× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী
ঢাকা, ৯ মে ২০২১, রবিবার, ২৬ রমজান ১৪৪২ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২০)

‘পাকিস্তানের মাইনাস-টু থিওরি বাংলাদেশে প্রযোজ্য হতে পারে না’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
১১ এপ্রিল ২০২১, রবিবার
সর্বশেষ আপডেট: ৭:৪২ অপরাহ্ন

মঙ্গলবার ২৪ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১২
৫৪ বছর বয়স্ক সুঠামদেহী আমার ফালতু মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনকে দেখলে প্রথম দৃষ্টিতেই মনে হবে সম্ভ্রান্ত ঘরের, শান্ত-সমাহিত গোছের নিবেদিত প্রাণ একজন মানুষ। আমি কিছু করার জন্য তাকে কোনো নির্দেশ না দিলে কিংবা তার কাছে কিছু না চাইলে সে তার জন্য নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে এক পাও বেশি অতিক্রম করতে নারাজ। কিশোরগঞ্জে তার দেশের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে একখণ্ড জমি নিয়ে বিরোধের জের হিসেবে খুনের মামলার আসামি জিয়াউদ্দিনকে ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর ২০ বছর সে ইতিমধ্যে পার করেছে। তার বাবা ছিলেন স্থানীয়ভাবে গণ্যমান্য একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। এক ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন মেজর; সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। ৩৪ বছর বয়সে জিয়াউদ্দিন তার দু’জন ভাতিজাকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করতে গিয়ে স্বেচ্ছাকৃতভাবে খুনের দায় স্বীকার করে নেয়। তারই নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী জিয়ার স্ত্রী ও সন্তানেরা জেলখানায় তার সাথে দেখা করতে আসে না।
তবে খবরাখবর রাখে। ২০ বছরে তাদের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে জিয়া অনেক সময় তা কল্পনাও করতে পারে না। পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে গিয়ে তার স্ত্রীকে সংসারের শেষ সহায়সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। কঠোর দারিদ্র্যের মধ্যেও তার এক মেধাবী কন্যা এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। তাই নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জিয়াউদ্দিন এখনো আশাবাদী।
আমার জন্য কাজ করার আগে জিয়াউদ্দিন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্য কাজ করেছে। তার অনুসন্ধিৎসা ও অনুমানশক্তি অত্যন্ত প্রখর। নতুন ও পুরনো কয়েদিদের সঙ্গে মেলামেশা করে, রেডিও শুনে, জেলা অফিসারদের সাথে খোলামেলাভাবে কথাবার্তা বলে এবং সময় পেলে পত্রিকাও পড়ে সবসময় চলতি ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত থাকার চেষ্টা করে। তার মতে, দ্রব্যমূল্যের ক্রমবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট এবং হাসিনা-খালেদার প্রতি বিরূপ আচরণের কারণে জনগণ বর্তমান সরকারের উপর খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। অতীতে ভুল করে থাকলেও রাজনীতিবিদদের ওপর জনগণের আস্থা রয়েছে। তার শেষ কথা হলো, জনগণ সবকিছু বোঝে এবং তাদের বোকা বানানো অত সহজ নয়। জিয়াউদ্দিন কথা বললে মাঝে-মধ্যে আমি নিজের দুঃখণ্ডবেদনার কথা ভুলে যাই। আমি জেলে এসেছি আজ মাত্র ছয়দিন অথচ জিয়াউদ্দিন এখানে বাস করছে ২০ বছর ধরে।
আশা করছিলাম বিকেলে আমার জুনিয়র ব্যারিস্টার খোকন ও আমার স্টাফ শহীদের দেখা পাবো। কিন্তু ওদের কেউ এলো না।

বুধবার ২৫ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১৩
ভীষণ রকমের বিষণ্নতায় ভুগছি আমি। মাঝে-মধ্যে মনে হচ্ছে, এ জীবন রেখে কী লাভ? মনে হয় বেঁচে থাকার আর কোনো উদ্দেশ্য আমার থাকতে পারে না। আমার পরিবার, সন্তানাদি, জনগণ কিংবা দেশের জন্য আমি এই মুহূর্তে কোনো কিছু করতে অক্ষম। অন্ধকূপে পাঁচদিন কাটানোর ভয়াবহ স্মৃতি অহরহ আমাকে তাড়া করে ফিরছে। সে কথা মনে হলেই আমার ভেতরটা আঁতকে ওঠে। আমার কাছে তখন মনে হয় জীবনটা বেদনাময়, যন্ত্রণাময়, অত্যাচারবিদ্ধ ও হতাশাব্যঞ্জক এক মহাশূন্যতায় ভরপুর। কাজেই এ জীবন ধরে রাখাটাই মনে হয় নিরর্থক।
হাসিনা ও খালেদা দু’জনেই অনমনীয় পদক্ষেপ নেওয়াতে ভালো লাগছে। খালেদা দেশের বাইরে যেতে নারাজ। বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থানরত হাসিনা চাচ্ছেন দেশে ফিরে আসতে। সরকার এখানে পাকিস্তানি মডেল অনুসরণ করে দু’জনকেই দেশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু নেতৃত্বের পরিপক্কতা বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই এই সরকারের নেই। আমি দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি যে, ওদের পরিকল্পনা ভণ্ডুল হতে বসেছে। পাকিস্তানের এই মাইনাস-টু থিওরি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। কারণ এখানকার পরিস্থিতি, ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ, রাজনৈতিক চলমানশীলতা, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ইত্যাদি সবই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী।
খোকন ও শহীদ গতকাল ঠিকই এসেছিল- কিন্তু আমার সাথে দেখা করার অনুমতি তারা পায়নি।

বৃহস্পতিবার ২৬ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১৪
বৃষ্টি এসে আমার সবকিছু ভিজিয়ে দিয়েছে। আমার রুম, বইপত্র, ফাইল, বিছানা সবকিছুই ভিজে গেছে। জিয়াউদ্দিন এখন সবকিছু সামলাচ্ছে।
ওরা এখন বলছে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কথা, যা ওদের মুখে মানায় না। মিথ্যাচারিতা ও ধোঁকাবাজির এ এক চরম দৃষ্টান্ত। চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ নেই।
অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের এখন অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে উপর থেকে। প্রতিদিন প্রতিটি বিষয়ে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের তরফ থেকে নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে  সুপ্রিম কোর্টেও একই অবস্থা।
আজকেই প্রথমবারের মতো দেখলাম সরকারের রাজনৈতিক পরাজয়ের নমুনা। দুই নেত্রীকে দেশের বাইরে রাখার মাইনাস-টু থিওরি ভেস্তে গেছে। চারদিন আগে সরকার হাসিনার দেশে ফেরার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে। এবার হাসিনার দেশে ফেরার পালা।

শুক্রবার ২৭ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১৫
ঠাণ্ডা, শান্ত সমাহিত একটি দিন। খবরের কাগজেও উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু নেই। সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের দুই নেত্রীকে দেশের বাইরে রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। এখন নতুন করে পরিকল্পনা নিতে হবে ওদের ।
প্রায় ২০ দিন পর খালেদা জিয়া তার বাসা থেকে বের হয়ে তার ভাইয়ের সাথে নৈশভোজে যোগ দিয়েছেন। সবাই মুখে বলছেন রাজনৈতিক দলগুলোতে সংস্কারের কথা। কিন্তু বাস্তবে ঠিক কী করতে হবে এবং কীভাবে তা করতে হবে সে ব্যাপারে খুব কম ব্যক্তিই জ্ঞান রাখেন।
আমাদের পুত্র আমান, কন্যা আনা ও আমার স্ত্রী হাসনা কীভাবে দিন কাটাচ্ছে। ভেবে আমি উদ্বিগ্ন। ওদের কথা মনে হলেই বিষণ্নতায় ছেয়ে যায় আমার মন। ব্যাটারিচালিত ছোট একটি টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে আজ আমি পবিত্র কোরআন শরীফ পড়তে পেরেছি।
এ মুহূর্তে আমি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে লিখছি। উপ-কারা মহাপরিচালক (ডিআইজি) আজ আমার সেল দেখতে এসেছিলেন। বাইরে থেকে আজ কেউ আসেনি আমার সঙ্গে দেখা করতে।

শনিবার ২৮ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১৬
সেনাপ্রধান ঘোষণা করেছেন যে, “সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতির সাথে জড়িত হবে না। তারা চাইলে ১১ জানুয়ারিতেই ক্ষমতা দখল করে নিতে পারতেন। কাজ শেষ হলেই ওরা ব্যারাকে ফিরে যাবেন।”
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে আবার বলা হয়েছে যে, তারা দেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চান। খুবই আশ্চর্যজনক লাগছে। তাহলে কি পরিকল্পনায় পরিবর্তন ঘটেছে? তাহলে এখন কী ঘটতে যাচ্ছে? দুই নেত্রীকে নিয়ে তারা এখন কী করে সে হবে একটা দেখার বিষয়। এবার রাজনীতি এক নয়া মোড় নিতে বাধ্য এবং শেষাবধি রাজনীতি তার প্রচলিত পথ ধরেই এগিয়ে যাবে।
আমি সবসময় নিজেকে প্রশ্ন করি- আমাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো?
কেউ আজ আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি।

রবিবার ২৯ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১৭
শান্ত একটি দিন।
দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লিখছি ও পড়ছি। কাঁধে ব্যথা নিয়ে লিখতে কষ্ট হয়। রোহিঙ্গাদের নিয়ে লেখা শেষ করেছি। এখন শুরু করেছি ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’।
শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমান ও তার স্ত্রী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিন ও তার ছেলে, আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিনের নামে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামীম ওসমানকে সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে কোনো রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের এটাই প্রথম দণ্ডাজ্ঞা।
আমানের স্ত্রী জোরাহ, রিয়াদ ও ওদের বাবা আজ আমাকে দেখতে এসেছিলেন।

সোমবার ৩০ এপ্রিল ২০০৭ দিন ১৮
বৃষ্টিহীন, গরম, ভ্যাপসা একটি দিন। এতে বোঝা যায় বর্ষার মৌসুম ঘনিয়ে আসছে। কোথাও তেমন কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা নেই। চারদিক শান্ত। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সৌদি আরব খালেদা জিয়াকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে- অথচ গতকালই খবর ছিল অন্যরকম। কী হচ্ছে চারদিকে? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ রয়েছে। আমার ধারণা পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারেই এটা করা হয়েছে যাতে করে খালেদা জিয়া দেশের বাইরে না গিয়ে ভেতরেই অবস্থান করতে পারেন।

(চলবে... )

আরো পড়ুন-
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৯) 
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৯)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর