× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী
ঢাকা, ৯ মে ২০২১, রবিবার, ২৬ রমজান ১৪৪২ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১২)

‘লাইনে দাঁড় করিয়ে আমাদের দিকে তাক করলো মেশিনগান’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
২ এপ্রিল ২০২১, শুক্রবার
সর্বশেষ আপডেট: ৭:১৮ অপরাহ্ন

এবার আমরা আবার পেছন ফিরে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। ইচ্ছাকৃতভাবে আমরা দু’জনই অন্যরকম বেশ ধারণ করলাম। শেভবিহীন মুখমণ্ডল, অর্থাৎ খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পরনে লুঙ্গি ও মলিন শার্ট, পায়ে কমদামি সেন্ডেল, হাতে ছাতা, অন্য হাতের সঙ্গে কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ। আমাদের দেখাচ্ছিল আগাগোড়া একজন সাধারণ গ্রাম্য কৃষকের মতো। আবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো নৌকা, রিকশা কিংবা বাসে- যাতে করে কেউ ঘুণাক্ষরেও আমাদের রাষ্ট্রবিরোধী কোনো তৎপরতার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করতে না পারে। অথচ বুকে আমাদের তখন জমা হয়ে আছে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা অর্জনের অদম্য স্পৃহা। ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নরসিংদী পৌঁছানো অবধি সবকিছু একরকম ঠিকই চলছিল। তখন যাচ্ছিলাম একটা বাসে করে।
হঠাৎ করে পাকা রাস্তার উপর বাসটা টায়ারে প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে পাশের একটা নালায় প্রায় পড়ে যেতে যেতে কোনোরকমে কাত হয়ে থেমে গেল। আমরা এই ভেবে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যে, মারাত্মক একটা সড়ক দুর্ঘটনা থেকে আমরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে, ঘটনা তার চাইতে অনেক বেশি ভয়াবহ। আসলে আমাদের বাস আটক করেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বাস থেকে নামামাত্র কয়েকজন অস্ত্রধারী ইউনিফর্ম পরিহিত সৈন্য এসে মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ফেললো আমাদের বাস। তারপর বাসের জনাবিশেক আরোহীর সবাইকে নামিয়ে যার যার মালামাল সামনে রেখে দাঁড় করানো হলো একটা লাইনে। আমাদের দিকে সরাসরি তাক করে বসানো হলো একটা মেশিনগান। আমরা তখন যুদ্ধের প্রথম দিকের শহীদ হতে যাচ্ছি মনে করে ভয়ে হয়ে পড়েছি আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত। দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন অবস্থায় কেমন ভয়ঙ্কর একটা শূন্যতা এসে আমাদের গ্রাস করে ফেললো। আমাদের নিজেদেরই যেন মনে করছিলাম অস্তিত্ববিহীন। অনেকক্ষণ অবধি আমাদের কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমরা কিছু অনুমানও করতে পারছিলাম না। তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম যে, আমাদের বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজনেরা কোনো কিছু জানার আগেই আমরা পরিণত হতে যাচ্ছি রাস্তার পাশের কুকুরের মহাভোজের সামগ্রীতে। হয়তো সন্ধানী শকুনীদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে রাস্তার পাশে গড়াগড়ি করবে কুকুরের উচ্ছিষ্ট কয়েক টুকরো হাড় যাতে আর মাংসের বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট থাকবে না।
এবার শুরু হলো তল্লাশির পালা। দু’জন করে সৈন্য এসে বাসের সকল আরোহীকে এক একজন করে তল্লাশি করা শুরু করলো। তল্লাশিকালে তারা সঙ্গের ব্যাগ, দেহ, কাপড়চোপড় কোনোকিছুই বাদ দিচ্ছিল না। এমনকি আরোহীদের গুপ্তাঙ্গ পরীক্ষা করে তারা জিজ্ঞেস করছিল হিন্দু না মুসলমান। পাকিস্তানি হলেও তারা কিন্তু আমাদের পরিচিত উর্দু ভাষায় কথা বলছিল না। বাচনভঙ্গি অন্য ধরনের, খুব সম্ভবত পাঞ্জাবি কিংবা পশতু ভাষায় কথা বলছিল। তল্লাশি শেষ করে সৈন্যগুলো সারবেঁধে দাঁড়ালো মেশিনগানধারীর পাশে। মেশিনগানধারী ততক্ষণে একপাশ থেকে বেল্টে ঝুলানো বুলেটের সারি মেশিনগানে ফিট করে আমাদের দিকে নল স্থির করে ফেলেছে। শুধু ট্রিগার চেপে ধরলেই একসারি বুলেট এসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের দেহকে ধুলায় লুটিয়ে দেবে। এমন সময় অফিসারদের একজনকে দূর থেকে চিৎকার করে অস্পষ্ট ভাষায় কিছু একটা নির্দেশ দিতে শোনা গেল। রোদের পড়ন্ত বেলায় লম্বা করে ছায়া ফেলে ধীরে ধীরে সেই অফিসারটি সবার সামনে এসে দাঁড়ালো। সে অপেক্ষমাণ সৈন্যদের সঙ্গে একটু নিচু গলায় ও অস্ফুটস্বরে কিছু কথা বললো। তারপর সেই অফিসারটি হাতের পুরো পাঁচটি আঙ্গুল উপরে তুলে আমাদের দিকে ইশারা করে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলো।
আমাদের তখন একেবারে পড়ি কি মরি অবস্থা। আর পেছন ফিরে না এলে আমরা আগপিছ কিছু না ভেবে ক্ষেত-নালার ওপর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিলাম। দূর-দিগন্তে শহরের বিদ্যুৎ বাতির আবছা আলোর আভাস পাচ্ছি। আমাদের গন্তব্য সেই দিকেই। পা থেকে সেন্ডেল কখন ছুটে গেছে টেরই পাইনি। লুঙ্গি হাঁটুর উপরে তুলে আমরা তখন দুরন্ত বেগে ছুটছি। জীবনে কখনো এত জোরে দৌড়াইনি আমি। আমার পেছনে পেছনে মোস্তফা মনোয়ার। অর্থাৎ এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম আমরা।
ঢাকা শহরে পৌঁছে আমাদের মনে হলো আমরা পরিত্যক্ত একটা শহরে উপস্থিত হয়েছি। জনশূন্য, কোলাহলবিহীন, জনমানবের কোনো সাড়া নেই। বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ। গাড়ি চলাচলের প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে দু’-একটা রিকশা নীরবে চলাচল করছে। রাত সবে সাড়ে আটটা। অথচ বিন্দুমাত্র ট্রাফিক জ্যাম নেই রাস্তায়। ফুটপাত থেকে হকাররা উধাও হয়েছে। কেনাকাটার জন্যও লোকজন নেই বললেই চলে। হাতে গোনা কয়েকজন পথচারী ছাড়া আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, নিরাপত্তার কারণে বাসায় না ফিরে আমরা রাত কাটাবো ইস্কাটনে বৈজু আপার বাসায়, তার সাথে আমাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবো। বৈজু আপার স্বামী ছিলেন আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর কোষাধ্যক্ষ শহীদ সাইদুল হাসান, যাকে পাকবাহিনী সেই বছর মে মাসে হত্যা করেছিল। সে বাড়িতে গিয়ে বুঝলাম, শহরে তখন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। ভয়েই হোক কিংবা প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই হোক, শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষ ইতিমধ্যে গ্রামে চলে গেলেও রাজধানী শহরের প্রায় পুরোটাই তখন চলে এসেছে পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বৈজু আপা দু’জন রেডিও ইঞ্জিনিয়ারের সাথে যোগাযোগ করলেন। পরদিন তাদের দু’জনেই আমাদের সাথে দেখা করে আমাদের সমস্যার কথা শুনলেন। কিন্তু দু’জনের কেউই তাদের সন্তানসন্তুতি ও পরিবার পেছনে ফেলে আমাদের সাথে যেতে রাজি হলেন না। পরদিন ঢাকা ত্যাগ করে অন্য একটা রুটে আগরতলা এসে আমরা দেখলাম যে, কোলকাতা থেকে একজন রেডিও ইঞ্জিনিয়ার এনে ইতিমধ্যেই ছোট একটা রেডিও স্টেশন চালু করা হয়েছে। আমরা সেখানে সানন্দে যোগ দিলাম।
কিন্তু যে মুহূর্তে আমরা শুনলাম যে, শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচর ও দলের দ্বিতীয় নেতা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ তার সহকর্মীদের সাথে যোগ দিতে আগরতলা আসছেন, তখন রেডিও’র রাজনৈতিক ভাষ্যকার হওয়ার চাইতে আমার সমগ্র দেহ মন নিবিষ্ট হলো সরাসরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে গেল সপ্তাহে দিল্লিতে দেখা করার পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে প্রবাসী একটি সরকার গঠনের জন্য তাজউদ্দীনকে পরামর্শ দিয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদকে দিল্লিতে সঙ্গতভাবেই জানানো হয়েছিল যে, সরকারি পর্যায়ে সাহায্য ও সহযোগিতা পেতে চাইলে প্রথমে তাকে গঠন করতে হবে একটি আনুষ্ঠানিক সরকার। তাজউদ্দীন ছাড়া অপর চারজন নেতা খন্দকার মোশ্তাক আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান ইতিমধ্যে আগরতলা সার্কিট হাউজে এক রুদ্ধদ্বার কক্ষে প্রায় সারাদিন তর্ক-বিতর্ক করে কাটালেন। একা একা দিল্লি গিয়ে আলোচনা করায় বাকিরা তাজউদ্দীনকে দোষারোপ করলেন। তবে তাদের তর্কের মূল বিষয় ছিল প্রবাসী সরকারে কে কী পদ পাবেন তা ভাগাভাগি করা। একপর্যায়ে দরজা খুলে ঘরের বাইরে এলেন তাজউদ্দীন। পাশের ঘরে অপেক্ষমাণ                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                           আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি বললেন, “আমরা কি যুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছি, নাকি পদ নিয়ে লড়াই করছি, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ঘরের ভেতরে এখন সেই তর্কই চলছে। সবচেয়ে বেশি প্রব্লেম তৈরি করছেন মোশ্তাক ভাই।” এই বলে আবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। পরের দিন সবাইকেই মনে হচ্ছিল উৎফুল্ল। আপাতভাবে সবাই মেনে নিয়েছেন যে, অস্থায়ীভাবে গঠিত সরকারে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হবেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী হবেন তাজউদ্দীন আহমদ, মোশ্তাক হবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং কামরুজ্জামান পুনর্বাসন মন্ত্রী। একই দিনে একটি ভারতীয় কার্গো বিমানে চড়ে তারা পাঁচজন কোলকাতায় রওনা হয়ে গেলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব দিতে। একটি নিয়মিত ফ্লাইটে করে পরদিন আমরাও আগরতলা থেকে কোলকাতায় রওনা হয়ে গেলাম।

(চলবে...)

মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৯) 
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১১)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
Shamsul Hoque
৩ এপ্রিল ২০২১, শনিবার, ১:৪৪

দুর্দান্ত লেখা, এটি ভবিষ্যতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে । মহান ব্যক্তির মহান লেখা । আল্লাহ এই মহান ব্যক্তিকে জান্নাতবাসী করুন! আমীন!

অন্যান্য খবর