× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠি
ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, বুধবার , ৬ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৩ সফর ১৪৪৩ হিঃ

৯/১১-এর ছায়া!

মত-মতান্তর

ড. মাহফুজ পারভেজ
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, সোমবার
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন

কোনও কোনও ঘটনা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। ইতিহাসের বিরাট পালাবদলের সূচনা ঘটে কোনও একটি ঘটনা দ্বারাই। যেমন, ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকান্ডের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। হত্যাকারী ছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নাগরিক, কিন্তু জাতিতে বসনীয় সার্ব। সে সময় বসনিয়া ছিলো সাম্রাজ্যটির অংশ। ঘটনাটি ঘটে বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে, যার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূচিত হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বহু ঘটনার নজির আছে, যেগুলোর প্রতিক্রিয়া হয়েছে মারাত্মক। এমনকি, যার কারণে উলটপালট হয়ে গেছে পৃথিবীর গতি ও ইতিহাসের ধারা। বহু বছর পরেও সে ঘটনার ছায়া পৃথিবীর মানুষ ও ইতিহাসের ধারাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

৯/১১ নামে পরিচিত কুড়ি বছর আগের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখের ঘটনাটি তেমনই এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত, যা সারা বিশ্বকে এক নতুন নিরাপত্তা কাঠামোতে নিয়ে যায়।
সেদিন আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে বিমান হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। আর তার জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে সূচিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখনও চলছে এবং আহত, নিহত, উদ্বাস্তু হয়েছে নানা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ।

খোদ আমেরিকার ভেতরেও ৯/১১ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু রূপে বিবেচিত। দেশটির প্রশাসন, সমাজ ও নাগরিকবৃন্দের মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী ৯/১১-এর প্রভাব এখনও বহাল। সমাজ ও রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে ৯/১১-এর ছায়া। গবেষণা ও চর্চার পাশাপাশি গোয়েন্দারা আজও ছুটছেন ঘটনার ময়নাতদন্তের কাজে। ৯/১১-এর ২০ বছর পূর্তিতে আমেরিকার এফবিআই তেমনই একটি তদন্তের নথি উপস্থাপন করে। নতুন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের একটি এগ্‌জিকিউটিভ অর্ডারের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয় তদন্তটি।

ঘটনাটির পটভূমি হলো এই যে, ৯/১১ হামলায় নিহতদের আত্মীয়রা একটি চিঠি লিখেছিলেন বাইডেনকে। সেই চিঠি পেয়েই বিশেষ নির্দেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। চিঠিতে নিহতদের নিকট আত্মীয়রা তাঁকে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট যেন নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে নিউ ইয়র্ক শহরের ৯/১১-এর অকুস্থল ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে না আসেন। কেন না, তিনি এখনও পর্যন্ত তদন্তের বিশদ বিবরণ প্রকাশের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পালন করতে পারেননি।

উল্লেখ্য, নিহতদের আত্মীয়রা চিঠিতে ঘটনার সঙ্গে সৌদি যোগের কথাও জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, আমেরিকার সরকার এ ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ করেনি কেন। ফলে এই প্রথম আমেরিকায় ৯/১১ হামলার তদন্তের বিশদভাবে জনসমক্ষে এনেছে ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।

প্রসঙ্গত, বিগত ২০ বছরে এই ঘটনাটি ঘিরে কয়েক হাজার তদন্ত, উপ-তদন্ত, গবেষণা সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে হয়েছে, যার কিছু কিছু প্রকাশ পেলেও অপ্রকাশিত রয়েছে অধিকাংশই। তার মধ্যে একটি তদন্ত রিপোর্ট ৯/১১-এর দুই যুগ পূর্তিতে ১১ সেপ্টেম্বর শনিবার প্রকাশ করেছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা। আর সেই নথি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। কারণ এফবিআই প্রকাশিত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, ৯/১১ হামলায় সৌদি দূতাবাসের এক কর্মী ও এক সৌদি গুপ্তচরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলাকারীদের সাহায্য করেছিল সৌদি দূতাবাস কর্মী এবং ওই গুপ্তচর। তদন্তে প্রকাশ, হামলাকারীদের থাকা, খাওয়া এমনকি নির্বিঘ্নে যাতায়াতেরও ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন এই দু’জন।

বস্তুত যে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন সেদিন আঘাতের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিল, পরবর্তীতে তারা অস্তিত্বহীন হলেও 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' অব্যাহত রয়েছে। পৃথিবীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, বিশেষত আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ নিরাপত্তায় আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। নানা রকম কড়াকড়ি ছাড়াও বিমান উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পূর্বে বিমানবন্দরে পৌঁছানো, সরকারি কার্যালয়ে নিরাপত্তার মজবুত ব্যবস্থা, পথে-ঘাটে বহুবিধ নজরদারি ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'-এর নামে পৃথিবীর বহু দেশে হামলা, পাল্টা-হামলা, যুদ্ধাবস্থা ছাড়াও ঘৃণা আর অবিশ্বাসের বাতাবরণ সমগ্র বিশ্বকে আচ্ছন্ন করেছে। পশ্চিমা জগতে বহু শ্বেতাঙ্গের মনে অভিবাসী-বিরোধী ঘৃণা ও সন্দেহ স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। সমাজ বিভাজিত হয়ে পড়েছে।

শুধু আমেরিকাকেই নয়, সারা বিশ্বকেও নানা দিক দিয়ে সমূলে বদলে দিয়েছে ৯/১১ নামক ঘটনাটি। ভেতরে ও বাইরে এহেন পালাবদলের পটভূমিতে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, কুড়ি বৎসরে প্রথম বার এমন এক ৯/১১ এসেছে, যখন আমেরিকার কোনও সৈন্য আফগানিস্তানে নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সংঘাত, হানাহানি, সামরিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। বরং ৯/১১ ঘটনার পর সংগঠিত প্রবল প্রতিক্রিয়া হ্রাস পেলেও তার ছায়া রয়ে গেছে।

আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ বিবেচনা করা হলে সে সত্য উদ্ভাসিত হয়। কারণ, যে দেশ পুনর্গঠনে শতকোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল ওয়াশিংটন, যার সরকারকে সব রকম সহায়তা দিয়েছিল, নাগরিকদের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক করতে চেয়েছিল, সেদেশে ফলাফল আদৌ কতটুকু পাওয়া গেছে, সেটাই এক বিরাট বিতর্কের বিষয়। কারণ, আমেরিকার সৈন্য প্রস্থানের পরই সবকিছু তাসের ঘরের মতো ধসে গেছে এবং সংঘাতের চাপা আশঙ্কা অঙ্কুরিত হচ্ছে।

আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহারে যেসব রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে, তার মধ্যে অগ্রগণ্য ভারত। আমেরিকার মতোই এসব দেশ নানা গোষ্ঠীকে অর্থ ও উপকরণ দিয়ে প্রভূত সাহায্য করেছে। তাদেরকেও পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হচ্ছে।

ফলে ৯/১১ ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় কে জিতেছে, কে হেরেছে, তা হলফ করে বলা মুশকিল। এমন একটি সমাপ্তি ও ফলাফলহীন এবং প্রায়-অদৃশ্য যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণও এক অসম্ভব বিষয়। তবে কুড়ি বৎসর পরেও ৯/১১-এর উত্তরাধিকারের ছায়া যে বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিরাট প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা বলা নিষ্প্রয়োজন। অতএব, বিগত কুড়ি বছরের যুদ্ধ ও সামরিক পথে হেঁটেও সংঘাতের ঘূর্ণাবাত থেকে উদ্ধার পেতে ব্যর্থ বিশ্বনেতৃত্বকে আলোচনা ও সমঝোতার নতুন রাজনৈতিক কৌশলের পথ অনুসন্ধানে ব্রতী হওয়াই বরং লাভজনক।


ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর