× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠিইতিহাস থেকে
ঢাকা, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, সোমবার , ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিঃ
জীবনের শেষ বেলায় সৈনিক খলিলুর রহমান

আর কবে মিলবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি!

বাংলারজমিন

শাহ্‌ জামাল, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
১৯ অক্টোবর ২০২১, মঙ্গলবার

 জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এখন ভেড়ামারার ভাষা সৈনিক খলিলুর রহমান খলিল। জীবনের শেষ সময় অতিবাহিত করছেন। তার শরীর মোটেও ভালো যাচ্ছে না। রুচি একদম হারিয়ে গেছে। ফলের রস, সুজি আর তরল খাওয়ার দু’একবার খেলেও অধিকাংশ সময় কাটে তার না খেয়ে। শরীর ভেঙে গেছে। বিছানা থেকেও উঠতে পারেন না এখন। বই পড়ার তীব্র নেশা থাকলেও বই পড়ারও আর শক্তি নেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের পুরোধা খলিল স্যারের। যেকোনো সময় মৃত্যু তাকে ডেকে নিয়ে যাবে এমনটাই মনে করেন তার পরিবার। তাদের প্রশ্ন, আর কবে মিলবে ভাষা সৈনিকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। অথচ তার শেষ স্বপ্ন এবং চাওয়া ছিল একটিই ভাষা সৈনিক হিসাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
১৯৫১ সাল। রাষ্ট ভাষা বাংলা চাই, এমন দাবি ক্রমশঃ উঠতে শুরু করেছে। এমন সময়ই ঢাকা জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন খলিলুর রহমান। এরপর থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের মিছিল, মিটিং-এ অংশ নেন তিনি। তৎকালীন সময়ে জগন্নাথ কলেজের একটি ইউনিটের ছাত্রনেতা হিসেবে মিছিল মিটিংয়ের নেতৃত্ব দিতেন। ৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা কার্জন হল থেকে শুরু হওয়া মিছিলে পুলিশ যখন বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল তখন তিনি ছিলেন ওই মিছিলের অগ্রভাগে। পুলিশের গুলিতে ভাষা শহীদরা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়লে তিনিও অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের তাড়া খেয়ে নিরাপদ স্থানে আত্মগোপন করেন। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে যান। পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ খলিলুর রহমান সে সময়ের সহগামী, সতীর্থদের নাম স্মরণে আনতে না পারলেও স্মৃতিপটে ভাসে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির সেই দিনটির কথা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর তিনি নিজেকে দীর্ঘ ৬২ বছর লুকিয়ে রেখেছিলেন। কখনই বলেননি তিনি একজন ভাষা সৈনিক।
২০১৫ সালে প্রথম তাকে নিয়ে জাতীয় দৈনিক মানবজমিন এবং স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর তাকে নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেল, জাতীয় পত্রিকা, সংবাদ সংস্থা এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই দাবি জোরালো হচ্ছিল ভেড়ামারার একমাত্র ভাষা সৈনিক খলিলুর রহমানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির। ভেড়ামারা উপজেলা প্রশাসন তৎকালীন সময়ে উদ্যেগ গ্রহণ করলেও অদৃশ্য কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৮ সালে ভেড়ামারা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শতবর্ষ উৎসব হলে ভাষা সৈনিক খলিলুর রহমান স্যারকে সম্মামনা জানানো হয়। এরপর ভেড়ামারা বণিক সমিতি, প্রসিড একাডেমিসহ স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান স্যারকে ভাষা সৈনিক হিসাবে সম্মাননা জানান। কিন্তু বহু সময় অতিবাহিত হলেও এখনো জোটেনি ভাষা সৈনিকের স্বীকৃতি। মৃত্যুর আগে স্যারের ভাষা সৈনিকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলবে কিনা তাও জানেন না তার পরিবার। খলিল স্যারের একমাত্র পুত্র রুহুল আমিন জানিয়েছেন, বাবা একজন ভাষা সৈনিক হিসাবে নিজেকে গর্বিত মনে হয়। সাংবাদিকরাই বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। এরপর বহু প্রতিষ্ঠান বাবাকে ভাষা সৈনিক হিসাবে সম্মামনা জানিয়েছে। কিন্তু বাবার স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাবাকে নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়। তারপর হারিয়ে যায় সবকিছু। এভাবেই চলছে আজ ৭ বছর। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেনি। বাবার শরীরের যে অবস্থা তাতে, বাবা কি দেখে যেতে পারবে তার রাষ্ট্রীয় সম্মামনা। আর স্বীকৃতি না পেলে একটা কষ্ট নিয়েই দুনিয়া ছাড়তে হবে বাবাকে। ভেড়ামারার কৃতি সন্তান ডা. বাবর আলী’র জ্যেষ্ঠ সন্তান ভাষা সৈনিক খলিলুর রহমান। লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন তিনি। ১৯৯১ সালে ভেড়ামারা বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তিনি এক পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জনক। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা খলিল স্যারের নিঃসঙ্গ জীবন কাটে এখন বিছানায়। তার একমাত্র সঙ্গী এখন বিছানা আর হুইল চেয়ার। তাকে সঙ্গ দেন তার আদরের নানি আব্দুল মোমিন। আর দেখাশুনা আর পরিচর্চা করেন পুত্রবধূ ফাহমিদা খাতুন। পুত্রবধূ ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাবার শারীরিক অবস্থা একদম খারাপ। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু ফলের জুস, সুজি আর তরল খাবার খেতে পারেন। তাও একবেলা খেলে আর খেতে পারেন না। তিনি শুধু দেখে যেতে চান, তার এই দেশ সমাজ মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। এটাই হবে তার জীবনের চরম প্রাপ্তি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর