× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২৫ জুন ২০২১, শুক্রবার, ১৩ জিলক্বদ ১৪৪২ হিঃ
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩২)

‘সেই তথাকথিত বিশিষ্ট আইনজীবীরা এখন কোথায়’

বই থেকে নেয়া

স্টাফ রিপোর্টার
২৫ এপ্রিল ২০২১, রবিবার
সর্বশেষ আপডেট: ৫:১৭ অপরাহ্ন

বৃহস্পতিবার ৫ জুলাই ২০০৭ দিন ৮৪
আমি আশা করছি, অ্যালকোহল মামলায় হাইকোর্ট ডিভিশন আমার জন্য জামিন মঞ্জুর করবে এবং তা শুধুমাত্র হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এরই মধ্যে আমার মুক্তি প্রতিহত করার লক্ষ্যে সরকার হঠাৎ করে বেআইনিভাবে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩নং ধারাবলে আমার বিরুদ্ধে জারি করেছে এক নিবর্তনমূলক আটকাদেশ। এ আইনের ধারায় আমাকে অনির্দিষ্টকাল যাবৎ বিনা বিচারে আটক রাখা যাবে। অথচ আমি আটক রয়েছি জেলখানাতেই  যে ব্যক্তি অলরেডি জেলে আটক রয়েছে আইনের দৃষ্টিতে তার ওপর নিবর্তনমূলক আটকাদেশের কোনো নোটিশ বৈধ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। আমাকে আটকাদেশ দেয়া হচ্ছে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছু থেকে নিবৃত্ত রাখার উদ্দেশ্যে। সেই কোনো কিছুটা কোন জিনিস? আর আমি তো জেলখানাতেই আছি। আমরা এখন বাস করছি এমনই একটা বর্বর সরকার ব্যবস্থার অধীনে।
কিন্তু এ আটাকাদেশের নোটিশ যতটা না ক্ষতিকর, আমার জন্য তা আরো ক্ষতিকর হয়েছে অন্য কয়েকটি কারণে। এর আগে আমার আত্মীয়স্বজন ও আইনজীবীরা প্রতি সাতদিন অন্তর আমার সাথে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছিল।
এখন সে নিয়ম আমূল বদলে ফেলা হয়েছে এবং তা হয়েছে আমার মহা-অসুবিধার কারণ। এখন আমার লোকজন আসতে পারবে প্রতি ১৫ দিনে একবার। শুধু তাই নয়, ওদের পূর্ব অনুমতিপত্র জোগাড় করতে হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। সচিবালয়ের এক কোণায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়, সাধারণ লোকের জন্য সেখানে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য। হাসনা দেশে নেই, আমার স্টাফ শহীদের মাথার ওপর নিত্যনিয়ত ঝুলছে মিলিটারিদের উদ্যত খড়গ। সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য কে এবং কীভাবে এ অনুমতিপত্র জোগাড় করবে?
সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক হলো- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া আমি আমার আইনজীবীর সঙ্গেও দেখা করতে পারবো না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ অনুমতি পাওয়ার জন্য ভিজিটরের ছবিসহ আবেদনপত্র জমা দিতে হবে মন্ত্রণালয়ে এবং সে ছবি আবার প্রথম শ্রেণির একজন সরকারি গেজেটেড অফিসার দ্বারা সত্যায়িত হতে হবে। এটা একটা সাধারণ ব্যাপার যে, বর্তমান নিপীড়নমূলক অবস্থায় চাকরি হারানোর ভয়ে কোনো সরকারি অফিসারই তা সত্যায়িত করে দিতে চাইবেন না। এ অবস্থায় একজন আইনজীবী ছাড়া কীভাবে আমি কোনো কাগজপত্র ছাড়াই সম্পদের বিবরণী, দলিলপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইত্যাদি তৈরি করবো? মোটকথা হলো, আমাকে প্রবল চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে যাতে করে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনোরকম সুযোগ আমি না পাই।
উচ্চ পর্যায়ের আরেকটি খবর এসেছে যে, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হাসপাতালের রোগীদের বেড থেকে শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এ মর্মে একটি বিবৃতি দিয়েছেন যে, তিনি রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণ করেছেন। তিনি আশা করছেন যে, এর ভিত্তিতে সরকার তাকে কারামুক্ত করবেন এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেবেন।

শুক্রবার ৬ জুলাই ২০০৭ দিন ৮৫
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বিচারিক আদালতগুলো এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পুরোপুরিভাবে প্রশাসনের অধঃস্তন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এতে এমন ধারণাও করা যায় যে, আসলে বেসামরিক আইনের মাধ্যমে একধরনের সামরিক আদালত দেশে বিচারের দায়িত্ব নিয়েছে। এযাবৎ যতগুলো মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে সবগুলোতেই দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়েছে- একদিনও কম বা বেশি নয় এবং তা করা হয়েছে আদালতে মিলিটারি কর্তাব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে। অথচ আমি আগেই বলেছি আদতে যারা সত্যি সত্যিই অবৈধ পথে অঢেল অর্থের মালিক হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আনা মামলা ও রায়গুলোও উচ্চ আদালতের মাধ্যমে খারিজ হয়ে যাবে এবং কারাদণ্ড থেকে তারা মুক্তি পেয়ে যাবেন। হাইকোর্টের আপিলে বিভিন্ন অভিযোগে নিম্ন আদালত থেকে সাজাপ্রাপ্ত প্রতিটি রাজনীতিবিদ একদিন ছাড়া পাবেন এবং এর প্রতিফল হিসেবে সত্যিকারের অপরাধীরাও নির্দোষ হিসেবে ধোয়া তুলসী পাতার মতো শুদ্ধ হয়ে বের হয়ে আসবেন কারাগার থেকে।

শনিবার ৭ জুলাই ২০০৭ দিন ৮৬
অনন্যোপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি আমার আইনজীবীর সাথে সাক্ষাৎকার চেয়ে স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছি। আবেদনটি করা হয়েছে জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। প্রথমাবস্থায় জেল কর্তৃপক্ষ তাতে অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত আমার
পীড়াপীড়িতে তারা সেই চিঠি পাঠাতে রাজি হয়েছেন।
সরকার এখন ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। এদের এখন রয়েছে একটি নিজস্ব রাজনীতি, একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা। এই এজেন্ডা হলো দেশের রাজনীতি, রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা। তাদের পরামর্শদাতাদের এমনটা অজানা থাকার কথা নয় যে, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে দেশে সঙ্গত কারণেই উত্থান ঘটবে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের, বেড়ে যাবে গুপ্ত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের প্রবণতা, চারদিকে পরিব্যাপ্ত হবে শার্পটার, স্নাইপার, সুইসাইড স্কোয়াড, গুপ্তহত্যা ও সীমাহীন দুর্নীতির করাল ছায়া। এর ফলে একদিকে উত্থান ঘটবে ধর্মভিত্তিক ইসলামী জঙ্গিবাদের এবং অন্যদিকে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে শুরু হবে আত্মঘাতী সশস্ত্র সংঘাত। এর ফলে সদা হানাহানিতে লিপ্ত, গণতন্ত্রবর্জিত বাংলাদেশ পরিণত হবে এক আশ্রিত রাজ্যে- যেখানে নিজস্ব একটি পতাকা থাকলেও দেশটির থাকবে না কোনো সার্বভৌম স্বাধীনতা।

রবিবার ৮ জুলাই ২০০৭ দিন ৮৭
কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান খুলনায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ সমর্থন না করার জন্য দেশের আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই চেয়ারম্যান আজ প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে তার সঙ্গে একটি বৈঠকে বসেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত অনভিপ্রেত। কমিশন যেসব মামলা দায়ের করছে বা করতে যাচ্ছে সেগুলোর বাদীপক্ষ স্বয়ং কমিশন অথচ এখন চেয়ারম্যান বাদীপক্ষের প্রধান হিসেবে দেখা করছেন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে- সময়ান্তরে যে প্রধান বিচারপতি একদিন এসব মামলার আপিলের জন্য শুনানির আবেদন গ্রহণ করবেন। এতে করে দুর্নীতি দমন কমিশন বা স্বাধীন কোর্ট কোনোটারই স্বাধীনতা বজায় থাকছে না এবং বিচার প্রশাসনের ওপর তা সরাসরি হস্তক্ষেপের সামিল। বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়নি, তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে, বৈঠককালে কমিশন এ মর্মে প্রধান বিচারপতিকে প্রভাবিত করতে চেয়েছেন যাতে করে আদালত আপিলের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করেন। এবং ক্যাঙ্গারু কোর্টে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে যাতে করে আদালত থেকে মুক্তি দেয়া না হয়। এর ফলে জনগণ শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের ঔদ্ধত্যের ব্যাপারেই প্রশ্ন তুলবেন না, কোন অনুজ্ঞায় প্রধান বিচারপতি তাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সে ব্যাপারেও নিঃসন্দেহে প্রশ্ন তোলা হবে। তিনি দেখা করতে অসম্মতি জানালেন না কেন? ঠিক এ কারণেই বার-এর আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতিকে ‘মেজর রুহুল আমিন’ নাম দিয়ে একজন অধঃস্তন প্রধান বিচারপতি নামে ডেকে থাকেন।
দেশের সেই তথাকথিত বিশিষ্ট আইনজীবীরা এখন কোথায়? তারা কি সবাই তাদের দেহ ও আত্মা বিক্রি করে দিয়েছেন?

সোমবার ৯ জুলাই ২০০৭ দিন ৮৮
ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৬১(ক) ধারাবলে আমার অ্যালকোহল বিষয়ক মামলা খারিজের শুনানি গ্রহণের সময় অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও হাইকোর্ট বিভাগ এ বিষয়ক সমস্ত বিচারকার্য তিন মাসের জন্য স্থগিত করে একটি রুল জারি করেছেন। এ পর্যায়ে আমি জামিনের জন্য কোনো আবেদন করিনি, কারণ জামিন পাওয়া সত্ত্বেও নিবর্তনমূলক আটকাদেশের খড়গ মাথার ওপরে থাকায় আমার পক্ষে মুক্তি অর্জন করা সম্ভব হতো না। সবচাইতে বড় ব্যাপার হলো- আমি নিশ্চিত যে, তথাকথিত এসব মামলার নাটকীয়তা খুব বেশিদিন ধরে চলতে থাকবে না। রেডিওতে খবর শোনামাত্র আমি শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহ্র দরবারে মোনাজাত করেছি।
খবরের কাগজে বড় বড় হেডিং-এ দুর্নীতি, স্ক্যান্ডাল ও চরিত্রহনন ছাড়া অন্য কোনো খবরাখবর নেই। অবস্থা দেখলে মনে হবে যে, এছাড়া দেশে আর কোনো সমস্যা নেই।
আজকে কুমিল্লার সাবেক সংসদ সদস্য মুনশীই শুধু নয়, তার স্ত্রী ও দুই ছেলের নামেও চাজশিট দাখিল করা হয়েছে। একইভাবে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদার স্ত্রী সিগমা হুদা এবং সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পুত্র ও কন্যাসহ এমন আরো কয়েকজনের নামে যারা ইতিমধ্যেই জেলখানায় আটক রয়েছেন। অর্থ আত্মসাতের মামলায় স্ত্রীদেরও করা হচ্ছে অভিযুক্ত। ফলে ২-৩ বছরের শিশুদের বাড়িতে রেখে মায়েদের বাস করতে হচ্ছে কারাভ্যন্তরে। এভাবে রাজনীতিবিদদের গৃহকর্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের দুর্নীতির মামলায় অপদস্থ ও কারাবদ্ধ করার দৃষ্টান্ত আগে কখনো দেখা যায়নি।
আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন যে ভূমিকা পালন করছেন নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

(চলবে..)

আরো পড়ুন-
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৯) 
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (১৯)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২১)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২২)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৩)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৪)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৫)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৬)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৭)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৮)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (২৯)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩০)
মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৩১)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর