× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী
ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২১, সোমবার

ভারত-চীন প্রতিযোগিতা এখন ভ্যাকসিন কূটনীতিতে

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক
(১ মাস আগে) মার্চ ২, ২০২১, মঙ্গলবার, ১:৪৫ অপরাহ্ন

সীমান্ত থেকে ফ্রন্টলাইন সেনাদের সরিয়ে নিতে পারে ভারত ও চীন। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে একটি উত্তেজনার অবসান ঘটে। কিন্তু তাদের মধ্যে বিরোধ এখন ভিন্ন একটি ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে। সেটা হলো ভ্যাকসিন কূটনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব। এসব কথা লিখেছে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি। ভারতের অন্যতম প্রধান থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড এনালাইসিসের (আইডিএসএ) সাবেক সিনিয়র ফেলো রাজারাম পান্ডার মতে, বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মুদ্রার আকারে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে কোভিড-১৯ টিকা। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের দেশগুলো কিছুটা ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ভারত বৈশ্বিক চাহিদার শতকরা ৬০ ভাগ টিকা উৎপাদন করছে।
এর মধ্য দিয়ে ভারত এটাকে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবেশী ও অন্যদের সঙ্গে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এশিয়ান জায়ান্ট বলে পরিচিত চীনকে টেক্কা দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এরই মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এস্ট্রাজেনেকার বিপুল পরিমাণ টিকা বিভিন্ন দেশে বিতরণ করেছেন। কিন্তু তার নিজের দেশে এখনও এই কর্মসূচি অনেকটা পিছিয়ে।

আনাদোলু লিখেছে, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, মৌরিতিয়াস, সিসিলি, শ্রীলঙ্কা, বাহরাইন, ওমান, আফগানিস্তান, বারবাডোজ এবং ডমিনিক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে এ পর্যন্ত ভারত পাঠিয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ টিকা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তবের মতে, এর মধ্যে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছে ৬০ লাখ ডোজ টিকা। বাণিজ্যিকভাবে পাঠানো হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ডোজ টিকা। শ্রীবাস্তব বলেছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে এবং মাসগুলোতে আরো টিকার সরবরাহ পাঠানো হবে বিভিন্ন দেশে। বিভিন্ন দফায় সেগুলো পাঠানো হবে। তবে এক্ষেত্রে নিশ্চিত জাতীয় পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচিতে আভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা মনে রাখতে হবে।

ভারত সবচেয়ে বেশি টিকা যে দেশকে দান করেছে তারা হলো নেপাল। তাদের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এ ছাড়া ভারতে কূটনৈতিক কোর এবং তাদের পরিবারগুলোর সব সদস্যকে টিকা দেয়ার প্রস্তাব করেছে ভারত। শ্রীবাস্তব আরো বলেছেন, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরকেই শুধু টিকার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে এমন নয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন এজেন্সি এবং ভারতে কাজ করছে এমন আন্তঃসরকার বিষয়ক সংগঠনকেও একই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তারা যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, সেখানেই তাদের জন্য এই সুবিধা থাকবে।


চীন ভ্যাকসিন পাঠাচ্ছে
অন্যদিকে গত মাসে আফ্রিকাজুড়ে, মধ্যপ্রাচ্যে এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ১০ লাখেরও বেশি টিকার ডোজ পাঠিয়েছে চীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স উদ্যোগের মাধ্যমে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দিয়েছে এক কোটি টিকার ডোজ। আর এই বৈশ্বিক উদ্যোগে ভারত ২০ কোটি ডোজ টিকা দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। এর উদ্দেশ্য, ৯২টি নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশে টিকা নিশ্চিত করা। ওদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ৬০টি দেশে টিকা সরবরাহের জন্য কাজ করছে চীন। এরই মধ্যে কমপক্ষে ২০টি দেশ এসব টিকা ব্যবহার করছে। আফ্রিকায় বিষুবীয় গিনি, জিম্বাবুয়ে এবং সিয়েরা লিয়নে টিকা সরবরাহ দিয়েছে চীন। উপরন্ত ওই মহাদেশের আরও ১৬টি দেশে টিকা সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছে চীন।

এসব কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এশিয়ার এই দৃই বৃহৎ দেশ তাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সুযোগও পেয়েছে। এই প্রতিযোগিতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশগুলো নিজেদের সরিয়ে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেটন হল ইউনিভার্সিটিতে সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথের পরিচালক এবং স্টিমসন সেন্টারের প্রফেসর ইয়ানঝোং হুয়াং আয়োজিত অনলাইন আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, এখন পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৈশ্বিক চাহিদার শতকরা ৬২ ভাগ টিকা সরবরাহ করেছে চীন। এর মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে চীনের অগ্রাধিকারনীতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া এবং ব্রুনাই উপহার হিসেবে কমপক্ষে ২০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে চীনের কাছ থেকে। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো অন্য দেশগুলো টিকা কিনেছে বেইজিংয়ের কাছ থেকে। উপহার হিসেবে টিকা পাওয়া ছাড়াও চীনের কাছ থেকে বাণিজ্যিকভিত্তিতে টিকা কিনতে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ফিলিপাইন। এক্ষেত্রে চীন নিজেদেরকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণের জন্য প্রস্তুত চীন- এটাও দেখাতে চাইছে। এ ছাড়া এর মধ্য দিয়ে চীন তার নিজস্ব প্রযুক্তির শক্তি প্রদর্শনের একটি সুযোগ পেয়েছে।

চীনের টিকার কার্যকারিতা যদিও এখনও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে তবু তাদের টিকা উৎপাদন থেকে তারা এরই মধ্যে লভ্যাংশ পাওয়া শুরু করেছে। ইয়ানঝোং হুয়াং বলেছেন, চীনের কাছ থেকে প্রতিটি সিঙ্গেল ডোজ টিকা ইন্দোনেশিয়া কিনছে ২৫ ডলার দিয়ে। ইউক্রেন কিনছে ১৭.৫ ডলার দামে। ব্রাজিল কিনছে ১০ ডলার দামে। তুরস্ক কিনছে ১৩ ডলার দামে। এর ফলে চীন কমপক্ষে ৩০০ কোটি ডলার লাভ পাবে বলে হিসাব বলছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিটি বায়ো ফার্মাকে প্রতি মাসে ২৫ লাখ ডোজ টিকা উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স দিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক বায়োটেক। ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রবার্ট ও ব্লেক বলেছেন, চীনের লাইসেন্স শেয়ার করার আকাঙ্খা উল্লেখ করার মতো। কিন্তু পশ্চিমা কোম্পানিগুলো কখনো এ কাজ করবে না।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দৃষ্টি চীনের
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় চীনের দৃষ্টি রাখার প্রেক্ষিতে হুয়াং বলেছেন, চীন এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে অনেক দেশের সঙ্গেই তাদের রয়েছে ভূখন্ড এবং নৌসীমানা নিয়ে বিরোধ। কিন্তু তারা অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) সুবিধা পাওয়ার জন্য। এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে চীন বেশ কিছু দাবি সামনে এনেছে। তারা সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। অন্য রাষ্ট্রগুলোর দাবিকে উপেক্ষা করে জবরদস্তিমূলক কূটনীতি প্রতিষ্ঠিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্বে যাওয়ার পর কার্যত এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু চীনের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার মিত্রদের সঙ্গে আবার যোগ দিচ্ছে এবং চীনা নীতির জবাব দিচ্ছে।

অন্যদিকে যেসব ধর্নী দেশ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ১৪ ভাগ মানুষের দেশ, তারা বিশ্বে উৎপাদিত সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল টিকাগুলোর মোট টিকার শতকরা অর্ধেকের বেশি ৫৩ ভাগ কিনে নিয়েছে। এ নিয়ে ডিউক গ্লোবাল হেলথ ইনোভেশন সেন্টার একটি গবেষণা করেছে। সে অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশগুলো এখনই ৪২০ কোটি ডোজ টিকা নিশ্চিত করেছে। যেখানে নিম্ন, মধ্যআয়ের দেশগুলো মাত্র ৬৭ কোটি ডোট টিকার ব্যবস্থা করতে পেরেছে।

প্রতিবেশীদের দিকে দৃষ্টি ভারতের
টিকা উৎপাদনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারখানা হলো সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। তারা এস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ডোজ হিসেবে উৎপাদন করছে। এই গতির ফলে ভারত ব্রাজিল এবং মরক্কোর মতো দেশের কাছে টিকা পাঠাতে পারছে। ওদিকে শ্রীলঙ্কায় শক্ত করে পা রাখার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে ভারত ও চীনের মধ্যে। সেই শ্রীলঙ্কা উভয় দেশের কাছ থেকে বেশ কিছু টিকার ডোজ পেয়েছে। গত মাসে ভারতের রাজধানী কলম্বো সফর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এরপরই দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা নয়া দিল্লি থেকে পেয়েছে ৫ লাখ ডোজ টিকা। শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে আরো এক কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করেছে তারা। কিন্তু এর কয়েকদিনের মধ্যেই করোনা মহামারির বিরুদ্ধে চীনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে ৩ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে শ্রীলঙ্কা।

অন্যদিকে ভারত মহাসাগরে আরেকটি দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। সেখানে সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এক লাখ ডোজ করোনার টিকা। তা তিনি মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এর আগে জানুয়ারিতে এ দেশটিতে এক লাখ ডোজ টিকা পাঠিয়েছে ভারত। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ভারত উপহার পঠিয়েছে ৬৪ লাখ ৭০ হাজার ডোজ টিকা। এর মধ্যে মিয়ানমারকে দেয়া হয়েছে ১৫ লাখ এবং কম্বোডিয়াকে দিয়েছে এক লাখ ডোজ। এ ছাড়া মঙ্গোলিয়া এবং ফিলিপাইনে টিকা সরবরাহ দিচ্ছে ভারত। নয়া দিল্লির কাছ থেকে ৩ কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করেছে ফিলিপাইন। ২০২১ সালের শেষ ভাগে তারা এই টিকা হাতে পেতে পারে বলে মনে করছেন স্টিমসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া প্রোগ্রাম বিষয়ক গবেষণা বিশ্লেষক আকৃতি বাসুদেব। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌ সহযোগিতা বৃদ্ধির পররাষ্ট্র নীতির অধীনে ভারত তার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর