× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ১৭ মে ২০২২, মঙ্গলবার , ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৫ শওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

ইসি গঠনে আইন নিয়ে বিশিষ্টজনদের প্রশ্ন

প্রথম পাতা

সিরাজুস সালেকিন
১৯ জানুয়ারি ২০২২, বুধবার

নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগে সরকার যে আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে তা পূর্ণাঙ্গ নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত খসড়া আইনে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে অতীতে যেসব নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে সেগুলো ভালো ফল বয়ে আনেনি। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ হলে সেখানে দলীয় নিয়োগের সম্ভাবনা থেকে যায়। সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তারা এসব প্রশ্ন রাখেন। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব). ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই আইন নির্বাচন কমিশন গঠন আইন হয়নি। এটা হয়েছে অনুসন্ধান কমিটি গঠন আইন।
এখানে কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এই আইনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং পার্লামেন্টের অংশীজনদের অংশগ্রহণ না থাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনুসন্ধান কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত প্রেসিডেন্ট কোনো নিয়োগ দিতে পারেন না। এর সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, এটা সার্চ কমিটির থেকে সংসদে যেতে পারতো। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা কমিটি করে বিরোধীদলীয় নেতাসহ সরকার ও বিরোধীদলীয় সমান সংখ্যক এমপি রাখা যেতে পারে। এই কমিটি আলোচনা করে সেই আলোচনার ফলাফল প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠাতে পারে। তাহলে সাংবিধানিক বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ থাকবে না। ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইনের যে খসড়া করা হয়েছে তা পূর্ণাঙ্গ নয়। এভাবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিলে তা পলিটিক্যাল এপয়েন্টমেন্ট হবে। এখানে সর্বদলীয় এপয়েন্টমেন্টের সুযোগ নেই। সার্চ কমিটি কাদের নিয়োগ দিচ্ছে তা জনগণের জানার সুযোগ থাকছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাইরের দেশগুলোতে গণশুনানি করা হয়ে থাকে। তাই আইন করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। এত দেরিতে এমন আইন করার উদ্যোগও সন্দেহের কারণ হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন করতে হলে অবশ্যই সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করতে হবে। সংবিধানের কোথাও অনুসন্ধান কমিটির কথা বলা নেই। সুতরাং অনুসন্ধান কমিটি করতে হলে অবশ্যই ১১৮ ধারা বিলোপ বা সংশোধন করতে হবে। নাহলে সংবিধান লঙ্ঘন হবে। তিনি বলেন, ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সংলাপ করে এবং অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সবাই এটা অনুসরণ করছে, যা অনিয়ম। কারণ সংবিধানে এভাবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কথা বলা নেই। অনিয়ম যখন নিয়মে পরিণত হয় তখন সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, শামসুল হুদা কমিশন তাদের মেয়াদ শেষে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনের একটি খসড়া দিয়েছিল। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত সরকার কোনো আইন করেনি। এখন জনগণের চাপে হয়তো একটা আইন করছে। এতদিন যা হয়ে এসেছে তা বেআইনি, অসাংবিধানিক। প্রতিটি সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, আওয়ামী লীগ সরকার তাই করছে। সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছি আইন হচ্ছে। কিন্তু এই আইনেই নতুন কমিশন হচ্ছে কিনা তা সরকার পরিষ্কার করে বলেনি। তবে দেরিতে হলেও আইন করার উদ্যোগ নেয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাতারাতি আইন তৈরির নজির আছে। সরকার চাইলে এই আইনেই নতুন কমিশন গঠন হতে পারে। তবে সরকারের উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অযোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগেও এই পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানান ড. আনোয়ার হোসেন। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে সবাই বলছে। এটা সম্ভব হয়েছে সরকারের সদিচ্ছার কারণে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সরকারের রদবদল হয় না। সরকার পরিবর্তন হয় যে জাতীয় নির্বাচনে সেই নির্বাচন কেমন হবে সেদিকে আমরা তাকিয়ে আছি। আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সেটা হবে গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের প্রক্রিয়া ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। বলেন, আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি আমরা অনেক আগে থেকেই জানিয়ে এসেছি। শেষ পর্যন্ত সরকার যে আইনের খসড়া অনুমোদন করলো, তা পুরনো রীতিকেই বহাল রেখেছে। অর্থাৎ সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, তার প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তিনি বলেন, নিষ্ফল এ প্রক্রিয়ার বিষফল পরিণতিও ঘটতে পারে, যেমনিভাবে ঘটেছিল ২০১২ ও ২০১৭ সালে, রকিবউদ্দীন কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশনকে নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে। এমনই সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এই দুই নির্বাচন কমিশন তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের মাধ্যমে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, আমাদের ভোটাধিকার হরণ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন নিয়োগ হলে অংশীজনদের মতামতের প্রতিফলন না ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ তাই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যে পরামর্শ দেবেন, তার বাইরে একচুল পরিমাণ ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টের নেই। অর্থাৎ অতীতের মতো পরবর্তী নির্বাচন কমিশনও গঠিত হবে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ীই। নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনে অতীতের নির্বাচন কমিশনগুলোকে বৈধতা দেয়ার একটি ধারা যুক্ত হচ্ছে। এতে করে যেসব নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে ভোটাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করেন সুজন সম্পাদক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বৈধতার মাধ্যমে অতীতের নির্বাচন কমিশনারদের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের বিধান না রেখে উল্টো তাদের অন্যায় কার্যক্রমকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর