শেষের পাতা
কেনাকাটা রেমিট্যান্সে চাঙ্গা অর্থনীতি
স্টাফ রিপোর্টার
৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার
পবিত্র ঈদুল ফিতর মানেই উৎসব। আর এই উপলক্ষে বিশাল প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। দান-সদকা থেকে শুরু করে কেনাকাটা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়। পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঈদের আগে মার্চের প্রথম ২৬ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ২.৯৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি।
জানা গেছে, ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা এখন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। ধনী-দরিদ্র সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদের কেনাকাটা করেন। পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল, প্রসাধনী, জুয়েলারি ও খাদ্যসহ নানাবিধ পণ্যই বেশি বেচা-কেনা হয়েছে। এরমধ্যে দেশীয় পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে ঈদের অর্থনীতিতে কিছুটা মন্দাভাব থাকলেও এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর অন্যরকম কেটেছে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে। কারণ পতিত আওয়ামী লীগের ক্ষমতা হারানোর পর প্রথম ঈদ। তাই নানামুখী সংকটের মধ্যেও ঈদের খুশিতে ভাসছে দেশ। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও শেষ মুহূর্তে বাজার স্থিতিশীল হয়েছে। সবমিলিয়ে এবার ১ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে, গতবারের চেয়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কম।
দোকান মালিক সমিতির তথ্য মতে, বিগত ঈদের সময় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার বিদেশি পোশাক আমদানি হলেও এ বছর ৭৫ শতাংশ কমে আমদানি হয়েছে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার। ফলে দেশি পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। যা পোশাকের খুচরা বিক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যবসা হয়। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ঈদ কেন্দ্রিক ব্যবসা হয় ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছর আগে ২০১৫ সালে ঈদ কেন্দ্রিক ব্যবসা ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার মতো।
দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঈদে অতিথি আপ্যায়নে রান্নার মসলা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়ে প্রায় ২৭ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ঈদুল ফিতরের আগে পরিচালিত ব্যবসার পরিমাণ ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বিগত বছরগুলোতে ২ লাখ কোটি টাকার মতো হলেও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমেছে। পাদুকা খাতে শীর্ষস্থানে স্থানে রয়েছে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার ও বাটার মতো কোম্পানি। ঈদের সময় আসবাবপত্র বিক্রি বৃদ্ধি পায় ২৫ শতাংশ। ঈদের আগে সৌন্দর্য ও প্রসাধনীর দোকানগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়। রাজধানী শহর জুড়ে বিভিন্ন দোকান এবং ব্র্যান্ডেড আউটলেটগুলোতে মেকআপ কিনতে মহিলারা ভিড় করছেন।
এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ঈদের সময় প্রায় ৩ কোটি যাত্রী যাতায়াত করে, ফলে পরিবহন খাতও চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ দোকান সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু বলেন, এবার পরিবর্তির অবস্থায় ঈদ পালন হয়েছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য একটু কম হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এবার ঈদে ১ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। গতবার যেটা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা কম হয়েছে। তবে পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় ভোক্তারা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, দেশীয় পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে, গত বছরের তুলনায় এবার ঈদের বাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ঈদ ঘিরে রাজধানীর বাজারগুলোতে পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়। বেইলী রোড, গাউছিয়া, নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাকিস্তানি থ্রি-পিস ও দেশীয় বুটিকের চাহিদা বেশি থাকছে এবার। নাজিশ ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী আনিসুর রহমান জানান, বিক্রি ভালো হয়েছে।
গত বছরের তুলনায় এবার পোশাকের বাজারে বিক্রি কম হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা। রাজধানীর গাউছিয়া, নিউ মার্কেট ও বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের দোকানদারদের ভাষ্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের আগ্রহ কিছুটা কম। গত বছর যেখানে রমজানের মাঝামাঝি থেকেই ক্রেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল, এবার তুলনামূলক ভিড় কম।
ফ্যাশন হাউজগুলোর মালিকদের মতে, গত বছরের তুলনায় পোশাকের দাম ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি বিক্রিতে পড়েছে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পোশাকের চাহিদাও তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বিগত কয়েক মাসের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে ঈদ বাজারে। ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার পোশাক, জুতা ও প্রসাধনীর বিক্রি কমেছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন জানান, ‘ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরনে পরিবর্তন এসেছে।
ঈদের ছুটিতে প্রায় কয়েক কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যান। ফলে পরিবহন খাতে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়। তবে যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, ঈদের সময়ে টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। অনেকে শেষ মুহূর্তে টিকিট পেতে ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন।
ঈদকে ঘিরে আসবাবপত্র, রূপচর্চা সামগ্রী ও গয়নার বিক্রি বেড়েছে। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হাতিল জানিয়েছে, এ সময় তাদের আসবাব বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া, বিউটি পার্লার ও কসমেটিক্স দোকানগুলোতেও নারী ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। ঈদ উপলক্ষে সাজসজ্জার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকায় সৌন্দর্যচর্চা খাতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
ঈদ বাজারে ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে টেলিভিশন, ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনারের বিক্রি ভালো হয়েছে। স্মার্টফোন, ওয়্যারলেস ইয়ারফোন ও অন্যান্য গ্যাজেটের চাহিদাও বেড়েছে। নতুন মডেলের ফোনে ছাড় ও বিশেষ অফার থাকায় বিক্রি ভালো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মোবাইল বিক্রেতারা।
ঈদুল ফিতরে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে গত বছরের তুলনায় অনেক কম বুকিং হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গরমের তীব্রতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে অনেকে এবারের ঈদ ছুটিতে ভ্রমণে আগ্রহ কম ছিল।
স্থানীয় পর্যটন কমলেও বিদেশ সফরে আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশি পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েছে।
ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার পর্যটন ব্যবসা চার ভাগের তিন ভাগে নেমে আসছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ঈদের অর্থনীতির আকার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। বছরব্যাপী খাদ্য এবং খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ বিক্রি হয় ঈদের সময়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এই উপলক্ষে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়। কারণ তাদের বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশ হয় ঈদে।