প্রথম পাতা
জন ড্যানিলোভিজের চোখে হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতি
২৮ মার্চ ২০২৫, শুক্রবার
প্রায় ১০ বছর পর ২০২৫ সালের ১লা মার্চ বাংলাদেশে গিয়েছিলাম আমি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানার পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম না- যখন বিমান থেকে বাংলাদেশে অবতরণ করবো, তখন নতুন মেট্রো এবং টোলওয়ালা উঁচু রাস্তাগুলো আদৌ দেখতে পাবো কিনা। দুই সপ্তাহ অনেক সভা, ইফতার, মিডিয়ায় উপস্থিতি এবং ঢাকার যন্ত্রণাদায়ক ট্রাফিক জ্যামে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়ার পর, আমি এই দেশ এবং এর অন্তর্র্বর্তী নেতৃত্বের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ধারণা পেয়েছি। কারণ তারা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎখাতকারী জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এক ছাত্রনেতা বলেছেন, বিপ্লবের প্রথম দিকের দিনগুলোতে আমি ঢাকায় আসিনি এটা দুর্ভাগ্যজনক। এখন সাত মাসেরও বেশি সময় পরে ওই ছাত্রনেতা ও তার সহযোদ্ধারা- যারা অনেকেই এই আন্দোলনকে ‘মুনসুন রেভ্যুলুশন’ হিসেবে অভিহিত করেন, তারা একটি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যেখানে পরিবর্তন হবে আরও বেগবান ও সহযোগিতামূলক। এটা রাস্তার প্রতিবাদের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত।
যারা ‘বাংলাদেশ ২.০’-এর স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা কমবেশি স্বীকার করেছেন যে, অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সংস্কার প্রক্রিয়া পরিমিত ফল দেবে। যদিও শিক্ষার্থীরা নিরাশ হতে রাজি নন। তারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে, থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করতে এবং অন্য সংস্কার কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের কেউ কেউ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তারা উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, হাসিনার শাসনের পতন ঘটাতে ছাত্ররা যে আবেগ প্রদর্শন করেছিল, তা পুনরুত্থান ঘটতে পারে এবং তা অন্ধকার মোড় নিতে পারে। বাড়তে পারে অসহিষ্ণুতা এবং তা একটি জাতীয় পুনর্মিলনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যরা যুক্তি দেখান যে, পরবর্তী সরকারের পক্ষে ছাত্রদের তুচ্ছ বিবেচনা করা বা বিরোধিতা করা সবচেয়ে খারাপ হতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার- বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ বিদায় নেবে না, বরং অব্যাহতভাবে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
অনেকের কাছে যা স্পষ্ট তা হলো যে, শেখ হাসিনার টানা ক্ষমতার মেয়াদে ধারাবাহিকভাবে বিরোধী দলে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সম্ভবত তারা পরবর্তী সরকার গঠন করবে। দলটিকে বিশ্বাস করা যায় কিনা তা নিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যেই নানা বিতর্ক আছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ‘ঐকমত্য কমিশনে’ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিএনপি প্রকাশ্যে সংস্কারের প্রতি তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়েও রয়েছে ধূম্রজাল। সংস্কার এজেন্ডা সমর্থন করলেও তারেক রহমান ১৭ বছর ধরে দেশের বাইরে রয়েছেন এবং অনেকেই নিশ্চিত নন যে, তিনি তার প্রতিশ্রুতি কতোটা রক্ষা করবেন।
এদিকে, অন্তর্র্বর্তী সরকারের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থকরাও এর দুর্বলতা স্বীকার করেন- বিশেষ করে হাসিনার অধীনে ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যকর সংস্কারে সরকারের অক্ষমতার কারণে। ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের বেশির ভাগের আপেক্ষিক অনভিজ্ঞতার সঙ্গে সিনিয়র পদে অনেকের নিয়োগ বা বরখাস্ত হওয়ার কারণে এই কাজটি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ ও প্রশাসনের দুর্বলতা মোকাবিলায় অন্তর্র্বর্তী সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তাদের যেন অপ্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো রকম সমর্থন না করে। কিন্তু প্রতিদিনের উদ্বেগ দূর করতে গিয়ে যদি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সুযোগ হারাতে হয়- তাহলে এই অন্তর্র্বর্তী সরকারের সংস্কারের প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হবে। হাসিনা শাসনের পতন পরপর তিনটি নির্বাচন করার সিদ্ধান্তের মধ্যে নিহিত ছিল। ওই নির্বাচনগুলোকে দেশের ভেতর থেকে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না বলে মত দিয়েছেন।
ড. ইউনূস গণতান্ত্রিক সংস্কার অর্জন এবং দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন সংঘটিত করার দিকে মনোনিবেশ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তার লক্ষ্য পরবর্তী সরকার যেন প্রতিকূলতার মধ্যে না পড়ে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হচ্ছে হাসিনা ও তার প্রধান সাঙ্গপাঙ্গদের আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেয়া হবে কিনা। হাসিনার আওয়ামী লীগ দলের নেতারা তাদের কৃতকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। উল্টো তারা অন্তর্র্বর্তী সরকারকে দুর্বল করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অন্তর্র্বর্তী সরকারের সক্ষমতা সম্পর্কে নাগরিকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা জানতে চান, পুলিশ ও প্রশাসন নির্বাচন ব্যাহত করার যেকোনো সম্ভাব্য প্রচেষ্টা মোকাবিলা করতে পারবে কিনা। অধিকাংশই মনে করছেন, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমি স্বীকার করছি যে, হাসিনা ঢাকা থেকে পালানোর পর প্রথমদিকে কিছুটা অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিলাম। বিশ্বাস করেছিলাম যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। তবে আমি এই উপলব্ধি নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছি- সংস্কারের ফলাফল অনেক বেশি পরিমিত হবে। তবে আমি আশা ছাড়তে রাজি নই। কারণ আমি মনে করি, হাসিনার শাসনামল থেকে শিক্ষা নেয়া পাঠগুলো মানুষ ভুলে যাবে না।
(লেখক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ফরেন সার্ভিস অফিসার। দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। কূটনৈতিক কর্মজীবনে তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কার্যভার গ্রহণ করেন। তার এ লেখাটি বেনার নিউজ থেকে অনুবাদ)
পাঠকের মতামত
যেই সরকারে বসবেন তাকে থাকতে হবে নিরপেক্ষ। যেটা ৭১ পরের সরকার গুলোতে কি ছিলো তাদের কেই উত্তর দিতে হবে। পাবলিক কখনো বলে আসে না। কত নম্বর সিগনাল ?? সামাল দিতে পারবেন ত।
এই পৃথিবীতে ফেরাউন অধিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ক্ষমতার কারণে তিনি নিজেকে খোদা দাবি করেন।