবীদের ব্যক্তি ও পরিবার কল্যাণমুখিতার পাশাপাশি দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
৯. শিক্ষা বাণিজ্য এবং সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ থেকে থাকলে তদন্তভিত্তিক এর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। তাহলে দোষীরা ছাড়া বাকিরা অভিযোগ মুক্ত থাকতে পারে।
শিক্ষার্থী-শিক্ষানুরাগীসহ সকল সচেতন মহল বিশেষভাবে ইউজিসি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি সদয় বিবেচনায় নেবেন এ প্রত্যাশায় শেষ করছি নাতিদীর্ঘ এ প্রতিবেদনটি।

ড. এবিএম মাহবুবুল ইসলাম
(শিক্ষাবিদ)।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর