× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, সোমবার , ৪ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১১ সফর ১৪৪৩ হিঃ

ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্র পাততাড়ি গোটালে ইরানের লাভ কেন?

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক
(১ মাস আগে) জুলাই ২৯, ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১০:০৪ পূর্বাহ্ন
ফাইল ফটো

প্রথমে আফগানিস্তান, এখন ইরাক। চলতি বছরের মধ্যেই ইরাকে মোতায়েন থাকা সকল মার্কিন যুদ্ধ সেনা বা কমব্যাট ট্রুপ্ট প্রত্যাহার করে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার হোয়াইট হাউজে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মুস্তফা আল-কাধিমি’র সঙ্গে এক বৈঠকের প্রাক্বালে এ ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ঘোষণা অনুযায়ী, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরাক কৌশলগত সংলাপ’-এর অংশ হিসেবে ইরাকে যুদ্ধরত মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর থেকে দেশটিতে ইরাকি বাহিনীগুলোকে জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেবল পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করে যাবে মার্কিন সেনাবাহিনী।
বাইডেনের এ ঘোষণা দুটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরাকে লড়াইয়ের পরিস্থিতি কেমন রূপ নেবে এবং এতে করে দেশটিতে আইএস-এর পুনরুত্থান ঘটবে কিনা।
ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী প্রবেশ করে ১৮ বছর আগে। বর্তমানে দেশটিতে নিয়মিত মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা প্রায় ২,৫০০।
প্রবেশের সময় অবশ্য ছিল প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সেনা। এছাড়া, স্পেশাল অপারেশন বাহিনীর কিছু সদস্যও সেখানে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়।
বর্তমানে, ইরাকে মাত্র তিনটি ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি রয়েছে। প্রায়ই তাদের টার্গেট করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানপন্থি মিলিশিয়ারা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে মার্কিন সেনাদের প্রধান কাজ হচ্ছে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও সহযোগিতা করা। কিন্তু সেখানে তাদের অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা চায় মার্কিন সেনারা ইরাক ছেড়ে চলে যাক। বিশেষ করে গত বছর ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ডস-এর কুদস ফোর্সের তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল কাশেম সোলাইমানি ও এক শীর্ষ শিয়া মিলিশিয়া নেতাকে বাগদাদে ড্রোন হামলায় হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরো বেড়েছে ইরানের মধ্যে। অনেক সাধারণ ইরাকিরাও তাদের দেশকে বিদেশি সেনা মুক্ত হিসেবে দেখতে চায়। ওয়াশিংটনের অনেক কর্মকর্তাদেরও এই মনোভাবে সাড়া দিয়ে ইরাক ছাড়তে আপত্তি নেই। তবে ইরাককে ইরানের হাতে তুলে দিয়ে সেখান থেকে সরে আসতে চায় না তারা।
যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো – বাইডেনে ভাষ্যমতে ‘চিরকালীন যুদ্ধ’ — থেকে সরে আসতে চাইছে। এর বদলে দক্ষিণ চীন সাগর ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে মনোযোগ ঘুরাচ্ছে দেশটি। সে সুবাদেই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের গতি বাড়িয়েছে তারা।
ইসলামিক স্টেট ২.০?
ইরাক থেকে মার্কিন যুদ্ধ সেনা প্রত্যাহার ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে, এতে করে সেখানে ইসলামিক স্টেট বা আইএস’র পুনরুত্থান ঘটবে কিনা। এমনটা আগেও ঘটেছে। ২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এরপরও সেখানে অল্পকিছু সেনা রয়ে যায়। এ অবস্থায়, ইরাকের বিষাক্ত রাজনৈতিক সংমিশ্রণ ও পার্শ্ববর্তী সিরিয়ায় তীব্র হতে থাকা গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে অঞ্চলটিতে শক্তিশালী হয়ে উঠে আইএস। দখল করে নেয় মসুলসহ একটি ইউরোপীগয় দেশের সমান ভূখণ্ড। এবারও কী তেমনটা হওয়ার সুযোগ আছে? ইরাক থেকে মার্কিন কম্ব্যাট ট্রুপ সরে গেলে নতুন করে উত্থান ঘটবে আইএস ২.০ এর?
এমনটা ঘটার আশঙ্কা কম। এর পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, ২০১১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আইএসের পুনরুত্থানের পেছনে কাজ করেছিল ইরাকে সুন্নি মুসলিমদের প্রতি তৎকালীন শিয়া সরকারের আচরণ নিয়ে ব্যাপক অসন্তুষ্টি। ২০০৬-২০১৪ পর্যন্ত ইরাক শাসন করা নুরি আল-মালিকি সরকারের আমলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুন্নিদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়। সরকার থেকে অবহেলিত হয়ে অনেকেই আইএসের প্রতি ঝুঁকি পড়েন। বর্তমানে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে আইএস’র পরাজয়ের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন বহুদিন ধরে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। ন্যাটোর সহায়তায় সে প্রশিক্ষণ প্রদান জারি থাকবে।
তৃতীয়ত, আইএস’র কৌশলগত নেতৃত্ব – যতটুকু বাকি আছে – আপাতদৃষ্টিতে এখন আরব ভূখণ্ডের কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার চেয়ে আফ্রিকা ও আফগানিস্তানের অশাসিত অঞ্চলগুলোতে তৎপরতা চালানোয় বেশি ব্যস্ত।
বৃটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য ও থিংক-ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার বেন ব্যারির মতে, বর্তমানে ইরাক সরকার আইএসের পুনরুত্থান ঠেকাতে সক্ষম।
এছাড়া, ২০১৪ সালে আইএস অঞ্চলটিতে সফল অভিযান চালাতে পারার অন্যতম কারণ ছিল ইরাক থেকে পশ্চিমা দেশগুলো দৃষ্টি সরে যাওয়া। পরবর্তীতে ৮০ দেশের জোটকে মিলে পাঁচ বছর ধরে জঙ্গি গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। খরচ হয়েছে শত শত কোটি ডলার। কোনো সরকারই আবার তেমনটা ঘটতে দিতে চায় না। আর তাই, কমব্যাট ট্রুপস প্রত্যাহারের পরও ইরাকে কিছু সংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকতে পারে। পাশাপাশি, আইএস ও অন্যান্য জিহাদি দলগুলো ইরাককে ব্যবহার করবে কিনা সেদিকে নজর রাখবে পশ্চিমা দেশগুলো।
ব্যারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি টের পায় যে, ইরাকে সক্রিয় আইএস দেশটির বাইরে অন্য কোথাও, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ আছে, হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে ওয়াশিংটন একপাক্ষিকভাবেই তাদের উপর হামলা চালাতে পারে। এ ধরনের হামলা চালানোর জন্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত যোগান রয়েছে।
ইরানের দীর্ঘ খেলা
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ইরান। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি সরাতে চাইছে দেশটি। হতে চাইছে এ অঞ্চলে শক্তিশালীদের তালিকায় উপরে উঠে আসতে চাইছে। তবে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোয় এক্ষেত্রে খুব একটা সফলতা পায়নি তেহরান। সেসব ছয়টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী ফিফথ ফ্লিট।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সাদ্দাম হুসেন সরকারের পতন ঘটলে ইরাকের ক্ষমতা বিস্তৃতির পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা দূর হয়ে যায়। তেহরান এরপর থেকে সুযোগ হাতছাড়া করেনি। ইরাকের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোয় শিয়া মিলিশিয়া প্রবেশ করিয়েছে। এমনকি ইরাকের পার্লামেন্টেও প্রভাবশালী ইরানপন্থি সদস্য রয়েছেন।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ দেশটিতে ইরানি সামরিক বাহিনী প্রবেশের দ্বার খুলে দেয়। এর পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী লেবাননে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর শক্তি হয়ে উঠেছে।
ইরান এখানে লম্বা খেলা খেলছে। দেশটির নেতারা আশা করছেন, তারা যদি প্রকাশ্যে ও গোপনে চাপ অব্যাহত রাখে, তাহলে একসময় মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন সামরিক প্রভাবমুক্ত হয়ে যাবে। আর তাই, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোয় প্রায়ই রকেট হামলা চালায় ইরানি শক্তিগুলো। একইসঙ্গে, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে তেহরান। ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হলে, তারা সেটিকে সঠিক পথে অগ্রগতি হিসেবে দেখবে।

(বিবিসি’র নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদক ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনারের লেখা প্রতিবেদন অবলম্বনে)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর