মত-মতান্তর
অংশীজনদের মধ্যে বোঝাপড়া থাকা এখন খুবই জরুরি
গাজী মিজানুর রহমান
(১ সপ্তাহ আগে) ২৩ মার্চ ২০২৫, রবিবার, ২:০৯ অপরাহ্ন
সর্বশেষ আপডেট: ১২:২০ পূর্বাহ্ন

পনেরো বছর ধরে এই ভূখণ্ডে একটা রাজনৈতিক শূন্যতার জন্ম হয়েছিল। বিরোধীদলবিহীন একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে নিজস্ব দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানো হয়েছিল। সরকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক দলের অনুগত বাহিনীর মতো ব্যবহার করে একটা পরিবারতন্ত্র পাকাপোক্ত হয়ে বসেছিল– যার হাত ছিল ভয়ংকর রকমের অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী সে অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রাসাদ গণমানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।ফলে বিগত ৫ আগস্ট দেশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। শুরু হয় নতুন পথচলা। এই অভিযাত্রায় অংশীজনের চিন্তা-চেতনার পার্থক্য থাকলেও পথ যদি একটাই হয়, তাহলে বাহন আলাদা হলেও শেষপ্রান্তে পরস্পরের দেখা হবেই।
এটা অনস্বীকার্য যে, তারুণ্যে উদ্দীপ্ত যুব সমাজ নেতৃত্ব না দিলে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব হতো না। হয়তো আরও বহু বছর জাতিকে অপেক্ষায় থেকে প্রহর গুণতে হতো– কবে একটা মাহেন্দ্রক্ষণ আসবে, যখন দল নয়, দেশ বড় হয়ে দেখা দেবে, বিদেশের স্বার্থের কাছে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে হবে না, বিরোধী মতামত প্রকাশের সুযোগ বন্ধ করতে বাস, ট্রেন, লঞ্চ, ইন্টারনেট বন্ধ হবে না। তাই আন্দোলনের অংশীজনদের ভেতরে ছাত্র-যুবার প্রতি সমীহ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। তারপর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদেরও স্বীকার করতে হবে যে, তাদের সাথে অভিভাবক, শিক্ষক, পেশাজীবী, পথচারি, রাজনৈতিক দলের কর্মী, সচেতন নাগরিকসমাজ যুক্ত না হলে তাদের একার পক্ষে একদলীয় শাসনের তাণ্ডব শেষ করা সম্ভব হতো না।
স্মর্তব্য যে, যারা অন্যায় ও অযৌক্তিক কোটার বলী হয়েছিল বা নিয়োগলাভের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের বলী হওয়ার আশংকার মধ্যে ছিল, যাদের ন্যায্য অধিকার এবং ন্যায্য দাবি নানাভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল, ব্যবসা জগতে যারা জিম্মি ছিল কয়েকটি হাতেগোনা পরিবারের কোটারি স্বার্থের কাছে, যাদের মুক্ত চেতনা বন্দি ছিল একরোখা আদর্শের কাছে– তারা সকলেই সর্বোতভাবে সহযোগিতা করেছে ছাত্রদেরকে। সকল শ্রেণির এইসব মানুষ ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে কেউ কেউ রাজপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ নানান উপায়ে তাদের অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, কেউ কেউ প্রতিবাদী কণ্ঠ নিয়ে মিডিয়ায় সোচ্চার হয়েছিলেন। এদের সম্মিলিত অবদানকে বর্তমান প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না। তাই যে, উদ্দেশ্য সামনে রেখে এসব সচেতন নাগরিকসমাজ আন্দোলনে শরীক হয়েছিল, তা যেন বিফলে না যায়, তা দেখার দায়িত্ব বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী প্রশাসনের ও আন্দোলনের অংশীজনদের।
দেশের স্বার্থের অনুকূল আদর্শের রাজনৈতিক দল করা সকলের সাংবিধানিক অধিকার। অংশীজনদের মত আলাদা হলেও পথ এক। যে আদর্শগুলো জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনে সাধারণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে, সেই আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা হারালে সাধারণ উদ্দেশ্য ব্যহত হতে পারে— জুলাই-আগস্টে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তাদের স্বপ্নের ঐক্যে চিড় ধরতে পারে। এখনো নানাদিক থেকে নানারূপ দেশি ও বিদেশি বিরুদ্ধ শক্তি সক্রিয় রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য প্রধানত আগের আন্দোলন-ঘনিষ্ঠ একতায় ফাটল ধরানো এবং গণঅভ্যুত্থানের ফলে গঠিত পরবর্তী সরকারের বিফলতা প্রমাণ করা।
এজন্য আন্দোলনের অংশীজনের প্রত্যেককে তাদের নিজস্ব অবস্থানের বৃহত্তর সাফল্যের জন্য যথাসম্ভব সমন্বিত চিন্তা-চেতনার প্রতি অনুগত থাকা জরুরি। জনবিরোধী শক্তির কোনো মানবিক বা মূল্যবোধজাত দায় থাকে না। এই শক্তি ভয়ংকর মানবতা-বিরোধী কাজের দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য শুধু একটাই— নিজেদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। কিন্তু শুভশক্তির হাত-পা ন্যায়নীতি, বিবেক, জনগণের ভালোমন্দ-বিবেচনার কাছে বাঁধা থাকে। শুভশক্তির পক্ষভূক্ত সকল অংশীজনের মধ্যে তাই জনস্বার্থে কিছু সাধারণ চিন্তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত থাকা দরকার। এসব সমন্বিত নিয়ামকের মধ্যে আসতে পারে— আগের পদত্যাগকারী রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক, আন্দোলন দমানোর জন্য যেসব অপরাধজনক কাজ হয়েছে তার বিচার প্রক্রিয়া, আন্দোলনে যে সকল দেশ বিরোধিতা করেছে তাদের সাথে সম্পর্ক, ইত্যাদি প্রসঙ্গ। এখানে বহু মতের ভেতর থেকে একটা একটা গ্রহণযোগ্য পথ বেরিয়ে আসতে হবে।
আপামর জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া আগস্টের সাফল্য নিয়ে ঘরে ফেরা যেত না। তাই জাতির বিশ্বাসের ভিত্তিমূল নিয়ে নাড়াচাড়া করলে জাতির জন্য বিভাজনের পথ তৈরি হতে পারে, তা বুঝতে হবে। এই প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা আসে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারগুলো জনগণকে স্বাধীনতার সুফল দিতে পারে নাই এবং একটি দল স্বাধীনতার চেতনাকে নিজেদের দলের মালিকানা-স্বত্ত্ব বলে চালাতে চেয়েছে– যদিও সকলেই জানে, মুক্তিযুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক দলের কীর্তি ছিল না– আপামর জনগণ অস্ত্র হাতে না নিলে মুক্তিযুদ্ধ দানা বাঁধতো না। এসব কথা স্বীকার না করায় সেই দলটির অহংকার ভুলের উপরে দণ্ডায়মান হয়ে পড়ে এবং তার নড়বড়ে ভিত ৫ আগস্টে গুঁড়িয়ে যায়। কিন্তু জুলাই- আগস্ট ২০২৪ কোনোভাবেই ১৯৭১ এর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। ১৯৭১ এর সামনে যেমন একটা বৃহৎ সেনাবাহিনী দাঁড়াতে পারেনি– ২০২৪-এ এসে দেখা গেছে, বিশাল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে লালিত জনবিচ্ছিন্ন প্রশাসন তাসের ঘরের মতো ধসে গেছে। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা, তাকে অস্বীকার করা যাবে না ।
(গাজী মিজানুর রহমান, সাবেক সিভিল সার্ভেন্ট ও প্রবন্ধকার)