× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী
ঢাকা, ৯ মে ২০২১, রবিবার, ২৬ রমজান ১৪৪২ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৪)

‘যখনই ক্ষমতা স্বৈরাচারী কায়দায় ব্যবহার হয় তখনই জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছে’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
১৭ এপ্রিল ২০২১, শনিবার
সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৯ অপরাহ্ন

শনিবার ১৯ মে ২০০৭ দিন ৩৭
এখন যে শাসকদের শাসনাধীনে রয়েছি তারা জনসাধারণের কোনো ম্যান্ডেট আসেনি এবং তাদের মধ্যে জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই। জনগণের সঙ্গে তাদের নেই কোনো যোগাযোগ, নেই তাদের দেশ চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা। এ জিনিসটি তারা বুঝতে অক্ষম যে, স্বাভাবিকভাবে ও বস্তুত বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা হলো এক ধরনের গতিশীল সমাজব্যবস্থা। এখানে ইস্যু সৃষ্টি হয় অতি দ্রুত। জনগণ চান ঘন সমস্যার ত্বরিৎ সমাধান। কিন্তু যখনই জনগণ দেখতে পান যে, সমস্যা নিয়ে অবহেলা দেখানো হয়েছে বা ক্ষমতাকে স্বৈরাচারী কায়দায় ব্যবহার করা হচ্ছে তখনই তারা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। যখন বড় বড় কথা বা শূন্যগর্ভ প্রতিশ্রুতি বাস্তব কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়, জনগণ তখন প্রকাশ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। প্রত্যাশা পূরণ না হলে যত তাড়াতাড়ি জনগণ একদিন সমর্থন জানিয়েছিল, তার চাইতে তাড়াতাড়ি তা প্রত্যাহার করে নেয়।

বিগত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশ চলছে জরুরি ব্যবস্থার অধীনে যা বাস্তবে সামরিক শাসনের চাইতেও খারাপ।
সরকার এখনো টিকে আছে, কারণ তার পেছনে রয়েছে সেনাবাহিনীর সমর্থন। সুতরাং বস্তুত এটি হলো বেসামরিক ছদ্মাবরণে সামরিক শাসন। যা বেশিদিন চলতে পারে না। সামরিক শাসন জারি হলে জনগণ অন্তত বুঝতে পারে কে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং সামরিক আইনের অর্থই হলো তাদের কাছে সেনাবাহিনীর শাসন। কিন্তু জরুরি অবস্থার অধীনস্থ সরকার সামরিক বা গণতান্ত্রিক বেসামরিক সরকারের কোনোটাই না। জরুরি আইনের অধীনে যে সমস্ত বিধি তৈরি করা হয় তা জনগণের জীবনযাত্রাকে বিষময় করে তুলতে পারে। মানবাধিকার যেভাবে লঙ্ঘন করা হয়, নিম্ন আদালতগুলোকে যেভাবে ক্যাঙ্গারু কোর্টে পরিণত করা হয়, আইনগত প্রক্রিয়াকে যেভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্ট অবধি আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার নীতিমালা যেভাবে খর্ব ও নস্যাৎ করা হয়, অনেক সামরিক আইনেও সে ধরনের যথেচ্ছাচার করতে দেখা যায় না।

মনে হচ্ছে ড. কামাল হোসেন তার সুর পরিবর্তন করেছেন। এতদিন ধরে তিনি এই বলে সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন যে, জরুরি অবস্থা নির্দিষ্টকাল যাবৎ বহাল রাখা যেতে পারে। কিন্তু এখন তিনি বলছেন যে, অবিলম্বে এই জরুরি আইন প্রত্যাহার করা উচিত। আশা করি এটা বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো অসততার দৃষ্টান্ত নয়।


রবিবার ২০ মে ২০০৭ দিন ৩৮
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুর্নীতি নির্মূল করা ছাড়া দেশে সরকারের আর কিছু করার নেই। নেই সরকারের আর কোনো এজেন্ডা, অন্য কোনো অগ্রাধিকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি, মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। কর্মসংস্থানহীনতার হার বৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে কোনো কিছু লেখার অধিকার সংবাদপত্রগুলোকে দেয়া হয়নি। জোর করে তাদেরকে দিয়ে শুধু দুর্নীতির ওপর খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। কোনোরকম জবাবদিহিতাশূন্য অবস্থায় সরকারের অন্তঃসারশূন্যতা, সাধারণ লোকের উপর শোষণ ও নির্যাতন, গ্রামীণ অর্থনীতির ক্রমাবনতি কিংবা এসব ধরনের অন্য কোনো সমস্যা সংবাদগুলোতে প্রাধান্য দিতে দেওয়া হয় না। আইন উপদেষ্টা, জেনারেল মতিন, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার- এদের জন্য আমার দুঃখ হয়। এরা সকলেই অতিরিক্ত কথা বলছেন। খুব সম্ভবত এরা ভুলে গেছেন যে, চিরদিন এরা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। একদিন তাদের বিদায় নিতে হবে। উন্মত্ততা, ঔদ্ধত্য, প্রতিহিংসা, রোষ, অহমিকা কিংবা প্রতিশোধমূলক যে কোনো কার্যকলাপ কোনো না কোনো সময় নেতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসতে বাধ্য।

সোমবার ২১ মে ২০০৭ দিন ৩৯
আমার সুটকেস রিলিজ করার ৬ দিন পর হঠাৎ করে জেল কর্তৃপক্ষ আমার ইনকাম ট্যাক্স সংক্রান্ত কিছু চিঠিপত্র এবং কোর্ট কেস সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র জব্দ করেছে।

এ ব্যাপারে আমাকে কিছু জানানো হয়নি বা আমাকে কোনো জব্দ তালিকা দেওয়া হয়নি। কাগজপত্রগুলো কোনো সরকারবিরোধী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো দলিলাদি ছিল না। আজ আমি সেই কাগজপত্রের অনুলিপি ফেরত দেওয়ার জন্য ডিআইজিকে চিঠি লিখেছি।

আইনের শাসন, সরকারে নিরপেক্ষতা ইত্যাদি নিয়ে বড় বড় কথা বলা হচ্ছে প্রচুর। জরুরি অর্ডিন্যান্সে আইনের শাসনের কোনো অস্তিত্ব নেই কিংবা জরুরি আইনে বিচারবিভাগের স্বাধীনতার কোনো অস্তিত্বও থাকে না। যে কোনো বৈষম্যমূলক আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তির প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সকল অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আপিল করার অধিকার বহাল আছে কিন্তু উচ্চতর আদালত নিম্ন আদালতের কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত বা আদেশ স্থগিত ঘোষণা করতে পারছে না। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগেই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি আপিলসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বিক্রি পর্যন্ত করে দেওয়া হচ্ছে। আদালতের কাছ থেকে কোনো আদেশ সংগ্রহ না করেই নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং মানুষের সহায়-সম্পত্তি দখল করছে। আদালতের কোনো নির্দেশ ছাড়াই যৌথবাহিনীর সদস্যরা দিনে বা রাতে যে কোনো সময় যে কোনো ঘরবাড়ি বা অন্য কোনো স্থানে অনুপ্রবেশ করতে পারছে। ১৯৭২-৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীও ঠিক এ ধরনেরই আচরণ করতো।

মঙ্গলবার ২২ মে ২০০৭ দিন ৪০
এমআরআই করার জন্য আবার আমাকে নেওয়া হয়েছে পিজি হাসপাতালে। একই উদ্দেশ্যে এ ছিল আমার ষষ্ঠবারের জন্য পিজি হাসপাতালে গমন।
আজকাল পুলিশ রিমান্ডের নামে কাউকে নিয়ে গিয়ে ভিডিও ক্যামেরার সামনে জোর করে কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে দোষ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। তাদের দেওয়া হয় দৈহিক অত্যাচারের হুমকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। জেলগেটে মামলাসংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ করে ফেলা হয়। আমার মতো একজন লোকের ক্ষেত্রেই যদি এমন সম্ভব হয়, তাহলে একজন নিরীহ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। নির্যাতনমূলক আইনের অধীনে চলছে বিচারের কাজ। যাদেরকে যখনই আটক করা হচ্ছে তাদের ইচ্ছেমতো সাজা দেওয়ার জন্য এসব আদালতকে ক্যাঙ্গারু কোর্টে পরিণত করা হয়েছে। জরুরি আইনের অধীনে কোনো বিচারই অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না এবং এ হলো পক্ষান্তরে সুবিচার পাওয়ার অধিকার পরিপন্থি।
সবচাইতে আশ্চর্যকর ব্যাপার হলো, বিগত সরকারের সময় কতিপয় রাজনীতিবিদের জনসম্মুখে দারুণ রকমের দুর্নাম থাকলেও এখন তারা মুক্ত অবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন অবশ্য পালাতক। অথচ যে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথেই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, অবৈধ পথে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন এমন কোনো অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারকে আজ পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগে খোঁজা হয়নি বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর কারণ কি?

বুধবার ২৩ মে ২০০৭ দিন ৪১
রক্ত-মাংসের একজন মানুষ কীভাবে ক্রমশ এক কঠিন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, আমি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। দিনে দিনে জেল-জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আমি। মনে হচ্ছে এটাই বোধহয় আমার স্বাভাবিক জীবন। কোনো কিছুই আর আমাকে ভাবাবেগে আপ্লুত করে না, আমি হয়ে গেছি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন, যে কোনো রকমের প্রত্যাশাবর্জিত। এই একাকী, বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রায় আমি এখন অভ্যস্ত। মাঝে-মধ্যে মনে হয়, এটা একেবারে মন্দ নয়।

প্রতিদিন ভোর ৪টায় আমি জেগে উঠি ঘুম থেকে। আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে নামাজে বসি। আমাকে যেসব অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে আমি সেসব কোনো দুর্নীতির সাথে জড়িত না থাকলেও এবং অযথা দুর্নামের শিকার হলেও প্রত্যেক দিন আমি নীরবে কাঁদি এবং এই শাস্তি, অপদস্থতা ও গঞ্জনার জন্য নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করে আত্মধিক্কার দেই। কাজেই এই চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে আমি ক্রন্দন করি যে, আমার  বোধহয় আর বেঁচে থাকার অধিকার নেই। দেশের জন্য এত কিছু করার পরেও জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে আমি এমন এক শ্রেণির লোকের আক্রোশের পাত্র হয়েছি যারা এই দেশ ও জাতি গঠনে কোনোদিন কোনো ভূমিকাই রাখেনি কিংবা তারা কোনোরকম আত্মত্যাগ কিংবা সংশ্লিষ্টতার ধারে-কাছেও ছিল না। জাতি তাদের কোনোরকম ম্যান্ডেটই দেয়নি। চিৎকার করে আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, আমার সঙ্গে এরকম আচরণ করার অধিকার কে দিয়েছে তাদেরকে?
মাঝে-মধ্যে হাসনা, আনা ও আমানের ভবিষ্যৎ ভেবে আমি শঙ্কিত হই। এক বুক দীর্ঘশ্বাস এবং চোখে এক নদী অশ্রু নিয়ে আমি নির্ঘুম রাতে আশ্রয় নিই শয্যায়।

(চলবে..)


আরো পড়ুন-
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৯) 
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৯)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৩)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
পাঠকের মতামত
**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
fastboy
১৭ এপ্রিল ২০২১, শনিবার, ১১:১৩

‘যখনই ক্ষমতা স্বৈরাচারী কায়দায় ব্যবহার হয় তখনই জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছে

অন্যান্য খবর