× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজানস্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীসেরা চিঠিইতিহাস থেকে
ঢাকা, ২২ জানুয়ারি ২০২২, শনিবার , ৮ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩ হিঃ

বিদেশিদের বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রথম পাতা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার
২৯ নভেম্বর ২০২১, সোমবার

বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের দেয়া সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা লুফে নিয়ে বিনিয়োগ করুন। কারণ দেশে একটি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ সমস্ত নীতি-সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন মাথায় রেখে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে দুই দিনব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২১’ উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সৌদি আরবের যোগাযোগমন্ত্রী সালেহ নাসের আল জাসের ও এফবিসিসিআই’র সভাপতি জসিম উদ্দিন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

ইতিমধ্যে ভুটানের সঙ্গে পিটিএ (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি) স্বাক্ষরের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৮টি দেশে পণ্য রপ্তানিতে একতরফা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ৩৬টি দেশের সঙ্গে দ্বৈত-করারোপন পরিহার চুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বাণিজ্য জোটের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ বিভিন্ন জোটের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে অবকাঠামোসহ সকল নীতিগত সহায়তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের ১৫টি দেশের ২ হাজার ৩৩২ জন অংশগ্রহণকারী নিবন্ধন করেছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এতে আমি আনন্দিত। তিনি বলেন- অবকাঠামো, পুঁজিবাজার ও ফাইন্যান্সিয়াল সেবা, তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেক্ট্রনিকস উৎপাদন, চামড়া, স্বয়ংক্রিয় ও হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ, পাট-বস্ত্র এবং ব্লু-ইকোনমি সম্ভাবনাময় এই ১১টি খাতকে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এই সম্মেলনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসব খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। বিশ্বে বাংলাদেশি পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম হবে।

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের মাহেন্দ্রক্ষণে এ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে বিএনপির সময় বাংলাদেশ যেখানে ২৮৬ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছিল, ২০০০-২০০১ অর্থবছরে আওয়ামী লীগের সময়ে তা বেড়ে ৮১৬ মিলিয়ন ডলার হয় বলে অনুষ্ঠানে তথ্য দেন শেখ হাসিনা। আমরা ২০০০-২০০১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করি, যেখানে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে মাত্র ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো।

আওয়ামী লীগই সরকারে এসে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ করি। তাছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলি। তথ্য-প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ ও রপ্তানি উন্নয়নের লক্ষ্যে আইটি-ভিলেজ, হাই টেক-পার্ক গড়ার উদ্যোগ নেই। অথচ আমাদের বাংলাদেশে এক সময় আমরা বিনামূল্যে সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত করার সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু সেই সময় বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। তারা সেই সুযোগটা নেয়নি এবং প্রত্যাখ্যান করেছিল।

আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে পরপর তিন দফা দেশ পরিচালনার সুযোগ পাওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দক্ষ-পরিশ্রমী জনসম্পদ সৃষ্টি, আকর্ষণীয় প্রণোদনার মাধ্যমে উদার বিনিয়োগ-নীতি প্রণয়ন এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজারের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব ‘দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওপর আস্থা বাড়ায় ৬০ শতাংশের বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এখন আসছে পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে।

বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ৩৫টি সংস্থার ১৫৪টি বিনিয়োগ সংস্থার সেবা অনলাইনে প্রদানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে অবকাঠামোসহ সকল সহায়তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।

জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) আকারের তুলনায় দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ কম। এটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে। সে ধারাবাহিকতায় লাভজনক বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরতেই দু’দিনের এ সম্মেলন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আসছে। দেশি বিনিয়োগও বাড়ছে। একইসঙ্গে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও বন্দরসহ বড় বড় বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। অবকাঠামোগত এসব উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশে এখন পুরোপুরি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ রয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিনিয়োগের সফলতা পেতে পারে। ফলে এদেশে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন। তিনি বলেন তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইসিটি, প্লাস্টিক, চামড়াজাতীয় পণ্যসহ বাংলাদেশে কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন হচ্ছে। বাংলাদেশ আগের মতো নেই। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাংলাদেশ। যেখানে বিনিয়োগে সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
সালমান এফ রহমান বলেন, এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, মোবাইল ব্যবহারে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। গত কয়েক বছর ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ বেড়ে ৪১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু গড় আয়ও বেড়ে দুই হাজার ৫৫৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের হিসাবে ছিল ২ হাজার ২২৭ ডলার। দেশের অভ্যন্তরে কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ সব খাত এগিয়ে যাচ্ছে। সবজি উৎপাদনে আমরা বিশ্বে তৃতীয়, চাল উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে রয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বন্দরসহ বহু বড় বড় প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। এসব অবকাঠামো থেকে সাধারণ মানুষ সেবা পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। অবকাঠামোগত এসব উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশে এখন পুরোপুরি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে। এর আগে অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন ভারতীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল, চীনের ভাইস মিনিস্টার ফর কমার্স রেন হংবিন, ওয়ার্ল্ড কোনমিক ফোরামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেরেমি জার্গেন্স, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট আলফানসো গার্সিয়া মোরা এবং প্রেসিডেন্ট কনজিউমার ডিউরেবলস অব কোক হোল্ডিং এএস তুরস্ক এবং সিঙ্গার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. ফাতিহ কেমাল এবিক্লিওগ্লু। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি পাঠ করেন পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় উপ-মন্ত্রী হোন্ডা তারোর বার্তা। অনুষ্ঠানে ‘ডিসকভার লিমিটলেস’ শিরোনামের একটি অডিও-ভিজুয়াল ডকুমেন্টারি প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শীর্ষ সম্মেলনের প্রকাশনার মোড়কও উন্মোচন করেন।

আজ সোমবার প্লেনারি সেশনে রয়েছে ‘ইনভেস্টমেন্ট কমপিটিটিভনেস অ্যান্ড বিজনেস এনভায়রনমেন্ট: রেসিং নিউ হাইস্ট ইন দ্য নিউ নরমাল’ শীর্ষক আলোচনা। দুটি বিজনেস সেশন ইন পেরালালে থাকছে ‘ইকোনমিক জুন: এক্সেডিং অল এক্সপেক্টেশনস, ব্লু ইকোনমি: ডিসকভার দ্য ফিউচার, লেভেরাজিং ফোর্থ-আইআর: নিউজ এভিনিউ ফর ইনোভেটিভ ইনভেস্টমেন্ট, হেলথ অ্যান্ড ফার্মাসিটিক্যালস: অ্যাফর্ডেবল ওয়েলবিং: হেলদি লিভিং ফর অল’ শীর্ষক আলোচনা। এ ছাড়া আজ সমাপনী সেশনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সরাসরি উপস্থিত থাকবেন।

আমাদের যাত্রাপথ কখনো সুগম ছিল না: প্রধানমন্ত্রী
সব বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এই এগিয়ে যাওয়ার গতি যেন আর কেউ রোধ করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। যে গতি নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এ গতি কেউ যেন আর রোধ করতে না পারে। আর অনেক রকম চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ছিল, থাকবে। সেগুলো মাথায় নিয়ে আমাদের চলতে হবে। যতই সমালোচনা হোক বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং করে যাবো। মুজিব জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনকালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অনেক বড় ও বিরল অর্জন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছি বলেই আমরা এটা অর্জন করতে পেরেছি। আমরা ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। তা আমরা বাস্তবায়ন করেছি, আমরা বিভিন্ন কাজ করেছি খুব পরিকল্পিতভাবে। এর ফলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে পেরেছি। গতকাল একাদশ জাতীয় সংসদের পঞ্চদশ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রায় পুরো অংশ জুড়েই ছিল বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সার্বিক প্রেক্ষাপট এবং এক্ষেত্রে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো। সংসদ নেতা বলেন, আমরা উন্নয়নশীল দেশের যে মর্যাদা পেয়েছি এটা বাংলাদেশের জনগণেরই অবদান। আমি দেশবাসীর প্রতি আবারো কৃতজ্ঞতা জানাই, তারা বারবার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাদের দেশ সেবার সুযোগ দিয়েছেন বলেই আমরা দেশের এত উন্নয়ন করতে পেরেছি, এ বিরল অর্জন আমরা দেশের জন্য আনতে পেরেছি। কেবল উন্নয়নশীল দেশ হয়েছে বলে নয়, সর্বক্ষেত্রেই বিশ্বে আজ বাংলাদেশের ভাবমর্ূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। যা বাংলাদেশের জন্য একটা বিরাট অর্জন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাপনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলের উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের। সে সময় সৌদি পরিবহন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার সালেহ নাসের আল জাসেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সংসদ অধিবেশন পরিদর্শনে আসেন এবং অধিবেশন প্রত্যক্ষ করেন। সংসদ নেতার বক্তব্য শেষে স্পিকার সংসদ অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ অধিবেশনে তুলে ধরেন। অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের বিশেষ ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। উল্লেখ্য, সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) ক্যাটাগরি থেকে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশের উত্তরণের ঐতিহাসিক রেজ্যুলেশন গৃহীত হয়েছে। রেজ্যুলেশনটি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে পরবর্তী ধাপে (উন্নয়নশীল দেশে) উত্তরণের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলো। যুক্তরাষ্ট্র সময় ২৪শে নভেম্বর বৃহস্পতিবার রেজ্যুলেশন গৃহীত হয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য এটি সম্ভব হয়েছে। জনগণের সার্বিক উন্নয়নে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়েছি। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীকে এই অর্জন আমাদের জন্য অনেক গৌরবের। এটি বাঙালি জাতির বিরল সম্মান ও অনন্য অর্জন। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছি বলেই আমরা অর্জন করতে পেরেছি। জনগণের জন্য কাজ করতে গিয়ে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সমালোচনায় আমরা কান না দিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছি। সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করি। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, জনগণ প্রতিটি নির্বাচনে বিজয়ী করার কারণে একটানা দেশের জন্য কাজ করতে পেরেছি বলেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছি। এই কাজ আমরা সহজভাবে করতে পেরেছি কিন্তু তা নয়। এই যাত্রাপথ কখনো সুগম ছিল না। আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্বিচারে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, গাড়িতে আগুন, অগ্নিসন্ত্রাস, হরতাল, অবরোধ-সেই অবরোধ বিএনপি এখনো প্রত্যাহার করেনি। সরকার প্রধান বলেন, উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টির জন্য নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এরপরে এই করোনা মহামারিও আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশ্বের অর্থনীতির চাকা যখন স্থবির তখন আমরা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছি। এর ফলাফল দেশের অর্থনীতি গতিশীল রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা। এ জন্য আমরা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা করেছি। এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটা সুন্দর জীবন পাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার সময় পেয়েছিলেন। পাকিস্তানের একটি প্রদেশ ছিল বাংলাদেশ। সেই প্রদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে রূপ দেন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলে মাত্র সাড়ে তিন বছরেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করেছিলেন। এর সুদীর্ঘ বছর পর আমরা এবার বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি আনতে পারলাম। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হতো। জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ বা বেগম জিয়ার কথা বলেন,  তারা তো কেউ দেশকে উন্নত করতে চাননি। ক্ষমতা তাদের কাছে ছিল ভোগের বস্তু ও বিলাসবহুল জীবন। আর তারা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে দলে টেনে একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করলো। সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কেউ এগিয়ে আসেনি। শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার কারণে আমরা অনেক সুবিধা যেমন পাবো, তবে স্বল্পোন্নত  দেশের সব সুযোগগুলো পাবো না। অবশ্য আমরা ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় চেয়ে নিয়েছি করোনাকালের সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য। এই অর্জন সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে ব্রান্ডিং করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তার কন্যা শেখ হাসিনা এসময় আবেগপ্রবণ হয়ে যান। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমার অবর্তমানে আমাকে দলের সভাপতি নির্বাচন করে। আমি জানি এদেশে খুনিরা মুক্ত, যুদ্ধাপরাধীরা মুক্ত এবং তারাই রাজত্ব চালাচ্ছে। যেখানে আমার ছোট ১০ বছরের ভাইকেও (শেখ রাসেল) ছাড়েনি। সেখানে আমিও রেহাই পাবো না। আমারও হয়তো যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেটা জেনেও শুধু দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার নিয়ত নিয়ে আমার ছোট বাচ্চা ১০ বছরের ছেলে জয় এবং আট বছরের মেয়ে তাদের আমার বোনের (শেখ রেহানা) কাছে দিয়ে আমি বাংলার মাটিতে ফিরে এসেছিলাম। একটা লক্ষ্য ও স্বপ্ন নিয়ে সেটা হলো, আমার বাবা এ দেশ স্বাধীন করেছেন, সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন- বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন অধরা রয়ে গেছে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারি সেই লক্ষ্যটা নিয়েই কিন্তু দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বারবার আঘাত এসেছে, কিন্তু জানি না আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আমার দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময় মানবঢাল রচনা করে আমাকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছেন মানুষের সেবা করার। তাই আজকে একটা মর্যাদায় বাংলাদেশকে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, যাদের (দেশের মানুষ) জন্য জাতির পিতা সারাটা জীবন ত্যাগ স্বীকার করলেন, সেই বাঙালি জাতির হাতে তার জীবন দিতে হলো। সবকিছু জেনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পিতার স্বপ্ন পূরণের জন্য আমি দেশে ফিরে আসি। সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি বলেই দেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। সরকারের অগ্রগতির জন্য পরিকল্পিত নীতি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়নকে কৃতিত্ব দিয়ে সরকার প্রধান বলেন, তারা ‘রূপকল্প-২০৪১’ বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করাই এখন মূল লক্ষ্য। ‘২০২০ থেকে ২০২১’ সাল জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী অর্থাৎ মুজিববর্ষ এবং ২০২১ সাল আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। এই সময়ে এই অর্জন আমাদের জন্য অনেক গৌরবের। কারণ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী যখন আমরা উদ্‌যাপন করছি সেই সময় এই যুগান্তকারী অর্জন বাংলাদেশ পায়। বাঙালি জাতির জন্য এটা একটা বিরল সম্মান অর্জন। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির জন্য একটা অনন্য উত্তরণ। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ‘রূপকল্প-২০২১’ এবং এরই আলোকে আমরা যে পরিকল্পনাগুলো পর পর নিয়েছি, সে সময় অনেকে ধারণাই করতে পারেননি বাংলাদেশের এ ধরনের উত্তরণ ঘটতে পারে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। সে সময় অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হলেও আমার বিশ্বাস ছিল তার সরকারের এই পরিকল্পিত প্রচেষ্টার একটা সুফল বাংলাদেশ পাবে। কারণ এই দেশটাকে তিনি চেনেন এবং জানেন যে কারণে সমালোচনায় কান না দিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেই তার সরকার আশু, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছে। ‘মুজিব চিরন্তন’ থিম নিয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানমালায় ৫টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের অংশগ্রহণ এবং রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, সৌদি বাদশাহ এবং ব্রুনাই সুলতান থেকে শুরু করে ১৯৪টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সে অনুষ্ঠানে অভিনন্দন জানিয়ে বিভিন্ন বার্তা এবং ভিডিও বার্তা প্রদানের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যই এ সম্মান আমরা পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাজেই যে যেটাই বলুক আমি মনে করি যত সমালোচনাই করুক বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং আমরা কাজ করে যাবো। তবে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে- বাংলাদেশের এই গতি যেন আর কেউ রোধ করতে না পারে। নানারকম চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র থাকবে এবং সেগুলো মাথায় নিয়েই আমাদের চলতে হবে। আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের যে মর্যাদা পেয়েছি সেটা বাংলাদেশের জনগণেরই অবদান।’ এবারের অধিবেশনে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ২৪ এবং ২৫শে নভেম্বর বিশেষ আলোচনার সুযোগ প্রদানে স্পিকারকে এবং এই বিশেষ আলোচনার শুরুটা রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে হওয়ায় রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকেও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর