শেষের পাতা
বৈঠকের অপেক্ষা
নৈশভোজে পাশাপাশি ইউনূস-মোদি
মিজানুর রহমান
৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবারবৈঠক চেয়ে ঢাকার পাঠানো চিঠির জবাব এখনো আসেনি। ভারতীয় মিডিয়ায় ইউনূস-মোদি বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বিদ্যমান। থাইল্যান্ড রওনা হওয়ার আগে মোদি তার সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাংককে বেশ কিছু মিটিংয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তাতে ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের কোনো উল্লেখ নেই। সেগুনবাগিচায়ও লিখিত কোনো কনফার্মেশন নেই। তবে মানবজমিন এটা নিশ্চিত হয়েছে যে, নয়াদিল্লির তরফে ঈদের আগেই ঢাকাকে (মৌখিকভাবে) বলা হয়েছে- ব্যাংককে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে কোনো আপত্তি নেই বরং তিনি তার কর্মব্যস্ততার মধ্যে সুযোগ খুঁজছেন অল্প সময়ের জন্য হলেও বসার।
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কাঙ্ক্ষিত সেই বৈঠক হবে শুক্রবার ব্যাংককের স্থানীয় সময় দুপুরে। ততক্ষণে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের পর্দা নেমে যাবে। প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী ঢাকার একজন কর্মকর্তা রাতে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বলেন, সব তো খোলাসা হতে চলেছে। ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের নৈশভোজে এক টেবিলে বসেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এখন বাকি কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনা। সেটা হবে শুক্রবার। ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে এবং শেখ হাসিনার পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। ৮ই আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস বাংলাদেশের আপৎকালীন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য স্বস্তিকর নয় এমন নানা ঘটনা ঘটেছে। ইউনূস সরকারের সমালোচনায় মুখর ভারতীয় মেইন স্ট্রিম মিডিয়া। নেতিবাচক এই প্রচারণাকে বহুবার প্রত্যাখ্যান করেছে ঢাকা। এই অবস্থায় বৃহস্পতিবার প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পাশাপাশি বসলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান। এর আগে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দুই সরকার প্রধান যোগ দিলেও শিডিউল জটিলতায় তাদের সাক্ষাৎ বা পাশাপাশি বসার সুযোগ হয়নি। ঢাকা ও নয়াদিল্লি কূটনৈতিক সূত্র রাতে মানবজমিনকে এটা নিশ্চিত করেছে যে, কেবল ডিনারের টেবিলে একসঙ্গে বসা নয়, আজ ব্যাংককের স্থানীয় সময় মধ্যাহ্নে (শীর্ষ সম্মেলন শেষে) অল্প সময়ের জন্য আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসছেন ইউনূস-মোদি। তবে সেই বৈঠক উভয় দেশের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে অর্থাৎ অ্যাক্রস দ্য টেবিল নাকি সোফাসেট ফর্মেটে (কেবলমাত্র দুই সরকারপ্রধানের মধ্যে) হবে তা রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত খোলাসা হয়নি। স্মরণ করা যায়, ঠিক ১০ বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বাংলাদেশ সফরে একটি বৈঠক হবে কিনা- এমন প্রশ্ন উঠেছিল। কারণ সেই বৈঠক নিয়ে যতটা না অনিশ্চয়তা ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল নেতিবাচক মিডিয়া ক্যাম্পেইন। যাতে শামিল ছিল বাংলাদেশের কিছু মিডিয়াও। ২০১৫ সালের ৬ই জুন। জীবনের প্রথম ঢাকা সফরে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১০ দিন আগে অর্থাৎ ২৬শে মে ’১৫ ঢাকা এবং নয়াদিল্লি অভিন্ন বার্তায় মোদির প্রথম বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদের বিরোধী নেতার সঙ্গে মোদির বৈঠকের বিষয়টি তখন নিশ্চিত। অস্পষ্টতা ছিল সংসদের বাইরে থাকা দেশের প্রকৃত বিরোধী শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী ২০ দলীয় জোটের সর্বোচ্চ নেতা ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক হবে কিনা? ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা ভোটে শেখ হাসিনার প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ সমর্থন এবং সহায়তার জন্য ভারতের প্রতি বিরক্ত ছিল বিএনপি, জামায়াতসহ নির্বাচনবর্জনকারী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। উল্টোদিকে একতরফা ভোট আয়োজনে বিরোধিতায় নিজেদের আহূত হরতাল চলাকালে (২০১৩ সালে) ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিলে বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি রুষ্ট ছিল ভারত। যার রেশ ধরে মোদি-খালেদা সাক্ষাৎ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা তো নয়ই বরং প্রতিবাদ হিসেবে এটি হবে না মর্মে খবর প্রচার করে ভারতীয় মিডিয়া।
কিন্তু না, মোদির সফরের শেষদিন অর্থাৎ ৭ই জুন’ ২০১৫ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠক হয়। শুধু তাই নয়, বিএনপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে মি.মোদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ একান্তে বৈঠক করেন। কূটনীতিতে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠকের গুরুত্ব অনেক। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ বাতিল নিয়ে তখন এতোটাই জলঘোলা হয়েছিল যে মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর ভারতীয় মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়েছিলো খালেদা জিয়াকে। ভারতের দ্য সানডে গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বেগম খালেদা জিয়া সেদিন বলেছিলেন- ’১৩ সালে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎটি আমি বাতিল করেছিলাম। কারণ, আমার জীবনের প্রতি হুমকি ছিল। আমার যদি কিছু হয়ে যেতো (সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার পথে), তাহলে সেজন্য জামায়াতকে দোষী করার পরিকল্পনা ছিল আমাদের প্রতিপক্ষের।’ ৭ই জুন সোনারগাঁও হোটেলে মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় খালেদা জিয়ার। এর কয়েক ঘণ্টা পর গুলশান কার্যালয়ে সানডে গার্ডিয়ান-এর সাংবাদিক সৌরভ সান্যালের সঙ্গে কথা বলে বেগম খালেদা জিয়া। মোদির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সেই বৈঠকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছিলো। আগস্টে বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বিনিময়ের আশা করছেন পেশাদাররা। তাদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কে উত্থান-পতন হয়। বাংলাদেশ-ভারত কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, দুই ভূখণ্ডের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা যুগ যুগ ধরে। এই সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। রাজনৈতিক বক্তৃতা বিবৃতি আর কূটনীতি এক নয়। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ওই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ইউনূস ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিশ্বের অন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের মতোই অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাছাড়া গত ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষেও মোদি শুভেচ্ছা জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূসকে চিঠি পাঠান।
পাঠকের মতামত
বৃহস্পতিবার প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পাশাপাশি বসলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান।----ওহ্ পাশে বসতে পারাটা যে কি সুখে কি তৃপ্তির সেটা বলে বুঝানো যাবে না!