অনলাইন
ট্যারিফ ইস্যুতে বিভক্ত রিপাবলিকান পার্টি, আলোচনার ইঙ্গিত ট্রাম্পের
নিজস্ব প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র
(১৮ ঘন্টা আগে) ৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার, ২:৩২ অপরাহ্ন
সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক ঘোষণার পরপরই গতকাল বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে বড় পতন শুরু হয়, প্রধান সূচকগুলো ২০২২ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থানের দিকে এগোতে থাকে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, এই অস্থিরতা শুধু শুরু মাত্র, শুল্ক কার্যকর থাকলে এবং অন্যান্য দেশ পাল্টা কর আরোপ করলে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল কংগ্রেসের উভয় দলের সদস্যরাই ট্রাম্পের বাণিজ্য কৌশল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা প্রেসিডেন্টের প্রতি তাদের আনুগত্য এবং তার শুল্ক পরিকল্পনার রাজনৈতিক প্রভাব- এই দুইয়ের মধ্যে দোটানায় পড়েছেন।
ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের শুল্কনীতি রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে একটি জটিল অবস্থায় ফেলেছে, কারণ রাজনৈতিকভাবে দুর্বল আইনপ্রণেতাদের শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্তের জন্য আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে মূল্য চোকাতে হবে। তাছাড়া বুধবারের ব্যাপক শুল্ক ঘোষণা কংগ্রেসের দুই কক্ষের রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে, যেখানে হাউস রিপাবলিকানরা প্রধানত প্রেসিডেন্টের পাশেই দাঁড়াচ্ছেন, তবে সিনেটে কিছু আইনপ্রণেতা কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করছেন। বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে পতনের কয়েক ঘণ্টা পর রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর চাক গ্র্যাসলি (আইওয়া) এবং ডেমোক্রেটিক সিনেটর মারিয়া ক্যান্টওয়েল (ডি-ওয়াশিংটন) বৃহস্পতিবার সিনেটে একটি বিল ‘ট্রেড রিভিউ এক্ট-২০২৫’ উত্থাপন করেন, যা প্রেসিডেন্টের শুল্ক প্রস্তাবের ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। এই বিল কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করবে। ‘ওয়ার পাওয়ার এক্টট’-এর আদলে তৈরি এই বিল কংগ্রেসকে ৬০ দিনের মধ্যে শুল্ক পর্যালোচনা এবং অনুমোদন করতে বাধ্য করবে, নাহলে শুল্কগুলো বাতিল হয়ে যাবে। সিনেটর গ্র্যাসলি বলেন, ‘কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন’ এবং নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের জন্য এটি প্রয়োজন।
বেশ কিছু আইনপ্রণেতা নতুন শুল্ক নীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিণতির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, কিছু ডেমোক্র্যাট সতর্ক করে বলেছেন যে, এটি ট্রাম্পের ক্ষমতা আরও একত্রিত করার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতি করার একটি হাতিয়ার হতে পারে। কানেকটিকাটের ডেমোক্রেট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ‘এটা অর্থনৈতিক নীতি নয়, এটা বাণিজ্য নীতি নয়। এটা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থনীতি ধ্বংস করার একটি প্রচেষ্টা’। মারফি স্বীকার করেন যে, ট্রাম্প কয়েক দশক ধরে শুল্কের পক্ষে ছিলেন, তবে তিনি যুক্তি দেন ট্রাম্পের বর্তমান কৌশল তার পূর্ববর্তী সমর্থিত যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বড়। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম শিফ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিকে ‘বেপরোয়া’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা সমন্বয়হীন, খামখেয়ালি এবং এক কথায় ধ্বংসাত্মক। ট্রাম্প আমাদের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছেন, এমনকি বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিকেও বিপদে ফেলতে যাচ্ছেন।’
তবে রিপাবলিকানদের বৃহৎ অংশ এখনো ‘ওয়েট এন্ড সি’ মুডেই আছেন। যেসব রিপাবলিকান ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনর্গঠনের চেষ্টাকে সমর্থন করেছেন, তারা বলছেন, তারা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো না কোনো সমন্বয় বা নমনীয়তার ইঙ্গিতের অপেক্ষায় আছেন। এই মুহূর্তে আমরা সবাই এক ধরনের অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে আছি—দেখছি প্রশাসন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং চূড়ান্ত স্থায়ী নীতি আসলে কেমন দেখাবে, বলেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থিউন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ট্রাম্প যেসব শুল্ক আগের দিন রোজ গার্ডেন থেকে ঘোষণা করেছিলেন, তা সম্ভবত বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্য দক্ষিণ ডাকোটার এই সিনেটর বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার ফলে বাজারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ‘অপ্রত্যাশিত নয়’, তবে দীর্ঘমেয়াদে কিছু খাতের ক্ষতি এড়াতে সতর্ক নজর রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘এটা অপ্রত্যাশিত নয়। বাজারে অবশ্যই প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। এটা বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এবং চূড়ান্ত প্রভাব কী হবে, তা বুঝতে সময় লাগবে।’
কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকানই ট্রাম্পকে কিছুটা সময় দিতে চান এই বিশাল অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব দেখার জন্য। আইওয়ার সিনেটর চাক গ্র্যাসলি বলেন, ‘আমাকে দুই মাস পরে জিজ্ঞেস করুন। আমি বলব, এটা একটা অপেক্ষা করে দেখার ব্যাপার।’ উল্লেখ্য, দক্ষিণ ডাকোটা ও আইওয়া—উভয় কৃষিপ্রধান রাজ্যরই—এখন কানাডা থেকে সার আমদানি করতে বেশি খরচ করতে হবে, এবং তাদের কৃষিপণ্য রপ্তানি করতেও অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। তবুও, শুল্ক নিয়ে গভীর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সিনেটর থিউন, সিনেটর গ্র্যাসলি সহ আরও অনেক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমালোচনা করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সিনেটর জিম জাস্টিস, যিনি নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসাবে দেখেন, তিনি ট্রাম্প ট্যারিফ সমর্থন করে বলেন, বর্তমান বাজারের অস্থিরতা পানি ভর্তি বালতিতে হাত পুশ করার মতো—প্রথমে বিশৃঙ্খল, তবে শেষমেশ শান্ত হয়ে যাবে। তিনি মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় উৎপাদন শুরু করার দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে অনেক বেশি।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির পূর্বাভাস দিয়েছেন। লরেন্স সামার্স, সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক, অনুমান করেছেন যে, এই শুল্কগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি করতে পারে, পরিবার প্রতি তিন লাখ ডলার। ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, এই শুল্কগুলো বছরে তিন হাজার ৮০০ ডলার অতিরিক্ত খরচ তৈরি করতে পারে, যা আমেরিকান গৃহস্থালির জন্য আরেকটি মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির কারণ হবে এবং এটি এই বছর চার শতাংশের উপরে বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে, ন্যাশনাল রিভিউতে গতকাল প্রকাশিত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের অর্থনৈতিক পলিসি বিভাগের পরিচালক মাইকেল স্ট্রেইনের এক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, যদি কার্যকর করা হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গতকালের ঘোষিত শুল্ক হবে ১৯৬৮ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য আরোপিত করের পর সবচেয়ে বড় কর বৃদ্ধি। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই শুল্ক—যা আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত কর—বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি'র প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে তিনি প্রশ্ন তুলেন, প্রেসিডেন্টের এককভাবে বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার কর বৃদ্ধি করার চেষ্টা আমাদের সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার ওপর একটি আগ্রাসী ও গুরুতর আঘাত। সংবিধান অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়। অর্থনীতিবিদ মাইকেল স্ট্রেইন আরও বলেন, আমি একজন অর্থনীতিবিদ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। আমি জানি না ট্রাম্প আইনের দৃষ্টিতে সংবিধান লঙ্ঘন করছেন কিনা। তবে একজন মার্কিন নাগরিক হিসেবে আমি জানি, তিনি সংবিধানের মূল চেতনাকে লঙ্ঘন করছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের এত বিশাল পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের প্রচেষ্টা স্পষ্ট ও চরম ক্ষমতার অপব্যবহার।
তীব্র বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেও গতকাল প্রেসিডেন্ট নিজে ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। বরং, তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেন। ফ্লোরিডায় একটি গলফ টুর্নামেন্ট ও মার-এ -লাগোতে সপ্তাহান্তের ছুটিতে যাওয়ার পথে ট্রাম্প তার পরিকল্পনার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন, যা তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে তার বাণিজ্য টিমের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করেন। ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টাদের বার্তা ছিল—সব মার্কিন বাণিজ্য অংশীদারের ওপর, মিত্র হোক বা প্রতিপক্ষ, কঠোর শুল্ক প্রয়োগের ব্যাপারে তারা দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৃহস্পতিবার সিএনএন-এর পামেলা ব্রাউনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বাণিজ্য মন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক বলেছেন যে, ‘প্রেসিডেন্ট পিছু হটবেন না’। কিন্তু, গতকাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আলোচনার জন্য তিনি প্রস্তুত — যদি আলোচনার শর্তগুলো যথেষ্ট ভালো হয়। এয়ারফোর্স ওয়ানে গতকাল ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রত্যেক দেশই আমাদের ফোন করেছে। এটাই আমাদের কাজের সৌন্দর্য — আমরা নিজেকে চালকের আসনে বসিয়েছি। যদি আমরা এসব দেশকে অনুগ্রহ করতে বলতাম, তারা না বলত। এখন তারা আমাদের জন্য যেকোনো কিছু করতে রাজি।’ এয়ারফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প যখন সাংবাদিকদের এ কথাগুলো বলছিলেন তখন বাণিজ্যমত্রী লুটনিক তার পেছনেই ছিলেন।
এভাবে ট্রাম্প এবং তার সরকার অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাসের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। তারা বলছেন, ওয়াল স্ট্রিটে কয়েক দিনের দরপতন বা আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য দাম বেড়ে যাওয়াও মেনে নেওয়া যায় — যদি এর বিনিময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস এবং আমেরিকান উৎপাদনশীলতার পুনর্জাগরণের মতো ট্রাম্পের বড় লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়। বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেন যে, ঘোষিত ট্যারিফ শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্রের উপকারে আসবে, কারণ এটি বাণিজ্য অংশীদারদের আমেরিকান শিল্পের পক্ষে আরও সুবিধাজনক চুক্তি পুনঃআলোচনা করতে বাধ্য করবে। তিনি মনে করেন যে বেশিরভাগ দেশ তাদের বাণিজ্য নীতি পুনর্বিবেচনা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে তাদের বাণিজ্য আক্রমণ বন্ধ করবে।