মত-মতান্তর
মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর কি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত?
মোঃ ওবায়দুল্লাহ
(৪ দিন আগে) ৩০ মার্চ ২০২৫, রবিবার, ১:১৫ অপরাহ্ন
সর্বশেষ আপডেট: ১২:২১ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৬ থেকে ২৯ মার্চ চীন সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন। তবে এটি একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফরের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই সফর দ্রুত পট পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। শেখ হাসিনার শাসনামলে চীন ও ভারতের সঙ্গে কয়েক বছরের স্থিতিশীল ও দৃঢ় রাজনৈতিক সম্পর্কের পর ড. ইউনূসের চার দিনের এই সরকারি সফর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়কালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, হাসিনার বিদায় এবং ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা দৃশ্যতভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের জন্য ভারতের কঠোর ভিসা নীতির মধ্যেই দৃশ্যমান। বাংলাদেশ কি এই সময়ে তার বিদেশি জোট পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে?
ইউনূসের চীন সফরের কৌশলগত দিক
চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। তাই সেদিক থেকে বিচার করলে ইউনূসের চীন সফরের একটি ধারাবাহিক দিক রয়েছে। ক্ষমতা থেকে অপসারণের এক মাসেরও কম সময় আগে হাসিনা নিজেই চীন সফর করেন। এর পাশাপাশি এই সফর দিক পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হতে পারে , বিশেষ করে সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখার। ইউনূসের দলে অবকাঠামো, জ্বালানি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক উপদেষ্টাদের অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি বোঝায় যে, এই সফরটি নিছক প্রতীকী সফরের চেয়ে বেশি কিছু । অন্তর্বর্তী সরকার অবকাঠামো, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে চাইছে। চীন এই সুযোগটি কাজে লাগাতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। চীনা কর্মকর্তারা এই সফরটিকে নিছক আনুষ্ঠানিকভাবে না দেখে আরও বিস্তৃত কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখেন– বিশেষ করে যখন দুই দেশ ২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি করছে।
এখন কেন?
সফরের সময় এবং প্রয়োজনীয়তার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো- দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ। বর্তমান সরকারের প্রতি ভারতের স্পষ্ট অসন্তোষ - (যা ভিসার উপর সীমাবদ্ধতা এবং কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা হ্রাসের মাধ্যমে প্রদর্শিত ) একটি শূন্যতার সৃষ্টি করেছে । চীন কোনো রাজনৈতিক দাবি ছাড়াই নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করে এই শূন্যতা পূরণ করতে চাইছে । চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের মধ্যে এই কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত মেলে। তিনি বলেছেন ,বাংলাদেশে পরিবর্তন সত্ত্বেও চীন ধারাবাহিকভাবে পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে চলেছে রাজনৈতিকভাবে অস্থির সময়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং পরিবর্তন ত্বরান্বিত করা ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য। সরকার অস্থায়ী হলেও রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রশাসন বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর জন্য জাতির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। চীনের যথেষ্ট আর্থিক সংস্থান এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) কারণে এটি ইউনূস প্রশাসনের পছন্দের তালিকায় অগ্রাধিকার পেতে পারে। রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও মানবিক সমস্যা। মিয়ানমারের ওপর চীনের স্থায়ী প্রভাব এবং অতীতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ঢাকাকে স্থবির প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দিতে পারে। ইউনূস যে রোহিঙ্গা ইস্যুকে তার চীনা এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তা হলো- বেইজিংয়ের আঞ্চলিক সুবিধার জন্য একটি গণনামূলক পদক্ষেপ।
বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা
ঢাকা-বেইজিং অর্থনৈতিক সম্পর্ক অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যদিও একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক ভিত্তি রয়েছে। ওইসি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীন বাংলাদেশে ২২.৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যেখানে বাংলাদেশ মাত্র ৬৭৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা হ্রাস করা ইউনূসের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশি কৃষি পণ্য যেমন আম, কাঁঠাল এবং পেয়ারা আমদানিতে চীনের আগ্রহের কথা ঘোষণা করেছে - এই বিশেষ বাজার গ্রামীণ আয় বাড়াতে এবং ক্ষুদ্র মালিকদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা নিতে পারে । চীনের লংজি বাংলাদেশে একটি সৌর প্যানেল কারখানা স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহী। যা আমদানির বাইরেও শিল্প সহযোগিতা প্রসারের ইঙ্গিত দেয়। সেই সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ছাড়াও বাংলাদেশে চীনা উৎপাদন ইউনিট স্থানান্তরের বিষয়ে আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা হয়েছে। শ্রম ব্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ চীনের নিজস্ব উৎপাদন প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করছে, সেদিক থেকে বিচার করলে ঢাকার স্বল্পমূল্যের শ্রম, সামুদ্রিক রুটে প্রবেশাধিকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বাজারে প্রবেশাধিকার চীনের সামনে বড় সুযোগ উত্থাপন করে।
স্বাস্থ্য কূটনীতি
ইউনূসের সফরের একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো স্বাস্থ্য সহযোগিতা। সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত সেবা পেতে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ভারত দীর্ঘদিন ধরেই প্রধান গন্তব্য ছিল। বর্তমানে ভারত ভিসা প্রদান সীমিত করায় অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসার অবিলম্বে প্রয়োজন মেটাতে বিকল্প হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন ইউনান প্রদেশে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য তিনটি শীর্ষ স্তরের হাসপাতাল মনোনীত করেছে। এটি নরম কূটনীতির একটি ভালো উদাহরণ। যেখানে মানবিক সহায়তা প্রদানের নেপথ্যে কাজ করে কৌশলগত প্রভাব। পূর্বে আঞ্চলিক স্বাস্থ্য পর্যটনে ভারতের আধিপত্য ছিল। এখন চীনও এই সেক্টরে প্রতিযোগিতা করছে। বন্দর থেকে রোগী, সেতু থেকে দ্বিপাক্ষিক বিশ্বাস-ব্যাপক অংশীদারিত্ব প্রদানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছে বেইজিং ।
রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বা কৌশলগত পুনর্বিন্যাস?
তবুও ইউনূসের সফরকে খুব বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে যে, ইউনূস ইউএস আর্মি প্যাসিফিকের ডেপুটি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জোয়েল পি ভওয়েলের সঙ্গে তার চীনের ফ্লাইট ধরার ঠিক একদিন আগে দেখা করেছিলেন। আলাপচারিতার সময় বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত যোগাযোগ, আন্তঃকার্যক্ষমতা এবং সামরিক সহযোগিতার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশ কেবল তার ঝুঁকিগুলো পরিমাপ করছে কারণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা তার অগ্রাধিকার। অন্তর্বর্তী সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত মঞ্চ স্থাপন করতে চাইছে, যদিও তাকে এখনও ‘অন্তবর্তীকালীন’ হিসাবেই উল্লেখ করা হয়। এই সরকার ঐতিহ্যগতভাবে ভারত-কেন্দ্রিক মানসিকতার বাইরে গিয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামোগত এবং শিক্ষা খাতে চীনকে সম্পৃক্ত করতে চাইছে। ইউনূস মূলত চীনের আগে ভারত সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু নয়াদিল্লির সদিচ্ছার অভাবের ফলে ঢাকা এখন বেইজিংয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উদ্দেশ্য হোক বা না হোক, এই প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনের পথ
ইউনূস চীনে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এশিয়ার বোয়াও ফোরামে অংশ নিয়েছেন, যার বিষয় ছিল ‘ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বে এশিয়ার অবস্থান (Asia in a Changing World: Towards a Shared Future)”। ইউনূসের সফরটি ২৯ মার্চ শেষ হয়। বোয়াও ফোরামে ইউনূস সিইও এবং বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে উদ্ভাবন, অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে কথা বলেন। গুরুত্বপূর্ণভাবে এই সম্পৃক্ততা শুধুমাত্র সাহায্য বা বিনিয়োগের প্রাপক হিসেবে না থেকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে তুলে ধরে। ইউনূসের চীন সফর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির একটি অংশ, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রতিনিধিত্ব করে না। এই উত্তাল সময়ে আবেগকে দূরে সরিয়ে রেখে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, এই বহুমুখী বিশ্বে, ইউনূস কেবল সুযোগ খুঁজছেন এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে সম্পর্কের সেতু নির্মাণ করছেন। বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেখানে একটি বিষয় নিশ্চিত: বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে লিগ্যাসি একমাত্র ফ্যাক্টর হবে না। পরিবর্তে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত চাহিদা দ্বারা প্রভাবিত হবে। ইউনূসের চীন সফর এই নতুন কূটনৈতিক পদ্ধতির প্রাথমিক পরীক্ষা এবং সম্ভবত একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে কাজ করে।
সূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট
লেখক মোঃ ওবায়দুল্লাহ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার একজন ভিজিটিং স্কলার। এছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন মিসিসিপির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন স্নাতক সহকারী।