দেশ বিদেশ
ফাঁকা ঢাকায় ছিনতাই আতঙ্ক
সুদীপ অধিকারী
৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা ৯ দিনের ছুটির ফাঁদে দেশ। এই ছুটিতে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে বেশির ভাগ মানুষই রাজধানী ছেড়েছেন। এতে কর্মচঞ্চল ঢাকার রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা। আর এই ফাঁকা সড়কে বেড়েছে ছিনতাই। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সায়েদাবাদ রেলক্রসিং এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন সেন্টমার্টিন সি ভিউ ট্রাভেল এজেন্সির সুপারভাইজার ইমন। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা তার বন্ধু নাঈম বলেন, সেন্টমার্টিন পরিবহনের সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করেন ইমন। ডিউটি শেষ করে তিনি গ্রামের বাড়ি বরিশাল যাওয়ার জন্য ভোরের দিকে সায়েদাবাদ রেলক্রসিং পার হচ্ছিলেন। ওই সময় চার/পাঁচ জন ছিনতাইকারী তার গতি রোধ করে। পরে তারা ইমনের কোমরের নিচে ছুরি দিয়ে আঘাত করে তার কাছে থাকা ১০ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আমি খবর পেয়ে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসি।
মঙ্গলবার রাতে মোহাম্মদপুর ৪০ ফিট এলাকায় খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন মানিক মিয়া। তিনিও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত মানিক মিয়ার দুলাভাই মো. সুমন বলেন, আমার শ্যালকের বাড়ি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানা এলাকায়। বর্তমানে সে ঢাকায় থাকে ও ফুডপান্ডায় খাবার ডেলিভারির চাকরি করেন। মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে সে মোহাম্মদপুর বসিলা এলাকার ৪০ ফিট এলাকায় খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়েছিল। পথিমধ্যে ছিনতাইকারীরা তার গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তার কাছে থাকা ফুডপান্ডার ব্যাগ, মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা সব নিয়ে যায়। খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসি। সুমনের সঙ্গে কথা বলার সময়ই তার পাশ থেকে রায়হান নামে মোহাম্মদপুর এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, সাধারণ সময়ে যখন লোকজন সব থাকে তখনই ছিনতাইকারীদের অত্যাচারে বাঁচা যায় না। সকলের সামনেই গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে সব লুট করে নিয়ে যায়। আর এখন তো ঢাকা ফাঁকা। ঈদের ছুটিতে সকলে গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে গিয়েছে। রাস্তায় লোক কম। পুলিশও তেমন একটা দেখা যায় না। আর এই সুযোগ বুঝে মাজা থেকে ধারালো চাপাটি বের করে গলায় ধরে সব নিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা। দিতে না চাইলেই কোপ দেয়। এই ঘটনা অহরহ ঘটছে। ভোগান্তির ভয়ে কেউ থানায়ও যায় না।
এদিকে ঈদের দিন রাতে যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাই হওয়া এমনই এক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আজমল নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, আমাদের বাসা যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায়। ঈদের দিন রাত ৯টার দিকে আমি খিলগাঁও এলাকার আমার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলাম। সঙ্গে আমার ছোট বোন ছিল। আমরা যখন বিবির বাগিচা ২ নং গেট এলাকায় পৌঁছাই তখন হঠাৎ এক মধ্য বয়সি মহিলা আমাদের দেখে চিল্লায় উঠে আমাকে ছিনতাইকারী ধরছে। আমার সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে। আপনারা কে কোথায় আছেন আমাকে বাঁচান। তখন তার চিৎকার শুনে আমাদের সামনের দিক থেকে দুই পথচারী দৌড়ে আসে। আমিও সামনের একটি চায়ের দোকানের সামনে রিকশা দাঁড় করাই। সঙ্গে বোন থাকায় তাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাইনি। পরে চায়ের দোকান থেকে আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই নারীর কাছে যাই। ততক্ষণে ছিনতাইকারীরা তাদের কাজ শেষ করে পালিয়ে গেছে। মহিলাটির ফোন, ভ্যানেটি ব্যাগ সব নিয়ে চলে যায় ছিনতাইকারীরা।
এর আগে কামরাঙ্গীরচরের সিলেটিয়া বাজার এলাকায় ছিনতাইকারীদের হামলায় সাব্বির (২৩) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত সাব্বিরের খালাতো ভাই মিরাজ বলেন, ঈদের আগের দিন রাতে সাব্বির ওই সময় সিলেটিয়া বাজার দিয়ে যাওয়ার পথে ওত পেতে থাকা ৩-৪ জন ছিনতাইকারী তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও পাঁচ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। একই দিন বিকালে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন সাতারকুল এলাকার জয়নাল। তার প্রতিবেশী দেলোয়ার হোসেন বলেন, জয়নাল অটোতে যাচ্ছিলেন। এ সময় ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে তার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা সব নিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) রেজাউল করিম মল্লিক বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে ঢাকা মহানগর এলাকায় পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ডিএমপি’র ৫০টি থানা এলাকায় প্রতিদিন জননিরাপত্তা বিধানে দুই পালায় ডিএমপি’র ৬৬৭টি টহল টিম দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া মহানগর এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানে ৭১টি পুলিশ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশকে সহায়তা করার জন্য ইতিমধ্যে অক্সিলারি ফোর্স নিয়োগ করা হয়েছে। ইউনিফর্ম পুলিশের পাশাপাশি মহানগরীর নিরাপত্তায় ডিবি’র উল্লেখযোগ্য টিম কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান, রেলস্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে কেউ যাতে নাশকতা করতে না পারে সেজন্য ডিবি গোয়েন্দা নজরদারি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ডিবির সাইবার টিম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। প্রো অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের অংশ হিসেবে ডিবির জাল সর্বত্র বিস্তৃত করা হয়েছে। নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে ডিবি সর্বদা নগরবাসীর পাশে রয়েছে।