× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, সোমবার , ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১১ সফর ১৪৪৩ হিঃ

আহনাফ এটা মেনে নিতে পারেনি

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার
১৭ জুলাই ২০২১, শনিবার

তুই তো মোটা। দৌড়াতে পারবি না। ক্লাসের মধ্যে দৌড়ে দেখা। আগে শরীরের ওজন কমা। তারপর খেলার প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতে আসবি। শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষকের এমন আচরণে ক্লাসের বাকি শিক্ষার্থীরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। তখন লজ্জায় মরছিল ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে ইউটিউব টিউটোরিয়াল সহ নানাভাবে ডায়েট কন্ট্রোল করতে গিয়ে অবশেষে মারাই যায় ওই শিক্ষার্থী।
আমাদের চারপাশে অহরহ বডি শেমিংয়ের ঘটনা ঘটছে। খোদ রাজধানীর নামিদামি স্কুলগুলোতে আরও ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই বডি শেমিংয়ের ঘটনা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিছু সংখ্যক শিক্ষকও এতে যোগ দেয়। সম্প্রতি বডি শেমিংয়ের শিকার হয়ে রাজধানীর নামকরা একটি স্কুলের দশম শ্রেণির আজওয়াদ আহনাফ করিমকে প্রাণ দিতে হয়েছে। দুই ভাইবোনের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এই কিশোর ছিল ছোট।
বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। স্বপ্ন ছিল উচ্চ শিক্ষার্থে ছেলেকে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পাঠাবেন। আহনাফের মৃত্যুর ঘটনায় ভেঙে পড়েছে তার পুরো পরিবার। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসায় থাকতেন। কথা হয় আহনাফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। শিক্ষার্থীর বাবা ফজলুল করিম বলেন, আমার ছেলে বনশ্রী শাখার একটি নামকরা স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়তো। ২০২০ সালে তার এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। তখন সে পড়ালেখায় ভালোই ছিল। ওর শরীরের ওজনটা ছোট থেকেই একটু বেশি ছিল। সপ্তম শ্রেণিতে সে যখন পড়ে তখন তার ওজন ছিল ৯৩ কেজি। স্কুলে ওর বন্ধুরা-টিচার এটা নিয়ে অনেক বুলিং করতো। গত বছরের আগস্ট মাসে আমরা প্রথম বিষয়টি জানতে পারি। এ সময় আহনাফ আমাদের বলতো, আমরা যেন স্কুলে শিক্ষকদের কাছে এ বিষয়ে কিছু জানতে না চাই। কারণ, পরবর্তীতে সে হয়তো নানা ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে।
তিনি বলেন, আমার ছেলে একটু চাপা স্বভাবের ছিল। সব কথা আমাদেরকে শেয়ার করতো না। যখন অতিষ্ঠ হয়ে যেত তখন আমাদেরকে বলতো। ওকে নিয়মিত বুলিং করা হতো এটা সে নিতে পারেনি। আমাদেরকেও স্কুল-কলেজে বুলিং করেছে। আমরা সেটা ফেস করেছি। আহনাফ আসলে এটাকে মেনে নিতে পারেনি। একবার সে স্কুলের ফুটবল প্রতিযোগিতায় নাম দিতে যায়। এ সময় শ্রেণি শিক্ষক বললো, ‘তুই কি নাম দিবি। তুই তো মোটা। দৌড়াতে পারবি?’ এ সময় আহনাফ জানায় সে পারবে। তখন শিক্ষক তাকে ডেকে সামনে থাকা টেবিল সরিয়ে বললো, এখানে জোড়ে জোড়ে হাঁট। এ সময় সে হাঁটতে শুরু করলে ক্লাসের সকল বাচ্চারা খুব হাসছিল। পরবর্তীতে সে বাসায় এসে মাকে জানায়, এত লজ্জা লাগছিল তখন মনে হচ্ছিল মরে যাই। বুলিংয়ের শিকার হতে হতে একটি সময় সে ঠিক করলো ওজন কমাবে। এটা গত বছরের জুন-জুলাইয়ের ঘটনা। আমাদের না জানিয়েই শুকনো হওয়ার ডায়েট শুরু করে। গত বছরের ডিসেম্বরে যখন আমাদের চোখে বিষয়টি ধরা পড়ে তখন দেখলাম ওর ওজন ৬০ কেজি। তখন মনে করলাম এটা ঠিক আছে। কিন্তু পরবর্তীতে সে যে এই বিষয়টা খুব ভয়াবহভাবে নিয়মিত করবে- এটা আমরা বুঝতে পারিনি। একটা লম্বা সময় না খেতে খেতে দেখা গেল পুরো বিষয়টি তার আর নিয়ন্ত্রণে নেই। যেটা পরবর্তীতে মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তখন সে চাইলেও খেতে পারেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে ওজন কমে ৩৫ কেজিতে চলে আসে। পরবর্তীতে আহনাফের সর্বনিম্ন ওজন ২৯ কেজি পর্যন্ত হয়। যখন হাড় এবং চামড়া ছাড়া শরীরে কিছুই ছিল না। চিকিৎসক এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন আজওয়াদ আহনাফ ‘অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা’ নামের একটি অসুখে ভুগছিল। অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা খাদ্যসংক্রান্ত একটি অসুখ। এতে রোগী মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। সে ডাক্তারকে জানিয়েছিল কোন এক বেলায় সামান্য বেশি খেলে বাথরুমে গিয়ে বমি করে ফেলতো। কেউ বিষয়টি খেয়াল করিনি।
চিকিৎসকের পরামর্শে ওকে একইসঙ্গে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ডায়েটিশিয়ান, সাইকোলজিস্ট এবং সাইক্রিয়াটিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়। এ সময় চিকিৎসক জানায়, ওর শরীরে প্রকৃতপক্ষে কিছু নেই। শরীরে কোনো ইমিউন পাওয়ার ছিল না। এখন খাওয়া ছাড়া অন্য কোনো ওষুধে কাজ হবে না। শেষ পর্যন্ত আর ওকে ধরে রাখতে পারিনি। যদিও শেষ তিন সপ্তাহে ওজন প্রায় ৫ কেজি বেড়েছিল। হঠাৎ করে গত মাসের ২৫ তারিখ রাতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরদিন রাজধানীর একটি হাসপাতালে হার্টঅ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। আহনাফের বাবা বলেন, বাচ্চাদেরকে স্কুল-কলেজে শেখানো উচিত তাদের শারীরিক যেকোনো সমস্যা থাকতেই পারে। হোক সেটা কালো, মোটা, বেঁটে। এটা নিয়ে উপহাস করা উচিত না। এই মূল্যবোধটা একটি বাচ্চার জন্য শেখা বাধ্যতামূলক। একজন ভালো মানুষ হতে হলে তাকে এটা জানতে হবে। তার আগে একজন শিক্ষককেও এই মূল্যবোধের বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেলের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক মো. রাজিবুর রহমান বলেন, একজন ব্যক্তি যখন তার শরীর নিয়ে দিনের পর দিন বডি শেমিংয়ের শিকার হয় তখন মাথায় যে বিষয়টি কাজ করে সেটা হলো যেকোনো মূল্যে তার শরীর শুকাতে হবে। খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি তার মধ্যে গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করার প্রবণতা  তৈরি হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ইউটিউবসহ নানা মাধ্যমে ডায়েট চার্ট অনুসরণ করে। এতে পুষ্টিহীনতায় রক্তস্বল্পতা, হাড়ের ক্ষতিসহ শারীরিক এবং মানসিক নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ অসুখের প্রধান কারণ ‘বডি শেমিং’ বা শরীর নিয়ে পরিচিতজনদের বুলিং। ফলে ওই ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। মানসিক চাপ থেকে নিজের, পরিবারের এবং অন্যদের প্রতি মানসিকতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। যার শেষ পরিণতি মৃত্যু। ঢাকা মেডিকেলে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং বডি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুস্থ মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে স্কুলগুলোতে একটি কাউন্সেলিং বডি গঠন করা যেতে পারে। যেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের প্রতি মাসে অন্তত একটি বৈঠক হবে। সেটা অনলাইনে হোক অথবা মুখোমুখি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের মনের কথা, কষ্টের বিষয়গুলো নির্ভয়ে শিক্ষকদের সামনে তুলে ধরতে পারে।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর