× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ২০ মে ২০২২, শুক্রবার , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৮ শওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

শাবি শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি, প্রতীকী অনশন / আন্দোলনে অনড়

প্রথম পাতা

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
২৫ জানুয়ারি ২০২২, মঙ্গলবার

বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ভিসি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমদ। বাইরের সঙ্গে তার যোগাযোগ সংকোচিত করে দিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই অবস্থায় গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্য বাসায় আটকা পড়া ভিসি ও বাইরে আমরণ অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তাদের ভিসির বাসভবনের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি শিক্ষার্থীরা। এর আগে একইভাবে সিলেটের দুই আওয়ামী লীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ এলাকার দুই কাউন্সিলর ভিসি ও শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলেন। তাদেরকে ভিসির ফটকের সামনে ফিরিয়ে দেয়া হয়। সিলেটের শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিক্ষোভের আন্দোলন গড়িয়েছে ১৩ দিনে। আর আমরণ অনশন চলছে ৬ষ্ট দিন।
শাবির উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংহতি জানিয়ে গতকাল হয়েছে প্রতীকী অনশন। এরপরও কোনো সুরাহা না হওয়া কিংবা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি না মানার কারণে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। গত রোববার বিকাল থেকে ভিসি ভবনের সামনে অবরোধ দেয়া হয়। জরুরি পরিসেবা ছাড়া ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না কিংবা কেউ প্রবেশও করতে পারছেন না। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পরদিন প্রক্টর ড. আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে ভিসি ভবনে যান প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্যরা। এ সময় তাদের হাতে ছিল খাবারের প্যাকেট। প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা জানান, এই খাবার তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও ভিসি, তার পরিবার ও ভবনে আটকা পড়া শিক্ষকদের জন্য এই খাবার নিয়ে এসেছেন। এ সময় প্রক্টোরিয়াল বডিকে আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। তারা উল্টো প্রক্টর ড. আলমগীর কবিরকে প্রশ্ন করেন- ‘এতদিন কোথায় ছিলেন। আমাদের জন্য তো এর আগে কোনোদিন খাবার নিয়ে আসেননি।’ শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্যরা খাবার নিয়ে ফিরে যান। এ সময় প্রক্টর ড. আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভিসি ভবনের ভেতরে ভিসি, তার পরিবার ও অনেক শিক্ষক আটকা পড়েছেন। তারা ভেতর থেকে বাইরে বের হতে পারছেন না। অনেকেই অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তারা পানিও পাচ্ছেন না। এই অবস্থায় ভিসি ও তার লোকজন এবং অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সেই খাবার ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদেরকেও ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।’ তিনি জানান- ‘এটা ঠিক না। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া উচিত হয়নি।’ এর আগে  বেলা ২টায় খাবার নিয়ে যান সিলেট সিটি করপোরেশনের ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইলিয়াছুর রহমান ও ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মখলিছুর রহমান কামরান। কিন্তু সে খাবার ফিরিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও সিসিকের দুই কাউন্সিলরকে উপাচার্যের বাসবভনে খাবার নিয়ে ঢুকতে দেননি তারা, এমনকি দেখাও করতে দেননি ভিসির সঙ্গে। পরে সেই খাবার ক্যাম্পাসের বাইরে গরিব ও পথশিশুদের মাঝে বিলিয়ে দেন কাউন্সিলর ইলিয়াছ ও কামরান। খাবারের মধ্যে ছিল বিরিয়ানি ও পানি। এ বিষয়ে কাউন্সিলর মো. মখলিছুর রহমান কামরান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘আমারা মানবিকতার তাড়নায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও বাসায় আটকা পড়া ভিসির জন্য কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সে খাবার ফিরিয়ে দেন এবং আমাদের ভিসির বাসায় ঢুকতে দেননি। পরে আমরা সেগুলো গরিবদের মধ্যে বিতরণ করি।’ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আটকা পড়া ভিসি বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে এখন দুটি পথ খোঁজা হচ্ছে। আর সময় নেয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষার্থীরা দাবি করেছে, পদত্যাগ ছাড়া ভিসিকে ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দেয়া হবে না। ফলে শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনে থেকে না সরলে তিনি বের হতে পারবেন না। এ কারণে ভিসিকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার জরুরি হয়ে পড়েছে। এ কারণে সন্ধ্যা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে রটে নানা গুজব। আর গুজবের ডালপালার কারণে ক্যাম্পাসে ভীতির সঞ্চার হয়। ভিসিকে উদ্ধারে পুলিশের অ্যকশনেরও আশঙ্কা করেন শিক্ষার্থীরা। এ কারণে গতরাতে ক্যাম্পাসে সতর্ক ছিল শিক্ষার্থীরা। পুলিশের আশঙ্কা অন্য জায়গায়। কারণ- বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ। কোনো তৃতীয় পক্ষ তার বাসভবনেও হামলা চালাতে পারে। এ কারণে সন্ধ্যার পর থেকে পুলিশও ছিল সতর্ক। এর আগের রাতেও পুলিশ একইভাবে সতর্ক ছিল। মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি পর্যায়ের কর্মকর্তারা রাতের বিষয়টি মনিটরিং করেছেন। বিকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে অবস্থা নেয় শিক্ষার্থীরা। পরে তারা ক্যাম্পাসের গোল চত্বর থেকে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে অনশনস্থলে মিলিত হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবি জানায়। এদিকে, অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকাল পর্যন্ত মোট ১৭ জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে রাসেল নামে এক শিক্ষার্থীর অস্ত্রোপচার হয়েছে। অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার অপারেশন করা হয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছে। ১১ জন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ভিসির ফটকের সামনে অনশন করছিল। তাদের সেলাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। দুপুরে প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা অনশনে রয়েছেন তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। চিকিৎসকরা চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে দুপুরে আরও দুইজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে- দুপুরের দিকে কিছুটা সুস্থ বোধ করার কারণে দুই শিক্ষার্থী অনশনস্থলে এসেছেন। এম্বুলেন্সে করে তারা অনশনস্থলে এলে শিক্ষার্থীরা হুইল চেয়ারে করে তাদের অনশনস্থলে নিয়ে আসেন। আওয়ামী লীগের নিন্দা: আন্দোলনকারীদের কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোনো অবস্থাতেই সমর্থন করতে পারে না বলে জানিয়েছেন সিলেট আওয়ামী লীগ নেতা। সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ এমন অমানবিক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আন্দোলনের যৌক্তিক সমাধানের জন্য যখন বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে সেই অবস্থায় এমন অমানবিক কার্যক্রম অশুভ কিছুর ইঙ্গিত বহন করে বলে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মনে করেন। এই ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড হতে বিরত থেকে আন্দোলনের যৌক্তিক সমাধানের জন্য আলোচনার পথে ফিরে আসার জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান এবং সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন।
শিক্ষার্থীদের প্রেস ব্রিফিং: শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল দুপুরে অনশনস্থলের পাশে প্রেস ব্রিফিং করেছে। এ সময় তাদের আন্দোলনের সঙ্গে বাইরের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। উল্টো তারা বলেছেন, ভিসি প্রথম থেকে যে কথা বলে আসছেন; এখন উচ্চ পর্যায় থেকে একই কথা বলা হচ্ছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। পাশাপাশি সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে আলোচনার অপেক্ষায় আছেন, তবে তারা ভাঙবেন না অনশন- এমন কথা জানান। শিক্ষার্থীরা জানায়- ‘আমরা শিক্ষামন্ত্রী বা তার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি। আমাদের বলা হয়েছিল অনশন ভেঙে আলোচনায় বসতে, কিন্তু আমরা অনশন ভাঙবো না। এই অবস্থায় আলোচনা করতে চাই। প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, অনেক পত্রিকায় লেখা হচ্ছে- আমরা ভিসি’র বাসভবনের পানি, গ্যাস ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। আসলে তথ্যটি ঠিক নয়, আমরা শুধু বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। ভিসির বাসভবনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা নাশকতা কিংবা বাড়াবাড়ি নয় বলে শিক্ষার্থীরা জানান।
সিলেটের নাগরিকদের সংহতি প্রকাশ: শাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিকালে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান নেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অনশনরত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত ভিসির অপসারণের পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সিলেটের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ। সংহতি সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম। বাসদ জেলা সদস্য প্রণব জ্যোতি পালের সঞ্চালনায় সংহতি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ব্যারিস্টার মো. আরশ আলী, সিপিবির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য, সাম্যবাদী দলের জেলা সম্পাদক ধীরেন সিংহ, সিপিবি জেলা সভাপতি সৈয়দ ফরহাদ হোসেন, বাসদ (মার্কস্‌বাদী) আহ্বায়ক উজ্জ্বল রায়, বাসদ সমন্বয়ক আবু জাফর, গণতন্ত্রী পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গুলজার আহমদ, ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কস্‌বাদী) সভাপতি সিরাজ আহমেদ, সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক সুশান্ত সিনহা সুমন, ঐক্য ন্যাপ জেলা সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস বাবুল, উদীচী সভাপতি এনায়েত হাসান মানিক, বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী অনিমেষ বিজয় চৌধুরী রাজু, খেলাঘর জেলা সাধারণ সম্পাদক তপন চৌধুরী, জজ কোর্টের আইনজীবী রনেন সরকার রনি,  যুব ইউনিয়ন জেলা সাধারণ সম্পাদক নিরঞ্জন দাস খোকন, জাতীয় যুব ঐক্য জেলা সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান খোকন, চারণ সংগঠক রুবাইয়াত আহমদ, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি দীপংকর সরকার, ছাত্রফ্রন্ট সভাপতি সঞ্জয় শর্মা, ছাত্র কাউন্সিল কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফাহিম আহমদ চৌধুরী।
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর