× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২১, শনিবার, ১৩ জিলহজ্জ ১৪৪২ হিঃ
অর্থনীতি

সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ দেখতে পাচ্ছি

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী

ড. জাহিদ হোসেন
২৬ মার্চ ২০২১, শুক্রবার

স্বাধীনতা-পরবর্তী একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ ছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে দেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নারী উন্নয়নসহ বেশ কিছু জায়গায় প্রশংসনীয় অগ্রগতি হয়েছে। ফলে একটি উন্নয়নশীল বা সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়েও আছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতা অর্জন করা বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেভাবে এগিয়ে গেছে, সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক দূর পিছিয়ে রয়েছে। অগ্রগতির যে পর্যায়ে আমরা আছি, সেটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি সন্তোষজনক বলা যায় না।
সন্তোষ বললে সেটা তুষ্টির দিকে চলে যায়। আর এই আত্মতুষ্টি আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে যেতে পারে। এতেই যদি আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগি তাহলে আমাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। গত ৫০ বছরে অনেক কিছু আমরা করতে পারিনি শুধুমাত্র প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে দেশের অগ্রগতি নিয়ে যদি বলি, তাহলে দেখবো, স্বাধীনতার পর আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ পেয়েছিলাম। শুধু কৃষিনির্ভর একটি দেশ ছিল। সে সময় দারিদ্র্যের হার ছিল অনেক, যখন ৭০-৮০ শতাংশ পরিবারের ৩ বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। করোনার আগ পর্যন্ত সেখানে আমাদের দারিদ্র্যের হার ২০-২১ শতাংশে নেমেছিল। আয়ুষ্কাল ছিল তখন প্রায় ৪০-৪২ শতাংশের মতো। এখন ৭০ শতাংশের ওপরে উঠেছে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার তুলনামূলক অনেক কমেছে। নারীদের ক্ষমতায়ন দেখেছি আমরা। আমরা অর্থনীতির কাঠামোর একটি রূপান্তর দেখেছি। কৃষিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি শিল্পখাতভিত্তিক এবং সেবাখাত, এই দু’টি ক্ষেত্রে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। শুরুতে কৃষি ছিল মাত্র একটি শস্যনির্ভর। সেখান থেকে এখন কৃষিতে আধুনিকায়নসহ এই খাতে বিপ্লব ঘটেছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি সত্ত্বেও উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। অথচ এটি তখনকার সময় আমাদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। তখন দুঃস্বপ্নের মতো হলেও বর্তমানে আমরা কৃষিতে সবুজ বিপ্লব দেখেছি। এর ফলে খাদ্যে যে আমরা পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি তা নয়, তবে খুব যে ঘাটতি তাও কিন্তু নয়। সে সময় আমরা ছিলাম অনুন্নত, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়। তার কারণ হলো আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল কম। তবে এখন মানব সম্পদ ব্যবহারের ফলে সেখান থেকে আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পথে। এরপর আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরের বিকাশ ঘটেছে। শিক্ষার হার অনেক নিচে ছিল, এখন বেড়েছে। শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ ছাড়া আরো কিছু অর্জন আমাদের আছে। যেমন দীর্ঘসময় নিয়ে হলেও আমাদের পদ্মা সেতু নির্মাণ হচ্ছে। মেট্রোরেল হচ্ছে। এগুলো দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।

এবার গত ৫০ বছরে আমাদের যে অর্জন সেদিক থেকে আমরা অনুপ্রেরণা পেতে পারি। যেমন; আমাদের তো এক সময় বলা হতো যে, বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র, অবস্যাম্ভাবী বলা হতো। এ রাষ্ট্র টিকবে না। এটাকে আমরা ভুল প্রমাণিত করেছি। সেখান থেকে আমাদের যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু পুরোপুরি সন্তোষজনক বলা যায় না। যদি সন্তোষ বলি সেটা কিন্তু তুষ্টির দিকে চলে যায়। অর্থাৎ যদি বলি সবকিছু ঠিক আছে, আমাদের সব আছে, এখন আমরা উন্নয়নের মডেল হয়ে গেছি। যেভাবে চলছে চুলক, তাহলেই বোধহয় আমরা অনেক এগিয়ে যাবো। এই যে আত্মতুষ্টি তা কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে যেতে পারে। এতেই যদি আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগি তাহলে আমাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

কিছু অগ্রগতি হলেও ব্যর্থতাও আছে। আমাদের দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো দেশও স্বাধীন হয়েছে। চীনেও তখন শুরু হয়েছিল নতুন সংস্কার। এখন চায়না বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে তুলনা করি, যাদের মাথাপিছু আয় এক সময় আমাদের সমপর্যায়ে ছিল। কিন্তু এই একই সময়ে গত ৫০ বছরে তারা অনেক বেশি অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে। বিশেষ করে দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে, মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে, অর্থনীতির রূপান্তরের ক্ষেত্রে তারা যে অগ্রগতি করেছে, তাদের মতো বাংলাদেশ কেন উন্নয়ন করতে পারেনি, চীন কিংবা ভিয়েতনামের মতো কেন পারেনি? বরং তাদের থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এর কারণ হলো- তারা যেভাবে সংস্কার করেছে আমরা সেভাবে পারিনি। তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে পেরেছে আমরা সেটি পারিনি। এখানে বড় কারণটি হলো গভর্নেন্সের কারণটি। সংস্কার কারা করে? সংস্কার করে প্রশাসন। একটি হলো যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছাটি বাস্তবায়ন করবে প্রশাসন। অর্থাৎ আমরা এই ৫০ বছরের অনেক কিছু করতে পারিনি শুধুমাত্র প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে। এ ছাড়া আমাদের সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে আমরা চালিয়ে নিতে পারি না। আমাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে এখনো অনেক আদিমকালের নিয়ম-কানুন রয়ে গেছে। এগুলোকে সংস্কার করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ; সেদিক থেকেও আমরা সফলতা পাইনি। সেজন্য আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে উন্নয়ন খরচও অনেক বেড়ে গেছে। রাজধানীর কথা যদি চিন্তা করি সেখানে দেখা যাচ্ছে আমাদের নগরায়ন হয়েছে ঠিক, কিন্তু সেটি নগরায়নের কাঠামোর মধ্য দিয়ে হয়নি। এতে আমাদের একটি আবাস অযোগ্য রাজধানী তৈরি হয়েছে। সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি যতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবই ঢাকায়। এই অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে পরিবেশ দূষণ, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ অনেক বেড়ে গেছে। তাছাড়া এই দীর্ঘ সময় অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণের যতটা সম্ভাবনা ছিল ততটা হয়নি। এদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।

লেখক: বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর