× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিমত-মতান্তরবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে কলকাতা কথকতাসেরা চিঠিইতিহাস থেকেঅর্থনীতি
ঢাকা, ২০ মে ২০২২, শুক্রবার , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৮ শওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

‘সলঙ্গা দিবস’ এদেশের রাজনীতির সোনালী অতীত

দেশ বিদেশ

সালেক উদ্দিন
২৯ জানুয়ারি ২০২২, শনিবার

২৭শে জানুয়ারি ছিল সলঙ্গা দিবস। ১৯২২ সালের এইদিনে সংঘটিত হয়েছিল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ ঐতিহাসিক সলঙ্গা বিদ্রোহ- সলঙ্গা গণহত্যা। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা হাটে সেদিন বৃটিশ পুলিশের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন প্রায় ১২শত মুক্তিকামী জনতা। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সেই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনামলে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বিচরণ ছিল মাওলানা তর্কবাগীশের। তার নেতৃত্বেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সলঙ্গা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল।
তখন ছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অসহযোগ আন্দোলনের সময়। উপমহাদেশের মাটি থেকে বৃটিশদের তাড়ানোর তাগিদে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এ দেশের জনতা দল-মত নির্বিশেষে এ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
১৯২২ সালের ২৭শে জানুয়ারি।
দিনটি ছিল শুক্রবার। তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার) ব্যবসায়িক জনপদ সলঙ্গায় হাটবার ছিল সেদিন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তরুণ জননেতা মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মীরা সলঙ্গার হাটে বিলেতি পণ্য বেচাকেনা বন্ধের লক্ষ্যে হাটে নেমেছিলেন।
খবর পেয়ে সে সময়ের পাবনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক স্বদেশি আন্দোলনের কর্মীদের দমন করতে সশস্ত্র পুলিশের একটি দল নিয়ে ছুটে আসে। গোহাটিতে বিপ্লবী স্বদেশি কর্মীদের কংগ্রেস কার্যালয় ঘেরাও করে তারা। সেখান থেকে নেতৃত্বদানকারী মাওলানা তর্কবাগীশকে গ্রেপ্তার করে। তাকে মুক্ত করতে জনতার বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ইতিহাস বলে, ৪০ জন সশস্ত্র বৃটিশ পুলিশের মধ্যে একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ পুলিশ ছাড়া ৩৯ জন পুলিশই সেই মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। সংঘটিত হয় এক গণহত্যা। সেই গণহত্যায় প্রায় বারশত জনতা শহীদ হয়েছিলেন। বৃটিশদের হাতে তাদের গণকবর রচিত হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন ৪ হাজারেরও বেশি।
বৃটিশদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার পেছনে সলঙ্গার আন্দোলন একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকার দাবি রাখে। এই আন্দোলন ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘রক্তসিঁড়ি’ হিসেবে পরিচিত।
সলঙ্গা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মাওলানা খন্দকার আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, তিনি ১৯০০ সালের ২৭শে নভেম্বর বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার তারুটিয়া গ্রামে জন্মেছিলেন। ছেলেবেলা থেকে ১৯৮৬ সালের ২০শে আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সারাজীবন তিনি গণমানুষের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের, অকল্যাণের বিরুদ্ধে কল্যাণের রাজনীতি করে গেছেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি দরিদ্র দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেছিলেন। তিনি ১৯৩৩ সালে রাজশাহী চাঁটকৈড়ে নিখিল বঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশি বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন। ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন। ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি যখন ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন সেই সংগঠনের সভাপতি। পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মাওলানা তর্কবাগীশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি প্রাদেশিক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সে বছর ২২শে ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন মাওলানা তর্কবাগীশ। আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৫ সালের ১২ই আগস্ট তিনি প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তব্য রাখেন। তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সলঙ্গা আন্দোলন-সলঙ্গা গণহত্যা এবং এই আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তা মাওলানা তর্কবাগীশের রাজনৈতিক ইতিহাস এত অল্প পরিসরে জানানো সম্ভব নয়। তবে এই ইতিহাসে সে সময়ের রাজনীতির একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে ভারতবর্ষে বীরের জাতি বাঙালির নির্ভীক রাজনৈতিক প্রচারণার কথা। সে সময়ের রানীতিকরা সমাজের বৈষম্য নিরসনের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, দেশের জন্য রাজনীতি করতেন এবং তাদের উপর মানুষ আস্থাশীল ছিল বলেই হয়তো মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সলঙ্গা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘রক্তসিঁড়ি’ রচনা করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিতে পেরেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটানো সম্ভব হয়েছিল।
তারা স্বার্থের রাজনীতি করেননি, জীবনের মায়া করেননি, নিজের জন্যে ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের জন্য। দেশের মানুষের রাজনীতি করেছেন তারা। লক্ষ্য ছিল একটিই-তা হলো মানুষের অধিকার ও কল্যাণ। এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে গিয়ে জীবন বাজি রেখে রাজনীতি করেছেন সেই রাজনীতিকরা। লক্ষ্য কল্যাণকর ও অভিন্ন হয়ায় সফল হয়েছিলেনও তারা। ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে তাদের নাম।
সময় এসেছে আমাদের ঐতিহ্যের সলঙ্গা আন্দোলনের রাজনীতির সঙ্গে এখনকার রাজনীতি ও রাজনীতিকদের একটু মিলিয়ে দেখার এবং আমাদের অবস্থান নির্ণয় করার।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, জীবন সদস্য- বাংলা একাডেমি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক,কলামিষ্ট, জীবন সদস্য বাংলা একাডেমি
অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর