দেশ বিদেশ
শিগগিরই আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু
বাড়ছে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সাজ্জাদ হোসেন
৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার
জুলাই-আগস্ট গণহত্যা মামলার খসড়া প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। এ মাসের শুরুতেই কয়েকটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হবে। এর মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ সব মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে গণহত্যায় হাসিনার সরাসরি নির্দেশনার প্রমাণ মিলেছে। তবে অতি স্পর্শকাতর এসব মামলার বিচার কার্যক্রম শুরুর আগে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মামলার বিচার কার্যক্রমের তথ্য ইতিমধ্যে ফাঁস হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যারাকের অভাব, নিরাপদ অস্ত্রাগারের অভাব, চারদিকে অস্থায়ী টিনশেড বিল্ডিং, ট্রাইব্যুনালের সীমানার মধ্যে ডাম্পিং করা পুরাতন গাড়ি ইত্যাদি ঘিরে নাশকতার শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া বানচালের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে বলে ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
সরজমিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেখা গেছে, প্রধান ফটকে পরিচয় নিশ্চিত করে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা খাতায় নাম, মোবাইল নম্বর সহ যাবতীয় তথ্য এন্ট্রি করে পাস নিয়ে ঢুকতে হয়। ভেতরে ঢুকে দেখা যায় ৩টি ছাউনিতে বসে আছে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এপিবিএন’র সদস্যরা। এছাড়াও প্রসিকিউশন অফিসের সামনে দায়িত্ব পালন করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। প্রসিকিউশন অফিসের নিচেই সিঁড়ি লাগোয়া কয়েকটি পুরাতন আধাকাঁচা রুম চোখে পড়ে। এ সব রুমে কারা থাকে জানতে চাইলে এক পুলিশ সদস্য জানান, এখানে ট্রাইব্যুনালের স্টাফ থাকেন। মানবজমিনকে এই পুলিশ সদস্য জানান, ট্রাইব্যুনালের স্টাফ থাকবেন কোয়ার্টারে অথবা তাদের জন্য নির্ধারিত কোনো জায়গায় যা ট্রাইব্যুনালের সীমানার বাহিরে হবে। এ সব স্টাফ যদি দায়িত্ব পালনের বাইরেও ট্রাইব্যুনালের ভেতরে অবস্থান করেন তবে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি তো উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এছাড়াও ট্রাইব্যুনালের চতুর্পাশে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য টিনশেড বিল্ডিং এবং অব্যবহৃত পরিত্যক্ত গাড়ি। এ সব বিল্ডিংয়ে কারা থাকেন এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলতে পারে না সেখানে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ সব রুম কোনোটা ফাঁকা পড়ে থাকে আবার কোনো রুমে ট্রাইব্যুনালের সিভিল স্টাফরা থাকেন। মানবজমিনকে পুলিশের এক সদস্য বলেন, ট্রাইব্যুনালের সিভিল স্টাফ থাকবেন ট্রাইব্যুনালের সীমানার বাহিরে। দায়িত্ব পালন শেষে তারা কোর্টের বাহিরে চলে যাবেন। কিন্তু সিভিল স্টাফরা ট্রাইব্যুনালের ভিতরে থাকলে তাদের মধ্যে হতে কেউ যদি মিসগাইড হয়ে নাশকতার চেষ্টা করে এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ শেষে এসব সিভিল স্টাফের ট্রাইব্যুনালের বাইরে অবস্থান করা উচিত, এছাড়াও যেসব গাড়ি অব্যবহৃত হয়ে দীর্ঘদিন ট্রাইব্যুনালে পড়ে আছে সেগুলো দ্রুত এখান থেকে সরিয়ে নেয়ার দাবিও জানান তিনি।
এদিকে, নতুন ট্রাইব্যুনাল বিল্ডিংয়ের কাজ চলমান থাকায় জায়গা সংকটে আইনশৃক্ষলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় এপিবিএন’র প্রায় ১২০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে তা প্রায় ৭০ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের মূল বিল্ডিংয়ের পাশে দায়িত্ব পালন করা এপিবিএন’র এক সদস্য মানবজমিনকে জানায়, আমরা প্রায় ৭০ জনের অধিক এপিবিএন সদস্য ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের জন্য কোনো ব্যারাক নাই। আমাদের থাকার অথবা রেস্ট নেয়ার কোনো রুম নাই। যদি ট্রাইব্যুনালের পুরাতন একতলা বিল্ডিংটা আমাদের দেয়া হয় তাহলে আমরা ক্লান্ত হলে সেখানে বিশ্রাম নিতে পারতাম। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য ২টি ওয়াশরুম রয়েছে। এসব ওয়াশরুমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও তেমন ভালো নয়।
জানা যায়, ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র রাখার স্থায়ী কোনো অস্ত্রাগার নেই। বর্তমানে টিনশেড রুমে অরক্ষিত একটি অস্ত্রাগারের মাধ্যমে কাজ চলছে। এই অস্ত্রাগারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যদের একটু অসতর্কতায় টিন কেটে চুরি হতে পারে এসব অস্ত্র। এক পুলিশ সদস্য বলেন, আমাদের সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। কিন্তু যদি অস্ত্রাগারের ছাদে টিনের চালের পাশাপাশি লোহার গ্রিল লাগানো হয় তবে অস্ত্রাগারটি আরও সুরক্ষিত ও ঝুঁকিমুক্ত থাকবে।
ট্রাইব্যুনালের নির্মাণাধীন নতুন বিল্ডিংয়ের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ওপরও নজরদারি বাড়ানোর দাবি অনেকের।
যেহেতু জুলাই-আগস্ট গণহত্যার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার মাধ্যমে শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, সুতরাং বিভিন্ন দিক থেকে এই বিচার কাজকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টাও করা হবে। ইতিমধ্যে ট্রাইব্যুনালের তথ্য ফাঁস সহ নানা অভিযোগ সামনে আসছে। ফলে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও ধরা যাচ্ছে না আসামিদের। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে জড়িত কোনো একটা মহল কিংবা প্রসিকিউশনের থেকেও এটা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুন্যালের তথ্য ফাঁসের সঙ্গে যদি প্রসিকিউশন টিম, কিংবা অফিসের কেউ অথবা ট্রাইব্যুনালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, এই বিচারটা অসম্ভব স্পর্শকাতর। এখানের আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের হাতে অর্থ বিত্ত আছে। তারা এই বিচার কাজকে ব্যর্থ করতে, আমাদেরকে কিংবা বিচারকদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আমরা তাদের বলতে চাই, এই বিচারের ব্যাপারে আমরা কমিটেড। আমরা এ বিচার ব্যর্থ হতে দেবো না।