ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার, ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ শাওয়াল ১৪৪৬ হিঃ

প্রথম পাতা

সাকিবের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মা

স্টাফ রিপোর্টার
৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবারmzamin

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল রাজধানী উত্তরার স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। ১৯শে জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর আন্দোলনকারীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ মিছিল নিয়ে রাজপথে নামে তানজিল ইসলাম সাকিব ও তার সহপাঠীরা। সাকিব স্বামীহারা তাসলিমা বেগমের একমাত্র ছেলে। উত্তরা ইউনিভার্সিটির ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজির ছাত্র। অভাব অনটনে সংসারে সাকিবই মায়ের একমাত্র ভরসা। লেখাপড়া শেষ করে দেশের বাইরে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল সাকিবের। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে সাকিবের পরিবারের। চিকিৎসা খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। সাকিবের পিঠে ও হাতে এখনো কোপের দগদগে ক্ষতচিহ্ন। তার ডান হাতের কনুইয়ের হাড় ভেঙে গেছে। কোপের আঘাতে ফুসফুসেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার। উন্নত চিকিৎসা পেলে সে হয়তো আবারো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। এমনটাই প্রত্যাশা তার মা ও স্বজনদের।

সাকিবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতাকে বিস্কুট-খাবার পানি দেয়ার জন্য ফান্ড সংগ্রহ করে সে। খাবার বিলি করার পর কিছু টাকা বেঁচে যায়। ১৯শে জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পরে বাসায় আসে সাকিব। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে ছাত্র-জনতাকে সহায়তার জন্য উত্তরা বিএনএস’র সামনে আসে সাকিব ও বন্ধুরা। একপর্যায়ে মিছিল বের করে তারা। ছাত্রদের মিছিলে আক্রমণ করে  আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকেরা। র‍্যাব ও পুলিশ সদস্যরা ছিলেন মাঝখানে। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, গুলি, ইটপাটকেল, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ চলতে থাকে ছাত্রদের লক্ষ্য করে। টিকতে না পেরে উত্তরা হাইস্কুলের পাশের গলিতে একটা বিল্ডিং-এর নিচে আশ্রয় নেয় সাকিব ও আন্দোলনকারীরা। সাকিব পানি চাইলে বিল্ডিং-এর ৩ তলা থেকে বোতলে করে পানি দেয়া হয় তাকে। সবাই মিলে পানি খাওয়ার সময় সাকিবদের দিকে দৌড়ে আসে কয়েকজন। সাহায্যের জন্য পানির বোতল হাতে এগিয়ে যায় সাকিব। কিন্তু হাতের নাগালে আসা মাত্রই রামদা দিয়ে কোপ দেয় সাকিবকে। এতে ডান হাতের কনুইয়ের হাড় ভেঙে মাংস ঝুলে পড়ে তার। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সাকিব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। আবার কোপ দেয়া হয় সাকিবকে লক্ষ্য করে। এবার তার মাজার পাশে কেটে গিয়ে কিডনিতে লাগে আঘাত। সাহায্য দিতে যেয়ে তৎক্ষণাৎ এই আক্রমণে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। একপর্যায়ে আক্রমণকারী বলে উঠে ‘যদি বাঁচতে চাস দৌড় দে। আপার নির্দেশ যেভাবেই হোক এই এলাকা আমাদের দখলে নিতে হবে।’

কিছুটা হুশ ফিরলে দৌড় দেয় সাকিব। অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে শান্ত মরিয়ম এবং বিজিএমইএ’র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় মনসুর আলী হাসপাতালে নেয় হয় তাকে। কিন্তু আঘাতের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তাকে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেয়ার পরামর্শ দেয় সেখানের দায়িত্বরতরা। কিন্তু ওইদিন গাজীপুরের সাবেক মেয়রের পিএস’র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ বেশ আক্রমণাত্মক ভূমিকায় ছিল। সাকিবকে কোনোভাবেই বাংলাদেশ মেডিকেলে নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। উপায়ন্তর না পেয়ে সাকিবকে শিন-শিন জাপান হাসপাতালে নেয়া হয়।

সাকিবের মামা মানবজামিনকে বলেন, হাসপাতালে নেয়ার পরে সাকিবকে দেখে দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করে সেখানকার ডাক্তাররা। অঝোরে রক্ত পড়তে থাকা সাকিব মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকে। ‘এ’ নেগেটিভ রক্ত হওয়ায় রক্তের অভাবে তখনো চিকিৎসা শুরু করতে পারেনি ডাক্তররা। একপর্যায়ে প্লাজমা সল্ট দিয়েই অপারেশন শুরুর  চেষ্টা করা হয়। রাত্র ৯টার দিকে স্থানীয় এক ডাক্তারের শরীর থেকে রক্ত দিয়ে শুরু হয় সাকিবের সার্জারির অপারেশন।

টানা পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর কিছুটা সুস্থ হলে বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় আহত সাকিবকে দেখে ফেলে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য। এতে আবারো বিপাকে পড়ে যায় সে। ২৬শে জুলাই সাকিবকে ধরতে এসে ভুলে পাশের বাসায় যেয়ে সেখানেও আহত এক শিক্ষার্থীকে সাকিব ভেবে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পুলিশ। 

সাকিবের মা তাছলিমা বেগম মানবজমিনকে বলেন, আমার ৪ সন্তানের মধ্যে সাকিব একমাত্র ছেলে। তার বাবা কোভিড-এ আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালে মারা যায়। আত্মীয়স্বজনদের সহায়তায় কোনো মতে চলতো তাদের সংসার। তবে ছেলের আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবর শুনে তার আত্মীয়স্বজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ হতে ছেলের চিকিৎসার কিছু খরচ  দেয় হয়েছে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রথম ধাপের টাকা পেয়েছি। দ্বিতীয় ধাপের টাকার জন্য মার্চের শুরুতে আবেদন করলেও এখনো পাই নাই। অনেকে দ্বিতীয় ধাপের পাশাপাশি সরকারের স্ব্যাস্থ্য কার্ড পেলেও সাকিব এখনো কিছুই পায় নাই। সাকিবের মা দ্রুত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় ধাপের টাকা দেয়াসহ সরকারের স্ব্যাস্থ্য কার্ডের জন্য দাবি জানান।

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status