× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২১, শনিবার, ১৩ জিলহজ্জ ১৪৪২ হিঃ
অর্থনীতি

সমৃদ্ধির দৃঢ় পদক্ষেপ যাত্রার এখনই সময়

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন
২৬ মার্চ ২০২১, শুক্রবার

সত্তরের নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ১৯৭১ সনের ১৫ই ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা একাডেমিতে বলেছিলেন, “১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র ভাষা আন্দোলন ছিল না, বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক তথা স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত ছিল।” ২০১৫ সনে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সামাজিক রাজনীতির ইতিবাচক বাঁকে এবং সাংস্কৃতিক পুনরুত্থানের ধারাবাহিকতায় বলিষ্ঠ নিশ্চিত পদচারণা প্রত্যক্ষ করেছে।

নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ড. জাস্ট ফাল্যান্ড ও বৃটিশ অর্থনীতিবিদ জ্যাক পারকিনসন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আদৌ টিকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। অনুরূপভাবে ড. হেনরি কিসিঞ্জারসহ অন্যান্য রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, ও সমাজ বিশ্লেষকগণও দেশটির জন্মের পরই বাংলাদেশ সম্পর্কে আপত্তিজনক নেতিবাচক মন্তব্য করেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, কোনোমতে ভূখণ্ড ও জনগোষ্ঠী টিকে থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে না। হয়ে যাবে তলাবিহীন ঝুড়ি। ১৯৭৬ সনে ড. ফাল্যান্ড ও ড. পারকিনসন তাদের ‘বাংলাদেশ এ টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’- বইয়ে উল্লেখ করেন, “এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারে তাহলে দুনিয়ার যে কোনো দেশই অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারবে।” তাদের এই নেতিবাচক বক্তব্যকে যে বাংলার মানুষ মিথ্যা প্রমাণিত করেছে তা উপলব্ধি করেই ২০০৭ সনে এই দুই অর্থনীতিবিদ সংশোধনী দিয়ে বলেন, “গত তিন দশক বা তারো বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।”

২০১২ সনের ৩রা নভেম্বর দ্য ইকোনমিস্ট ‘আউট অব দ্য বাসকেট’- শিরোনামের এক বিশ্লেষণে বলে, “কী করা যায়, সেটি দেখিয়ে দেয়ার মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কি করে উন্নয়নের মডেলে পরিণত হওয়া যায়, সেটি দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।”

বিগত অর্থবছরে জিডিপি’র বার্ষিক প্রবৃদ্ধি শতকরা ৭ ভাগে পৌঁছে গিয়ে থাকতে পারে। সিএনএন মানিগ্রাম বলছে ২০১৫ সনে ৫টি দ্রুততম প্রবৃদ্ধির দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
২০১৯ সনে দেশটি গণচীন ও ভারবর্ষের সঙ্গে দ্রুততম প্রবৃদ্ধির তিনটি দেশের মধ্যে থাকবে। ব্লুমবার্গের মতে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তিনটি দ্রুততম প্রবৃদ্ধির দেশে উন্নীত হয়েছে ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের পিইইউ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে আগামী ২৫ বছরে পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটির মাপে পৃথিবীর তেইশতম বৃহৎ অর্থনীতি হবে (বর্তমানে চৌত্রিশতম) বাংলাদেশ এবং অর্থনীতির আকারে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে যাবে।

১৯৭২ সনে ৭.৫ কোটি জনসংখ্যার ৫.৫ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিলেন আর ২০১৫ সনে ১৬.৫ কোটি মানুষের মধ্যে ৩.৫ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছেন অর্থাৎ দরিদ্র মানুষ ভাগ্য উন্নয়ন করে মধ্যবিত্তের কাতারে যাচ্ছেন বিপুল সংখ্যায়। আর মধ্যবিত্তদের অনেকেই আরো উপরের সোপানে যাচ্ছেন।
দেশে কোটিপতির সংখ্যা এখন প্রায় ৫৪,০০০ (মতান্তরে সোয়া লাখ) এবং প্রতিবছর আরো ৫ হাজার লোক নতুন করে কোটিপতি হচ্ছেন। ড. বিনায়ক সেন ও বিআইডিএস এর একটি গবেষণা সমীক্ষায় দরিদ্রদের মধ্যবিত্তদের কাতারে উঠে আসার কথা বলা আছে যদিও এতে ব্যক্তি আয় ও আঞ্চলিক আয়ে বিপুল বৈষম্যের চিত্রও ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস এর ২০১৫ সনের  সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, ২০০৩ সনে বাংলাদেশে মোট নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ১২,২৯,৪১৩ অর্থাৎ মোট কর্মজীবীর শতকরা ১০.৯১ শতাংশ। ২০১৩ সনে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০,৫১,৭১৮ যা মোট কর্মজীবীর ১৬.২৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের ধারাবহিকতা চমৎকারিত্বের দাবিদার। ১৯৭২ সনে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ছিল ১ কোটি টন; ২০১৫ সনে তা ৩.৭৫ কোটি টন যদিও কর্ষণযোগ্য জমি কমে গেছে শতকরা ১৫ ভাগ। দ্য ইকোনমিস্ট এর ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৩ প্রকাশনীতে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশকে ১০তম স্থানে দেখানো হয়েছে।
গত পঁচিশ বছরে আলুর মোট ফলন ৯ লাখ টন থেকে ৮৩ লাখ টনে উঠে এসেছে; পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী দেশ।

মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে ৫ম; বার্ষিক চাহিদা ৪১ লাখ টন, উৎপাদন  প্রায় ৩৮ লাখ টন তন্মধ্যে ইলিশ ৩৮,০০০ টন। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসাবে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ মোট ৩ লাখ টন থেকে ২২ লাখ টনে উন্নীত করেছে, যা পৃথিবীতে ৪র্থ বৃহত্তম।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয় সকল হিসাব কিতাবকে ছাড়িয়ে বর্তমানে ৪০০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। শিল্পায়নে ঔষধ, চামড়া, খেলাধুলার সরঞ্জাম, হালকা যন্ত্রপাতি, রাবার, জাহাজ নির্মাণ,  মোটরসাইকেল, ফলভিত্তিক খাদ্য, আলু প্রক্রিয়াজাতকারী খাদ্যপণ্য, বাইসাইকেল, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক্‌স, হ্যান্ডিক্রাফ্‌টস, প্রসাধনী ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

একুশ সনের বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে তার একটা খসড়া স্বপ্ন নির্মাণ করা যায় নিকট অতীতের অসাধারণ সাফল্য ও কিছু অপূর্ণতা পূরণ করে ও নতুন উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ড শুরু করে।
নীতি কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন করে ব্যক্তিখাতে স্বদেশে বিনিয়োগকে আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব এবং উচিত। স্মরণ করা যেতে পারে যে, পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ১৮০০ কোটি ডলার; তার মাত্র ১.৫ কোটি ডলার আমরা আহরণ করি। এটি মেনে নেয়া যায় না।

বাংলাদেশে আরো দ্রুতগতি সমষ্টিক আয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স উত্তরোত্তর বৃহত্তর ভূমিকা রাখবে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদন ও রপ্তানিতে সজ্ঞান বহুমাত্রিকতা আনা ছাড়াও তৈরি পোশাক ও নিট আয়ের নতুন নতুন রপ্তানি গন্তব্যের সন্ধান আরো জোরদার করা সমীচীন হবে।

স্মরণ রাখা ভালো যে, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট বিএসটিআই-কে যত শিগশিগরই সম্ভব একটি বিশ্বমানের প্রত্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা জরুরি। এর প্রত্যয়নপত্র যেন পণ্য ও সেবা রপ্তানিতে বিনাদ্বিধায় সকল রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে সে ব্যবস্থা করা যেতেই পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, দেশে এখনো যে পরিমাণ দরিদ্র এবং বেকার মানুষ রয়েছেন, তাতে যে কোনো উন্নয়ন পথ পরিক্রমায় শিল্প স্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে আনতে হবে। বড় বড় শিল্প কলকারখানা বার্ষিক সমষ্টিক আয়ের প্রবৃদ্ধিকে দ্রুততর করবে এবং উপযুক্ত কৌশল গ্রহণ করা হলে পশ্চাৎমুখী সংযোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
উদ্যোক্তা তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনকিউবেটর স্থাপন করা যেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন যে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে কর্মসংস্থানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে ক্ষুদ্র ও মধ্যম সাইজের শিল্প থেকে। উচ্চশিক্ষায় সুনীল অর্থনীতি বিষয়ের সকল দিক নিয়ে জ্ঞান আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে।

দেশের পরম সৌভাগ্য, নেতৃত্ব যার হাতে তিনি জনস্রোতের উজানে গিয়ে জনমতধারাকে সম্পূর্ণভাবে ঘুরিয়ে দিয়ে তার পেছনে আনার ক্ষমতা রাখেন। সে উদ্ভাবনী বলিষ্ঠ নেতার অনুসারী হয়ে ২০২১ সনে সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও গৌরব মহিমার শিখরে আরো দৃঢ় পদক্ষেপ যাত্রার এখনই সময়।

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বঙ্গবন্ধু’র সাবেক একান্ত সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর